অনাহারে শিক্ষা
- পূজা চন্দ
“লেখাপড়া করে যেই, অনাহারে মরে সেই” — হীরক রাজার দেশে সিনেমার এই উক্তিটি বারবার দাগ টানে বর্তমান পরিস্থিতিতে। রাজ্য তথা দেশের অবস্থা ভয়াবহ সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেড়ে চলা দুর্নীতি, কালোবাজারী সব কিছুর পাশাপাশি সব থেকে করুন অবস্থা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েদের কাছে স্কুল এর গন্ডি টপকানোর পর কলেজে ভর্তির টাকা জোগাড় করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়, যেখানে বাড়িতে ২বেলার ভাত হয়তো ঠিক করে ফোটেনা— যে রাজ্যে চাকরি এখন বিলাসিতা, সেই রাজ্যের শ্রমিকের বাড়ির মেয়ে টার ভবিষ্যত এখন মুখ্যমন্ত্রীর পায়ে ঠেকানো সেই ফুটবল টার মতো— কোনদিকে যাবে কেউ ধরতেও পারবেনা— যে দেশে রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বস্তিতে এক গুচ্ছ ছেলেবেলা ঘুরে বেড়ায়, খাবার পায়না দুমুঠো দুবেলা, তাদের স্বপ্ন তৈরি হয় একটু বড়ো হয়েই কাজে ঢুকে যাওয়া— কিছু ক্ষেত্রে বাবা মা রা জোর করে পাঠিয়ে দেয় স্কুলে, একবেলা খাবার জোগাড়ের আশায়— শিক্ষাটা আগে নয়, পেটে একটু ভাত দেওয়াটাই আসল— তাও তাদের প্রাপ্য মিড ডে মিল ও এই সরকারের কৃপায় চুরি হয়ে যায়। সপ্তাহে একদিন হাফডিম আর বাকি দিনগুলো ডাল ভাতে কাটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপুষ্টির শিকার হয় ছেলেবেলা।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০২২’ অনুযায়ী ১২১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭ নম্বরে। তারপরেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর পরনে ব্যায়বহুল পোশাক, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে দামী মোবাইল আর গরিব ঘরের পড়ুয়াটার মাথার ওপর ভাঙা চাল। তার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের ‘‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’’ প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষার বেসরকারিকরণ করার যে পরিকল্পনা হয়েছে তাতে করে মেহেনতী মানুষের বাড়ির ছাত্রটার স্বপ্নের পথে আরও একটা বাধা এসে দাঁড়িয়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে যেভাবে শিক্ষাকে অনলাইন এ নিয়ে আসা হয়েছে এবং কোভিড পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার পরেও তা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে করে প্রান্তিক ছেলেমেয়েদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে— এসএফআই’র সার্ভেতে দেখা গেছে ছাত্রছাত্রীরা অফলাইন ক্লাস চাইছে, শিক্ষকরাও বারবার আবেদন করার পরেও অনলাইন এর দরজা বন্ধ হয়নি— বহু ক্ষেত্রে সিলেবাস শেষ না করেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। আসলে অনলাইন না হলে বিভিন্ন লার্নিং অ্যাপ গুলোর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে টাকা কিছুটা পূরণ করার দায়িত্ব সরকার নিজের কাঁধে নিয়েছে। তাতে ছাত্রদের পড়াশুনা শিকেয় উঠলেও ক্ষতি নেই। আসলে সরকার সেটাই চায়। সার্ভেতে উঠে এসেছে বহু শিক্ষার্থী আর্থিক অনটনের ফলে কাজে যোগ দিয়েছে। আবার বহু ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে এই লকডাউনে। কিন্তু সরকার কারোর দায়িত্ব নেয়নি। আসলে নিতেচায়নি। রাজ্যের শিক্ষাদপ্তরটাই এখন গারদের ভিতরে। এটাই দেখে বড়ো হচ্ছে বর্তমান ছাত্রসমাজ। শুধু নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের ছাত্রছাত্রীরা অপুষ্টিতে ভুগছে না, শিক্ষা ব্যবস্থা অপুষ্টিতে ভুগছে।
আমরা দেখেছি হীরক রাজার দেশে ছবিতে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়া হয়, কারণ রাজা মনে করতেন— “এরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে তত কম মানে”। তাই সরকারের এই ধারনা ভেঙ্গে দিয়ে সময় এসেছে জোট বাঁধার, সময় এসেছে তৈরি হওয়ার, দড়ি ধরে টান মেরে রাজা রানী দু’জনকেই খান খান করার পালা এবার।

