বন্ধু চল রোদ্দুরে…

বন্ধু চল রোদ্দুরে…

  • অর্ক মুখার্জী

প্রত্যেক খেলার মাঠে এমন একজন থাকেই যে ব্যাটের মালিকানার সূত্রে দলে সুযোগ পায়। আমাদের মাঠে আমি ছিলাম সেই ছেলেটা, পুঁজির জোড়ে চলছিলাম। যদিও পুঁজিপতির সম্মান জোটে নি কোনোদিন – খেলার মাঠের মতো সাম্যবাদী সহাবস্থান সত্যিই দুর্লভ। প্রথমদিকে ব্যাট বল পেতাম না, নো ম্যানস ল্যান্ডে ফিল্ডিং করতাম। তাই প্রাথমিক ভাবে নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ জোটেনি। যদিও এহেন অবিচারে বিচলিত হয়েছি বলে মনে পড়ে না – মাঠে দাঁড়াতে পারছি, সেটাই তখন বিশাল ব্যাপার।

তারপর সব প্রথিতযশা খেলোয়াড়ের মতো আমার জীবনেও সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে যখন ম্যাচের শেষ বলে কভার ড্রাইভ মেরে মিড অনের মাঝখান দিয়ে বল গলিয়ে ম্যাচ জিতিয়ে আপামর বিশ্বকে ধাঁধায় ফেলে দি, সাথে আমাকেও! সেদিনের তারকা আমি অসংখ্য appreciation এর মাঝে নিজেকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম ঠিক সময়ে চোখ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। সেই ম্যাচ জেতানো ইনিংসের কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়৷ এরপর একটু সম্মান বাড়ে, আমার থেকে বয়সে ছোটো ছেলেরা দাদা ডাকাও শুরু করে। বল কুড়িয়ে আনা ছাড়াও শেষ ওভারে ২৫ রান বাকি থাকলে বল করা বা ৬ ওভারে দশ রান করার জন্য ওপেন করতে যাওয়ার মতো দুর্লভ সম্মানও আমার জুটতে লাগল। একটা বলও মাঝব্যাট হলে পরের তিনদিন চলত তার শ্যাডো প্র্যাক্টিস। কাঠের স্কেলে ব্যাট করে যে ইন্ডিয়াকে কত হারা ম্যাচ শেষ তিন ওভারে সেঞ্চুরি করে জিতিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কমিটমেন্টের অভাব আমার কোনোদিনই ছিল না। খালি ইন্ডিয়ার হয়ে খেলার জন্য আমার দরকার ছিল দুটো জিনিসের — একটা সৌরভের বাবা আর একটা শচীনের কোচ। নতুন বাবা পাওয়ার ঝামেলা অনেক, বরং কোচ খোজা সহজ, বিশেষত সামান্য তোষামোদ আর এক কাপ চায়ের বিনিময়ে পাড়ায় পাড়ায় টুর্নামেন্ট জেতানো দাদারা যখন তার সাফল্যের চাবিকাঠির হদিশ দিতে উদগ্রীব। সেই দাদাদের সম্মান দ্রোণাচার্যের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। এমনকি একসময় বাড়ির বড়দের থেকেও তাদের প্রভাব ছিল বেশি – জীবনে লক্ষ্য ছিল অমুক দাদার মতো হওয়া। যদিও নিতান্তই ছেলেমানুষী – তবু তাতে স্বকীয়তা ছিল, বিস্ময় ছিল, সাহস ছিল, সারল্য ছিল। আজকের বাজারের বেঁধে দেওয়া এক সার্বজনীন লক্ষ্যে সে সুখ কোথায়! বরং খুঁড়োর কলে প্রাণ গত প্রায়।

 পাড়ার ক্রিকেটে কিছু নিজস্ব নিয়মকানুন থাকত, যা অঞ্চল ভেদে সামান্য পরিবর্তিত হলেও মোটের ওপর সার্বজনীন। ব্যাটিং এ ছিল মূলত চারটে শট – এক সোজা ব্যাট, দুই ঝাটা শট, তিন খোঁচা শট, চার ৩৬০° শট (নামকরণ ব্যক্তিগত) কারণ এক্ষেত্রে বল নিজেই ব্যাট খুঁজে নিত। এবং শেষোক্ত শটেই রান হওয়ার সম্ভাবনা থাকত সব থেকে বেশি। বোলিঙের বিবর্তন আরো মজার৷ আদিমকালে প্রধান অস্ত্র গায়ের জোড়। বোলার পাঁচ আঙুলে বল ধরে ছুড়ে মারত, একড্রপে বল উইকেট পার করানোইই ছিল প্রধান লক্ষ্য। মধ্যযুগে পেস বোলিঙের টেকনিকের আমদানি হয়। পাঁচ আঙুলের বদলে তিন আঙুলে সিম ধরে, ধুতু দিয়ে ক্যাম্বিস বলের একদিকের পালিশ তুলে বল করা হত। আউটসুইং বা ইনসুইংয়ের ভঙ্গিমায় নির্ভেজাল সোজা বল করে ব্যাটসম্যানকে হতচকিত করে দেওয়াই ছিল এই পর্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আধুনিক যুগের বিকাশ ঘটে স্পিন বোলিঙের মাধ্যমে। ডান দিক, বাঁদিক, উপর নীচ নানাভাবে হাত বেঁকিয়ে বল করার প্রবণতা দেখা দেয় এই যুগে। যদিও এক্ষেত্রে অন্তত আমাদের মাঠে বোলারের ক্ষেপননৈপুণ্য বিচার করা সমস্যার হয়ে পড়ে। মাঠের ঢেউ খেলানো অসমান পিচে সোজা বল যেত ঘুরে, আর ঘোরানো বল যেত সোজা। তাই আমার অনুমান মাঠে স্পিনারদের অভ্যুথানের পিছনে প্রতিভা অপেক্ষা ভবের মায়াই বেশি ছিল। যদিও দৈবলীলার অনুপস্থিতি সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণনিশ্চিত হই সেদিন, যেদিন থেকে আমার নির্বিষ সোজা বল গুলো গোত্তা খেয়ে ব্যাট প্যাডের ফাঁক খুঁজে নেয়। এইভাবে পিচ থেকে স্পিন আদায় করে বেশ কয়েক সপ্তাহ আমি মাঠে নিয়মিত স্পিন বোলারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। 

যদিও সে সৌভাগ্য অত্যন্ত স্বল্পকালের, বড়োজোর কয়েকদিন। তবু সেইকদিন যে একাগ্রতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলাম তার ঝলক পরবর্তী জীবনে দেখালে অনেক কিছুই যে অন্যরকম হতো তা বলাই বাহুল্য। ফিল্ডিং নিয়ে আমরা তখন তেমন চিন্তিত ছিলাম না, সুরেশ রায়ণা তখন ততটা জনপ্রিয় নয়। তবে লোপ্পা বল ক্যাচ ধরে মাটিতে দুবার গড়িয়ে নিয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠলে দেদার পিঠ চাপড়ানি ও অকুন্ঠ প্রশংসা মিলত।

এইভাবে চলছিল বেশ। হঠাৎ একদিন দেখি একটু বাড়াবাড়ি রকমের বড়ো হয় গেলাম – যতটা বড়ো হলে বর্তমান ছাপিয়ে ভবিষ্যত প্রকট হয়! তাই ব্যাট বলের পাট চুকে গেল, বিকেলগুলো কাটত টিউশনে বা বাড়িতে ঘুমিয়ে যাতে রাতের পড়াটা ভালো হয়। সবাই বলেছিল, ‘‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে!’’ এবং কেষ্ট ঠাকুরের উপস্থিতি সম্পর্কে অসন্দিগ্ধ আমি তাই খেলতে না যাওয়ার কষ্টও মেনে নিলাম ‘কেষ্ট ঠাকুর’ লাভ নিশ্চিত করতে। মাঝেমধ্যে মাঠে যেতাম ঠিকই, তবে তা উল্লেখযোগ্য নয়। আর গেলেও খেলতাম কদাচিৎ, খানিকক্ষণ খেলা দেখতাম, বাড়ি চলে আসতাম। ফিরে যেতে ইচ্ছে হত, সাহস হতো না৷ তারপর আরো বড় হলাম। এখন তো তো মাঠে যাওয়া আনুষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু প্রত্যেকদিনের পাটিগাণিতিক জীবনে সেই চালচুলোহীন, প্রত্যাশাহীন, ভেসে যাওয়া দিনগুলো আজও বাঁচিয়ে রাখে। ফিরে যাওয়া হয়ত যায় না- মুহূর্ত মুহূর্তেই শেষ। তবু সেসব দিন যেন কোথাও গিয়ে খুব জীবন্ত, খুব বাস্তব, যেন কালকেই হয়েছে সব। এরা থেকে যায়, এরা ফুরোয় না। আর যেদিন ফুরোয়, সেদিন সবই ফুরোয়। কিছুই থাকে না আর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *