প্যান্ডেমিক ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা

প্যান্ডেমিক ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা

সায়ন বিশ্বাস

একশো বছর পর দুনিয়া জোড়া মহামারি, অতিমারি বলে থাকি, প্যান্ডেমিক। একরত্তি একটা ভাইরাস যাকে কিনা চোখে পর্যন্ত দেখা যায় না, তাকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে গোটা মানব সমাজ। অসাম্যের এই দুনিয়াতে, এই ভাইরাস নীতি সাম্যের দূত। কারণ করোনার চোখে নেই কোন বাদ বিচার, না ধর্মের, না অর্থের, না ভাষার, না গায়ের রঙের, না লিঙ্গের। রাজা ও ভিখারিকে নাকি একই লাইনে এনে দাঁড় করিয়েছে এই একরত্তি জিনিসটা। রাষ্ট্র এটাই দেখাতে চায়, আমাদের মগজে এইটাই ঢোকাতে চায়, তার পুষে রাখা মিডিয়াকে ব্যবহার করে।

সত্যি কী তাই? বাস্তব কী তবে এতটাই সরল? যে কোন পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে এই ধরনের রাজনীতি করে থাকে। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই এমন উদাহরণ অতীতের বুকে অনেক পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ যদি আমাদের দেশ ভারতবর্ষকে নিয়ে আলোচনা করা হয়, তবে আমরা মনে করি ভারতবর্ষ একটি আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা পুঁজিবাদী দেশ। কোভিড মহামারির প্রথম ঢেউতে প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন আমাদের এই ভারতে। সরকারি হিসাবে আয় কমে গেছিল প্রায় ১ কোটি মানুষের; তাদের আয় অর্ধেক হয় কোভিডের প্রথম ঢেউতে ও লকডাউনে। নতুন কাজের সুযোগ এই সময় ছিল না বললেই চলে। আয় কমলেও বা কর্মহীনতার কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলেও ব্যয় কমেনি একটুও বরং ব্যয়ের অঙ্ক এই সময় ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়। নেপথ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের কড়া দাম। ও তার পাশাপাশি চলে কালোবাজারি। এই সময় আমরা মানবতার মৃত্যু যাত্রা খোলা চোখে দেখতে পেয়েছি। আমরা দেখেছি কিভাবে পরিযায়ী শ্রমিকরা লক্ষ লক্ষ মাইল পথ পায়ে হেঁটেছে, রাস্তায় মা তার সন্তানকে জন্ম দিয়েছে। আবার এমনও দৃশ্য দেখেছি মা তার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে। এই দুর্দশার নেপথ্যে ছিল রাষ্ট্রের মাত্র ৪ ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষণা করা। এই সব সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে চেয়েছে মোমবাতি জ্বালিয়ে কিংবা কাসর ঘণ্টা বাজিয়ে। ভারতবর্ষের মতো রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কার্যত দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট, সেই রাষ্ট্রে মহামারির প্রকোপে সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে এই কথা বলা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। কিংবা এক বিরাট ষড়যন্ত্রে যার সাহায্যে রাষ্ট্র তার এই অপদার্থতাগুলোকে আড়াল করতে চায়।

মহামারির প্রথম ঢেউতে রাষ্ট্র কিছুটা নিজের অপদার্থতাকে আড়াল করতে পারল, দ্বিতীয় ঢেউতে তা পুরো দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট হয়। যাকে বলে হাটে হাড়ি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। দ্বিতীয় ঢেউতে একদিকে যেমন আর্থ-সামাজিক অবস্থা চরম দুর্দশার সম্মুখীন হয়, তেমনি অপরদিকে রাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থার ফানুষ চুপসে যায়। প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের কাছে যখন দুই বেলা খেতে পাওয়াই একটা বড় চ্যালেঞ্জ তখন চরম আগ্রাসী কোভিড ভাইরাসের কারণে প্রতিদিন নতুন করে তৈরি হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থায় হাহাকার। মিলছে না হসপিটালের বেড, চরম ঘাটতি অক্সিজেনও। একদিকে যখন কর্মহীনের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন নতুন করে, তার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হসপিটাল বেড ও অক্সিজেনের জন্য চাহিদাও। রাষ্ট্র তখন এই প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষগুলির সাথে সৎ সন্তানের মতো ব্যবহার করছে। যদিও তা তারা বরাবরই করে আসছে, কিন্তু কোভিড মহামারি যেন তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এদের প্রাণের কোনো মূল্য রাষ্ট্রের কাছে নেই। এদের প্রাণের মূল্য আছে রেড ভলেন্টিয়ারদের কাছে। যারা প্রকৃত অর্থেই সাম্যের দূত। যারা দেখেনি অসুস্থ বা ক্ষুধার্ত মানুষের ধর্মকী? বর্ণকী? লিঙ্গ কী বা ভাষা কী? রেড ভলেনটিয়ারদের কাছে এদের একটাই পরিচয় এরা মানুষ। কারা এই রেড ভলেন্টিয়ার? কী পরিচয় এদের? আসলে রেড ভলেনটিয়ার হলো অল্প বয়সী কিছু ছেলেমেয়ে যারা সাম্যের গান গায়। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতার অবলুপ্তি চায়, প্রতিষ্ঠা করতে চায় সমাজতন্ত্র। ভারতকে গড়ে তুলতে চায় সমাজতন্ত্রী দেশ হিসাবে। যেখানে ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, বর্ণ ও অর্থনৈতিক বিভেদ থাকবে না। মানুষের প্রথম পরিচয় হবে মানুষ হিসাবে। তাই তারা ছুটে বেরিয়েছে এই করোনাকালে, কখনও অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে, কখনও আবার শ্রমজীবী ক্যান্টিন বা শ্রমজীবী বাজার তৈরির মাধ্যমে। দরিদ্র মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে এরাই। নতুন যৌবনের এই সব দূতরাই পারবে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী নরখাদকদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে উদ্ধার করে ভারতবর্ষের আপামর খেটে খাওয়া জনগণকে সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ উপহার দিতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *