ছোট্টো ইস্কুল
অনিন্দিতা দেব
এক ইস্কুলের গল্প বলি তবে? কুল নেই, জাত নেই, নিজের একটা ঘর নেই, পাঠের কোনো ক্রম নেই। যা যা থাকার নেই বলতে তার কিছুই, তবু এই নেই’র সাতকাহন পেরোলে পরে দেখতে পাবেন ভালোবাসা, উদ্যম, স্নেহ, জেদ, সততা, আনন্দ, উদযাপন, আর দেখতে পাবেন দূর থেকে ছুট্টে আসা ট্রেনের হাওয়ায় দুলতে থাকা, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ছোটো ছোটো হাতের ছাপ মাখা সাদা কাপড়ের টুকরো, ওপরে এবড়োখেবড়ো ভাবে লেখা দুটো শব্দ – ‘সহজ পাঠ’।
বহুদিন’ই আমাদের ভাবনায় ছিল এলাকায় যদি একটা পড়ানোর জায়গা করা যায়, সবাই আসবে, পড়বে, শিখবে, শেখাবে। মূলধন পড়ার ইচ্ছে, ট্যাকের জোর নয়। এই আমরা মানে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন বিরাটি পূর্ব বিশরপাড়া লোকাল কমিটির কাচ্চা বাচ্চারা। কিন্তু হচ্ছেহবে করে হয় আর না। শেষে ঝোঁকের বশেই গত বছর মার্চ মাসে নেমে পড়া হল, স্থান বিরাটি রেলস্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পরের যে রেলকলোনী। কিন্তু ভাবলেই তো হবে না। আমরা গেলেই বা শুনছে কে? ত্রাতা হয়ে এল চিন্ময়দা, ওখানেই থাকে, একটা দোকানে কাজ করে। চিন্ময়দাকে বলতেই আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রেলকলোনীতে। কলোনী বলতে একটা সাকুল্যে একফুট চওড়া এবড়ো খেবড়ো রাস্তা, এক পাশে রেললাইন, অন্য পাশে সার দিয়ে টিনের চালের ছোটো বড় ঘর। অধিকাংশ ঘরের মেঝে কাঠের, তার নীচে হাইড্রেন। আমরা ভাগ ভাগ করে বাড়ি বাড়ি গেলাম, কথা বললাম। এক দাদা তার এক কামরার দশফুট বাই বারোফুটের ঘরটাই দিয়ে দিল পড়ানোর জন্য, ঠিক হল ১৫ই মার্চ থেকে ক্লাস চালু হবে। দেখতে দেখতে ১৫ই মার্চ হাজির, আমরাও দুরুদুরু উপস্থিত। ওমা! গিয়ে দেখি ঘর ভো ভাঁ, দু’জন কেবল এসে বসে রয়েছে। আমরা তো পারলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে বসি। আবার মুশকিল আসান সেই চিন্ময়দা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রায় ধরে বেঁধে আনল বাচ্চাদের। তবে ওই প্রথম, ওই শেষ। এরপর আর ধরে বেঁধে আনতে হয়নি। ভাবছেন ঢপ দিচ্ছি, একদিন চলে আসুন না, চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে যান।
তা ক্লাস তো শুরু হল। প্রথম দিন বোর্ডও নেই। ঘরেও সব আঁটছে না। পরের সপ্তাহে বোর্ডের ব্যবস্থা হল। আর কয়েকমাসের মধ্যে আরেকটু বড়ো একটা ঘর। এক অভিভাবক নিজেই তার বাড়ির একটা ঘর ছেড়ে দিল আমাদের জন্য। চলতে থাকল একটা ঘরেই দুটো ক্লাস, খাটের ওপর একেবারে গেড়ি গুগলি আর মেঝেতে একটু বড় পড়ুয়ারা। মাস্টারও একাধিক, কেউ পড়াচ্ছে এবিসিডি, তো কেই পার্টস অফ স্পিচ।
বাচ্চার জন্মের পর যেমন কিছুদিন নাম ছাড়াই চালিয়ে নেয়, আমাদের স্কুলের অবস্থাও হয়েছিল অমনই। ধাম যদিও বা জুটল, নাম আর জোটে না। শেষে ঠিক হল নাম হোক সহজ পাঠ। আর নামকরণের সার্থকতায় দশে দশ পেতে শুরু হল নিরন্তর পরিশ্রম। আসলে এই ইস্কুলের শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল বাচ্চাদের সহজে ইংরেজি শেখানো, ওদের মানসিক গঠনে জোড় দেওয়া, সচেতনতা বাড়ানো, আর এসবের জন্য মজার ছলে পড়ানো। তাই একদিনের পড়ানোর যোগারজন্তর চলত এক সপ্তাহ। কোনোদিন গ্রামারের ওয়ার্কশিট, তো কোনোদিন সবাই মিলে গল্প লেখা, অন্যদিন আবার নিজেরা মিলে নাটক করা। এভাবে মজার ছলে এরা ইংরেজি ব্যকরণ শিখেছে। বন্ধুত্ব নিয়ে ক্লাসে বসে নিজেরা নাটক লিখে অভিনয় করেছে আলাদা আলাদা গ্রুপ করে। ক্লাস শেষে হাত ধরাধরি করে বাড়ি গেছে সেই দু’জনে যারা আগের সপ্তাহেই ঝগড়ার পর ‘জন্মের আড়ি’ করে গোটা ক্লাস মুখ গোমড়া করে বসেছিল। তিলোত্তমার হত্যার প্রতিবাদে যখন সারা পৃথিবী উত্তাল, এই রেলকলোনীর টিনের চালের সপ্তাহান্তের ইস্কুলে হয়েছে গুড ব্যাড টাচের ক্লাস, লিঙ্গ সচেতনতার ক্লাস, ওদের ভাষায়, ওদের মতো করে। বাচ্চারা নিজেদের মতো করে এঁকেছে পোস্টার। সেই পোস্টার আমরা সবার মিলে হইহই করে স্টেশনের পাশে বাঁশ বেঁধে টানিয়েছি। সঙ্গে হয়েছে রেলকলোনীর সব মায়েদের নিয়ে একটা আলোচনা সভা। মায়েদের কথায় উঠে এসেছে প্রতিদিনের জীবনের যন্ত্রণার কথা, নিরাপত্তাহীনতার কথা, বাচ্চাদের সুন্দর স্বাভাবিক ভবিষ্যতের কথা। না, আমরা ওই অঞ্চলের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য খুল্লামখুল্লা সংগঠনের পতাকা নিয়ে কাজ করতে পারিনি কখনো, অনতিকালের মধ্যে সেরকম সম্ভাবনাও নেই। তবু একদিনের জন্য ইউনিটের কোনো সদস্য আদর্শ থেকে সড়ে আসেনি, বরং এমনভাবে বামপন্থার আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচার চালিয়ে গেছে অবিরত। প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সচেতনতার বীজ, প্রতিরোধের বীজ। চলছে অপেক্ষা চারাগাছের, চলছে অপেক্ষা বটগাছের।
এই উদ্যোগ সম্ভব হত না যদি না বহু মানুষ খোলা মনে অর্থ সাহায্য করতেন। আমরা চেষ্টা করেছি বাচ্চাদের প্রয়োজনমতো খাতা, বই, পেন, পেনসিল কিনে দেওয়ার। গড়ে তুলেছি একটা ছোট্টো পাঠাগার, বাচ্চাদের খানকুড়ি বই। এরই মধ্যে হয়ে গেছে পিকনিক, রবীন্দ্রজয়ন্তী। আপাতত হতে চলেছে ইস্কুলের প্রথম বর্ষপূর্তির উদযাপন। বাচ্চারা রোজ মহা আনন্দে কাগজ কাটছে ঘর সাজাবে বলে। আমরা মোটের ওপর নীরব দর্শক। ছাত্রছাত্রী এই একবছরে নয় থেকে বেড়ে কুড়ি। এভাবেই আমাদের ছোট্টো ইস্কুল তিরতিরিয়ে বয়ে চলছে, যেমন করে বয়ে চলে আনন্দ, ভালোবাসা এই বিষাদের দুনিয়ায়। তাই আপনার যদি মন খারাপ থাকে নির্দ্বিধায় কোনো এক রোববার চলে আসুন আমাদের ইস্কুলে। মন ভালো হওয়ার গ্যারান্টি দিচ্ছি। ভাবছেন আসবেন কী করে? রোববার সকাল আটটা থেকে দশটার মধ্যে ট্রেনে করে বিশরপাড়া থেকে বিরাটি আসার পথে, ট্রেনের দরজায় দুলতে দুলতে আসার পথে, রেললাইনের ধারে ঠিক যেখানে ট্রেনের যান্ত্রিক আওয়াজ ছাপিয়ে একদল কচি গলার প্রাণ খোলা হাসির আওয়াজ পাবেন, সেখানেই আমাদের ছোট্টো ইস্কুল, ঠিকানা সহজ পাঠ, প্রযত্নে ভালোবাসা।

