কম্পা‍‌সের সেন্টারে ক্যাম্পাস

কম্পা‍‌সের সেন্টারে ক্যাম্পাস
ঋতঙ্কর দাস

সেই কবে থেকেই তো খালি হাতে গোল আঁকার চেষ্টা করেই চলেছি, কিন্তু সার্কেলটা পারফেক্ট হচ্ছে না। পারফেক্ট সার্কেল তো খালি হাতে হয় না। লাগে কম্পাস…


পারিপার্শ্বিক জটিলতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু বিষয়ে বর্তমানে ছাত্র সমাজের যে কঠোর অবস্থান, উপমহাদেশে তার সূচনা ১৮৩০ সালে। হিন্দুকলেজের রক্ষণশীল শিক্ষকদের বিরোধিতায় গড়ে ওঠে প্রথম ছাত্রদের রাজনীতি চর্চার সংগঠন ‘একাডেমিক এসোসিয়েশন’। এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ হেনরি লুই ডিরোজিও। এই ছাত্ররাই ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠানের নামে তাদের আদর্শচর্চা করে যাচ্ছিল একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার আগে। ১৮৪৩ সালের এপ্রিলে বাঙালী ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘বেঙ্গল বিট্রিশ ইন্ডিয়ান সোসাইটি’ আত্মপ্রকাশ করলেও; এর চাইতেও ১৮৫১ সালে অধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে ‘বিট্রিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ‘ বেশি কার্যকর হয়ে উঠে। ১৮৭৫ সালের দিকে আনন্দমোহন বসু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে রাজনৈতিক চর্চায় স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বদেশপ্রেম, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা, সমাজতন্ত্র’র মতো বিষয়গুলো ছাত্রদের মনে দারুণভাবে প্রভাবফেলতে শুরু করে। এই সময়ে ছাত্র তথা সমাজের তরুণ অংশের দুর্বার স্বাধীনচেতা মনোভাব — অধিকারের প্রশ্নে ছাত্রদের আবেগ ও বিবেক দুটোর মিশ্রণই বেশ প্রবল হয়। আবেগ আর বিবেকের এমন সংমিশ্রণে এই বয়ঃসন্ধিক্ষণে প্রেমে পড়া আর রাজনীতি করার মধ্যে যে মেটাফোরিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগই নেই। এই স্বাধীন চেতনাবোধ আর আবেগের সংমিশ্রণের ফলেই আঠারো শতকের রাজনীতি চর্চার ধারাবাহিকতায় ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’ গান গেয়ে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছাত্রদের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্ৰহণে ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম বৈপ্লবিক ধারার আন্দোলন পরিলক্ষিত হয়। তৎকালীন ইংরেজ সরকারের শিক্ষা সচিব কার্লাইলের স্বদেশী আন্দোলনে যোগদানকারী ছাত্রদের সরকারি স্কুল কলেজ থেকে লাগাতার বহিষ্কারকে পরোয়া না করে, ১৯০৫ সালের ৪ নভেম্বর কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে তিন হাজার ছাত্র সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ‘এন্টি সার্কুলার সোসাইটি’ গড়ে তোলে। ব্যাপক গণভিত্তির এই ছাত্র সংগঠন, ছাত্রসমাজের মধ্যে ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবকে প্রত্যক্ষ আন্দোলনে রূপ দিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনিশ শতকের সকল সংকটেই সময়ের প্রয়োজনে ছাত্ররা সপ্রতিভ হয়েছে বারবার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে পাঞ্জাব থেকে বাংলা, লাহোর থেকে কানপুর উত্তাল ছাত্র বিক্ষোভে। এই আন্দোলন থেকেই উথ্থান ছাত্র নেতা ভগৎ সিং’র। এই সময়েই ঘটে যাওয়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড সারা ভারতে ছাত্রদের ব্যাপক ব্রিটিশ বিরোধীতার বীজ বপন করে। এই তীব্র ঘৃণা নিয়ে কলকাতার বিদ্যাসাগর, রিপন (সুরেন্দ্রনাথ), সিটি কলেজের ছাত্ররা দলে দলে কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। রচিত হয় ছাত্রআন্দোলনের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শেষভাগে ১৯২৮ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারী সাইমন কমিশন বোম্বাইয়ে এসে পৌঁছালে কলকাতার সমস্ত স্কুল কলেজে চলা ছাত্র ধর্মঘটে যোগ দেয় বেথুন কলেজের ছাত্রীরাও। এই সময়েই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি, বিভিন্ন কলেজে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯১১ সালে রিপন (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ) কলেজে গঠিত ছাত্রসংসদই সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রথম নির্বাচিত ছাত্রসংসদ। ছাত্রদের কেন্দ্রীয় সংগঠনের অনুপস্থিতিতে একদিকে এই সংসদগুলিই আন্দোলন পরিচালনার মঞ্চ রূপে গড়ে ওঠে। এই ছাত্রসংসদ’ই ভবিষ্যত- কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে ত্বরানিত করে।

রঞ্জন গোস্বামী, নিরঞ্জন তালুকদার, আনোয়ার হোসেন থেকে শুরু করে অভিজিৎ মাহাতো, তিলক টুডু, সৈফুদ্দিন মোল্লা, স্বপন কোলে, সুদীপ্ত গুপ্ত হোক কিংবা অভিমন্যু বা ধীরাজ রাজেন্দ্রন্দন আমাদের প্রত্যেক শহীদের শাহাদাতে মিল আছে খুনের কারণে। মিল আছে ক্যাম্পাসে স্বাধীনতা হরণের লড়াইকে দুর্বল করার চেষ্টায়। আর মিল আছে আমাদের শত শত শহীদের নিঃসংকোচ লড়াইয়ে।



কিন্তু সময়ের স্রোতে ইতিহাসের কত দাঁড়ি, কমা’ই তো হারিয়ে যায়। পরাধীন বা স্বাধীন ভারতে বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসের পর ক্যাম্পাস যে দুর্নিবার ছাত্র আন্দোলনে ছেয়ে গিয়েছিল, আজ তার প্রাসঙ্গিকতা কতটা? ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস পড়ার ধরন’ই বা কী হবে? এ কি মোঘল আমলের মতো কোনো লুপ্ত যুগের স্মরণ? নিশ্চিত উত্তর না। লড়াই সংগ্রাম, ইতিহাস- কালের সংকীর্ণ গন্ডিকে ছাপিয়ে আগুন জ্বালিয়ে গেছে বারবার। এবং লড়াইয়ের কোনো বিরতি নেই। নেই কোনো দাড়ি, কমা, ফুলস্টপ। যে ইংরেজ নিজের বিচার পদ্ধতি জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, যে ধর্মান্ধ শাসক, ভাবের দোহাইয়ে যুক্তিকে অস্বীকার করাতে চেয়েছিল, তারাই আজ পোষাক পালটে ক্যাম্পাসের মাথায় বসে আছে। আজও বহু ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের স্বার্থের বিষয়ে ম্যানেজমেন্টের কোনো ম্যাথা ব্যথা নেই। কলেজ ফি, পরীক্ষার তারিখ, পাঠ্যক্রম, ক্লাসের রুটিন তৈরী হয়। ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছে মতো। হোস্টেল, লাইব্রেরী, ক্যান্টিন বিলাসিতা তাদের কাছে! স্কলারশিপ, ফেলোশিপ অনেকটা ভিক্ষের মতো তাদের কাছে। ইচ্ছে হলে দেবে না হলে বন্ধ। এই অথরিটির সামনে একা একজন ছাত্রের ক্ষমতা তুচ্ছ, এবং ঠিক এই প্রশ্নেই প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিবাদের, ইউনিয়নের। ১৯৭০ থেকেই ভারতের ছাত্র ফেডারেশন এই কাজ নিবিড়ভাবে করে চলেছে।

১৯৭০ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী- সংগঠকদের লড়তে হয়েছে সবার শিক্ষার জন্য। লড়াই খানিকটা ফুলফিল হয় ২০০৪ সালে শিক্ষা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হলে। কিন্তু শুধু স্কুলে যাওয়ার পড়ার অধিকার থাকলে তো এগোনো সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষা ছাড়া একবিংশ শতাব্দী অসম্ভব। বর্তমানে রাজ্যের এই ক্যাম্পাসগুলোতেই চলছে সুদীর্ঘ ইতিহাস বিজরিত লড়াইয়ের ভিক্টরি সিম্বল – ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসি’র মার্ডার! ব্রুটাল মার্ডার। এই রাজ্যে ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়া কলেজের ছাত্রনেতা অভিজিৎ মাহাতো খুন হয় মাওবাদীদের হাতে। হাওড়ার আব্দুল কলেজের গেটে এস.এফ.আই নেতা স্বপন কোলেকে পিটিয়ে খুন করে তৃণমূল। আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাইতে গিয়ে পুলিশি হেফাজতে খুন হতে হয় আমাদের নেতা সুদীপ্ত গুপ্তকে। মোটিফ এক ও অভিন্ন। ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসি রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে এই উপমহাদেশের বহু শত ছাত্র ফেডারেশন সংগঠক। নাজিব নিখোঁজ হয়েছে। রোহিত ভেমুলা ইন্সটিটিউশনাল মার্ডারের শিকার। আর.এস.এস খুন করেছে ধীরাজ – অভিমন্যুকে। তবু থামলে চলবে না। ক্যাম্পাসের ভেতরে গুন্ডারাজ আর বাইরে কর্পোরেটরাজের বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে শিনা টান করে লড়ে যেতে হবে। ফেলোশিপের দাবিতে, স্কলারশিপের দাবিতে, হোস্টেল, লাইব্রেরী, পরিছন্ন ক্যাম্পাসের দাবিতে, ক্লাসরুমের দাবিতে লড়ে যেতে হবে। লড়ে যেতে হবে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর জন্য, ইন্টারনেটের জন্য। চোর -মাফিয়া-হত্যাকারীরা শেষ কথা বলে না। শেষ কথা বলে মানুষ। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে তৃণমূল আর বিজেপির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজকে দ্রোহের দাবানলে বাঁধার কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই এই সময়ের সবচেয়ে বড় কাজ। আর দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন হিসেবে এস.এফ.আই’কেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। It’s a call of the hour…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *