হাজার হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ
- দেবাঞ্জন দে
লাখো বারুদ ঠাসা বুকে, শত রক্তবীজের ফাঁকে, যারা আগুন নিয়ে বাঁচে, ঝোড়ো আগুন ডাকে তাকে! আগুনের অক্ষর নিয়ে হাঁটতে থাকা আনিস আজ মাটির উত্তাপে চিরশায়িত। কারণ, সুদীপ্ত, মইদুলের পথ ধরে প্রতিরোধের আওয়াজে ডেসিবেল বাড়িয়েছিলো আনিস। এলাকার অন্ধকার জঙ্গলরাজের বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছিলো আলোর প্রমিথিউস। ক্যাম্পাসে হাজার হৃৎপিন্ডের আওয়াজে দাবানল গড়েছিলো হোস্টেলের দাবিতে, স্কলারশিপের দাবিতে। এনআরসি-এনপিআর-সিএএ’র মতো ভাগের রাজনীতির বিরুদ্ধে তিলতিল করে যোগ করেছিলো মানুষের ব্যারিকেড। ক্রেডেনশিয়ালের এটুকুই শাসকের হাঁটু কাঁপার পক্ষে যথেষ্ট। থেঁতলে যাওয়া মাথা তাই আনিসেরও পরিণতি, সুদীপ্ত’র মতোই। রাতের অন্ধকারে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়া উর্দিধারী শিকারীর! শিকারের গন্ধে গন্ধে সোজা তিনতলায়! তারপর… আনিসের নিথর দেহটুকুও হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। ঘাতক সরকারটা খুনের তালিকায় বাড়িয়েছে একটার পর একটা দাগ। যেখানেই প্রতিরোধ, যেখানেই প্রতিবাদ, সেখানেই রক্তস্রোতের বন্যা। মাননীয়ার SIT পাঁচদিন পরে অ্যাকশনে নামলো ছাত্র আন্দোলনের চাপে। নেমেই প্রথম কাজ, প্রমাণ লোপাট! পনেরো দিন তো দুরস্ত, পঞ্চাশ দিন পার করেও নেই কোনো রিপোর্ট। নেই কোনো ইনসাফ। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই সংগঠিত করল আনিসের বাবা, মা, ভাই, বন্ধু, কমরেডরা। সুটব্যুট পড়া এজেন্টদের কোটি টাকার অফারেও বেঁকছে না সন্তানহারা বাপের টানটান শিরদাঁড়ার জোর। এদিকে এই পঞ্চাশ দিনেই রাজ্যজুড়ে লাশের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিরিশ। প্রতিটা লাশের নাম আলাদা, পরিচয় আলাদা, তবে খুনীর নাম এক- তৃণমূল কংগ্রেস। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত করে, দেদার গুন্ডারাজের মুক্তাঞ্চল কায়েম করাই ওদের প্রধান লক্ষ্য। আলিয়া এখন টার্গেট। বরাদ্দ বন্ধ করে, স্কলারশিপ আটকে দিয়ে, হোস্টেলে তালা ঝুলিয়ে, দিনের পর দিন ক্যাম্পাস ক্রিমিনালদের দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবেশটাই নষ্ট করে দিতে চায় ওরা। নষ্ট করে দিতে চায় বাংলার মাটিতে রক্তঘাম দিয়ে গড়ে তোলা সংখ্যালঘু মানুষের শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার। কাটমানির সাম্রাজে ঢিল ছোড়া মানেই ঝাঁক ঝাঁক শিকারী নেমে পড়বে শিকারে। শিকারীদের ভরসা জোগাবে দেশজুড়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের কন্ঠগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রধান ক্যাপ্টেন বিজেপি। যে সংস্কৃতি গায়েব করে দেয় নাজিবকে, হত্যা করে রোহিতকে, রক্তস্রোতে ভাসিয়ে দেয় অভিমন্যু, ধীরাজ’কে, মারতে মারতে গুঁড়ো করে সায়ফুদ্দিনের শরীরের প্রতিটা হাড়, বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয় তিলক, অভিজিৎ’দের, সেই একই সংস্কৃতি রাতের অন্ধকারে হত্যা করে আনিস’কে। বোমা, বন্দুক, বারুদের গন্ধে ওরা দমিয়ে রাখতে চায় বাংলার প্রতিবাদী সত্তাকে। আর এমনই বেপরোয়া সে সত্তা, যে বারবার জন্ম হয় আনিসের। ঐ রাজপথেই, ঐ টিয়ার গ্যাসের গন্ধেই, ঐ রক্তে লেখা সংগ্রামী ব্যানারেই। মিছিলে মিছিলে আওয়াজের ঢেউ তোলে, ‘‘সুদীপ্ত থেকে আনিস, ইনসাফ চাই’’। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের কানে কানেই রটিয়ে দেওয়া হয়, ‘‘আমরা ওদের শেষ দেখে ছাড়বো’’।


