বিশ্বমানবতার দূত রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বমানবতার দূত রবীন্দ্রনাথ

  • ঋতঙ্কর দাস

রবীন্দ্রনাথ। নামটি উচ্চারনের সঙ্গে সঙ্গে আপামর বাঙালির হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এক অতিমহামানৱীয় ব্যক্তিত্বের চিরজ্বাজল্যমান বাঙময় সুমহান উপস্থিতি। কিন্তু তিনি কি শুধুই বাঙালির? শুধুই ভারতের? উত্তরটা আমাদের সবার জানা। দেশ-কাল-সীমানার কোন গন্ডিতেই তাঁকে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি বিশ্বের। তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র। যদিও তিনি নিজে বলেছেন, ‘‘আমার কবিতা হলেও বহুপথগামী, হয়নাই তা সর্বত্রগামী।’’ তিনি শুধু কবি সার্বভৌম নন কিংবা কেবলই সাহিত্যের বহুমুখীধারায় অতুলনীয় সৃষ্টিসম্ভারের সৃষ্টিকর্তা হিসেবেই পূজিত নন। তিনি আক্ষরিক অর্থেই এক ভীষণ রকমের ব্যতিক্রমী। তিনিআমাদের পরম ও চূড়ান্ত আশ্রয়। ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনের যেকোন সংকটঘন মুহূর্তে আমরা অবলম্বন করি তাঁকে, আশ্রয়খুঁজিতার দর্শনে, অচেনা অজানা পথে আলোর পথযাত্রী হই তাঁরই লেখনী নিঃসৃত ও নির্দেশিত পথে। তিনি আমাদের প্রাণের সম্পদ, তিনি আমাদের অহংকার। প্রকৃতি, প্রেম, পূজা, স্বাদেশিকতা, বিশ্বমানবতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মঞ্চ – সর্বত্র তাঁর অবাধ বিচরণ। বিশ্বমানবতার চরম সংকটে মানবতার জয়ধ্বজা ঊর্ধ্বেতুলে ধরার সংগ্রামে তিনি থেকেছেন সদা সক্রিয়, অনুপ্রাণিত করেছেন সংগ্রামী জনগণসহ সংগ্রামের বহমান ধারাকে। আর তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই তারই একশ ষাটতম জন্মবার্ষিকীতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি তার সেই বিশ্বমানবতাবোধের দর্শন উৎসারিত অমূল্য রচনাগুলির রত্নভাণ্ডার থেকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘‘মানবসমাজের সর্বপ্রধান তত্ব মানুষের ঐক্য। সভ্যতার অর্থই হচ্ছে একত্র হওয়ার অনুশীলন।’’ কিন্তু একথা অনস্বীকার্যযে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি সভ্যতাকে প্রগতির পথে বহু এগিয়ে দিলেও মানুষের মনজগতের অন্ধ তমশা দূর হয়নি। অতীতের মত আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে স্বার্থান্ধ যুদ্ধ লোলুপতা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন মানুষের ঐক্যের পরিপন্থী হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথই বলেছেন, ‘‘মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ বলে মনে করি।’’ তাঁর এই মোনভাব তিনি আরও দ্যার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন ‘‘সভ্যতার সংকট’’ অভিভাষণে। যেখানে তিনি বলেন, ‘‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’’ দেশ তথা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিপদ যখনই মানবতাকে করেছে বিপন্ন, তখনই গর্জে উঠেছে বিশ্বনাগরিক কবির উদাত্ত কণ্ঠ। তাঁর সর্জনশীল বহুৰচনায় তিনি যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও অভিসম্পাত জানিয়ে তার ধংসকামনা করেছেন এবং গেয়েছেন বিশ্বমানবতার জয়গান। দ্বিতীয়মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই তিনি ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। ফ্যাসিস্টদের নগ্ন আক্রমণ ও আগ্রাসনকে ধিক্কার জানিয়ে তিনি রচনা করেছেন একের পর এক কবিতা। ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের খবরে বিচলিত কবি হৃদয় সৃষ্টি করে বিখ্যাত আফ্রিকা কবিতাটি।আবিসিনিয়া যুদ্ধচলাকালীন স্পেনে ফ্যাসিস্টদের আক্রমণ এবং তার কিছুকাল পরেই জাপানের চীন আক্রমণ। এই পৈশাচিক তান্ডবলীলার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি রচনা করেন দুটি অবিস্মরণীয় কবিতা, যার প্রথমটিতে ধ্বনিত হয় কবির কণ্ঠে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বান। এখানে তিনি বলেন ‘‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস / শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস। / বিদায় নেওয়ার আগে তাই, ডাক দিয়ে যাই / দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে / প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’’ আবার দ্বিতীয়টিতে কবির ঐকান্তিক প্রার্থনা – ‘‘….মহাকাল সিংহাসনে সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে, কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবানী, শিশুঘাতী নারীঘাতী কুৎসিত বীভৎসা পরে ধিক্কারহানিতে পারি যেন নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের হৃদ্স্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে নিঃশব্দে প্রছন্ন হবে আপন চিতার ভষ্মকালে।’’ ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন ও নগ্ন বর্বর আক্রমণ সত্ত্বেও ইঙ্গ-ফরাসি জোট ও লীগ ও নেশনস্ -এর পান্ডাদের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্ত নিষ্ক্রিয়তাকে তীব্র বঙ্গবিদ্রুপে আক্রমন করে কবির লেখনী বলে ওঠে – ‘‘….দেখিলাম একালের আত্মঘাতী মূঢ় উন্মতত্ত্বা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার বিকৃতির কদর্য বিদ্রুপ। একদিকে স্পর্ধিত ক্রুরতা, মত্ততার নির্লজ্জ হুংকার, অন্যদিকে ভীরুতার দ্বিধাগ্রস্ত চরণবিক্ষেভ, বক্ষে আলিঙ্গিয়া ধরি কৃপণের সতর্ক অবলম্বন, সন্ত্রস্ত প্রাণীর মতো খনিক গর্জন অন্তে ক্ষীণস্বরে তখনই জানায় নিরাপদ, নীরব নম্রতা। রাষ্ট্রপতি যত আছে পৌঢ় প্রতাপের, মন্ত্রীসভাতলে আদেশ নির্দেশ রেখেছেনিস্পিষ্ট কবি রুদ্ধওষ্ঠ – অধরে চাপে সংশয়ে সংকোচে।’’ এর অনতিকাল পরেই বিশ্বপরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকে। হিটলার অস্ট্রিয়া দখলের পর সুদেনতেন নিয়ে চেকোশ্লোভাকিয়ার সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া শুরু করেন। হিটলার-মুসোলিনির তখন গভীর সক্ষতা। এরই মধ্যে স্পেন ও চিনের রণাঙ্গন থেকে একটার পর একটা বিপর্যয় সংবাদ আস্তে থাকে। এই সময়েই কবি তাঁর জন্মদিনে ফ্যাসিস্টদের এই বিশ্বগ্রাসী বিভৎস পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে তীব্রে ঘৃণা জানিয়ে রচনা করেন ‘‘জন্মদিন’’ শীর্ষক কবিতাটি। যেখানেকবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘‘ক্ষুব্ধ যারা, লুব্ধ যারা, মাংসগন্ধ মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনাকুন্ড তব ঘেরি বীভৎস চিৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি, নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি, শুনি তাই আজই মানুষ জন্তুর ছুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি’’। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এই নাটকীয় রূপ কবিকে ক্ষুব্ধ ও ভয়ঙ্কর অস্থির করে তোলে। ফ্রান্সের পতনের খবর পেয়ে তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে এক তার বার্তায় আমেরিকার হস্তক্ষেপের অনুরোধে জানান। এই সময় কবির হৃদয়ের অবস্থা উপলব্ধি করা যায় অমিয় বাবুকে লেখা এক চিঠিতে। যেখানে তিনি লেখেন ‘‘ডারউইন বলেছিলেন বানরের অভিব্যক্তি মানুষ, কিন্তু মানুষের অভিব্যক্তি এ কোন জানোয়ার…!’’ চেক-সুদেনতেন নিয়ে ইউরোপে ঘনীভূত হয়ে ওঠা মিউনিখ সংকট নিরসনে হিটলারকে তুষ্ট করার জন্য চেম্বারলেন গোভেসবার্গ ও মিউনিখে ছোটাছুটি করে নাকি ব্যর্থ হন। অবশেষে হিটলারের সমস্ত দাবি মেনে নিয়ে স্বাক্ষরিত হয় মিউনিখ চুক্তি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কবি তখন শান্তিনিকেতনে। মিউনিখ চুক্তি ও নাৎসি জার্মানির বিজয়ল্লাস কবিকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও বিচলিত করে তোলে। ফ্যাসিস্ট আক্রমণে দলিত নিষ্পিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে কবি এই সময়কালেই রচনা করেন তার ‘‘প্রায়শ্চিত্ত’’ কবিতাটি। সেখানে কবি বলেন ‘‘প্রতাপের ভোজে আপনারে যারা বলি করেছিল দান। সে দুর্বলের দলিত পিষ্ঠ প্রাণ। নরমাংসাশী করিতেছে বাড়াবাড়ি, ছিন্ন করেছে নারী। তীক্ষ দশনে টানা হেঁড়া তারি দিকে দিকে যায় কেঁপে। রক্তপাকে ধরার অঙ্ক লেপে’’ অমিয় চক্রবর্তীর লেখা আরেক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘‘মানব ইতিহাসে ফ্যাসিজম আর নাৎসিজিমের কলঙ্ক আর সহ্য হয় না।’’ সবচেয়ে বেদনা পাই চীনের জন্য।…. সহায় শূন্য চীন লড়ছে শূন্য হাতে, কেবল তার নির্ভীক বীর্য ভর করে। প্রখ্যাত রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রচনা থেকে জানা যায়, (১৯৪০ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ) কবি তখন মৃত্যু শয্যায়। তবু উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশান্ত মহালনবিশের কাছে কবি বারেবারে জানতে চাইছেন- ‘‘কি পরিস্থিতি রণাঙ্গনের?’’ প্রশান্ত মহলানবিশ জানান ‘‘এখনো এগিয়ে চলেছে দস্যু বাহিনী।’’ কবি ডুবে যান নীরব বিষন্নতায়।… অবশেষে সংজ্ঞা এলো কবির। চোখে একই স্বপ্ন। কিন্তু প্রশান্ত মহলানবিশের উত্তর এবার ভিন্ন – ‘‘সোভিয়েত বাহিনী প্রতিরোধ শুরু করেছে।’’ রবীন্দ্রনাথ উৎসাহে অধীর হয়ে ওঠেন, বলেন ‘‘পারবে, দানবকে ঠেকাতে ওরাই পারবে।’’ বাকিটা ইতিহাস। ফ্যাসিবাদের পৈশাচিকতার থেকে দুনিয়াকে মুক্ত করার লাল ফৌজের মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। পৃথিবীকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে বাঁচানোর ইতিহাস…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *