ফ্যান্টাসি গেমিং’র ইতিবৃত্ত

ফ্যান্টাসি গেমিং’র ইতিবৃত্ত

সৌতক সরকার


সম্প্রতি পৃথিবীর বৃহত্তম ও সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্রিকেট লীগ ‘আইপিএল ২০২৫’ শুরু হয়েছে। আইপিএল শুরু হওয়ার সাথে সাথে দেশজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয় তা অন্য বছরগুলোর মতো এই বছরেও স্পষ্টরূপ ধারণ করেছে। খেলাধুলা নিয়ে, কিংবা আরো নির্দিষ্টভাবে ক্রিকেট নিয়ে যে মাতামাতি তা ভারতবর্ষের মাটিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এই ক্রিকেটের পাশাপাশি নতুন যে ঝোঁক এই প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে তা হলো অনলাইন বেটিং দুনিয়ায় প্রবেশ। শুধু ক্রিকেট বললে ভুল হবে ফুটবল, হকি, বাস্কেটবলসহ অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস্-এর বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা আমাদের চোখে পড়ার মতো।
একবিংশ শতকের তৃতীয় দশক চলছে। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় প্রত্যেক সময়েই একদল মানুষ বা গোষ্ঠী অন্যদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন নতুন চিন্তা-ভাবনা আমাদের সামনে এনেছে। তারই মধ্যে অন্যতম চতুর ভাবনাই হলো জুয়া।‌একটু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে প্রথম এর শুরুয়াত মেসোপটেমিয়ায় প্রাচীনতমছয়-পার্শ্বযুক্ত পাশা প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। পরবর্তীতে সময়ের পথ বেঁয়ে এই খেলা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রেট ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, জাপান, আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে তাকালেও এর প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ করা যায় মহাভারত মহাকাব্যের দিকে তাকালেই, জুয়ার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়, একই সাথে এর ধ্বংসাত্মক দিকগুলো তুলে ধরে। এর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দুর্নীতি,অধিক ঋণগ্রহণ, পতিতাবৃত্তি, সাধারণ জনসাধারণের অনৈতিকতার মতো প্রভাবগুলিও উল্লেখ্য।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই জুয়া খেলার প্রকৃতি পাল্টেছে। কিন্তু খেলার ধরণ, রকমের বদল হলেও এর চারিত্রিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং শোষণ, হয়রানির মাত্রা আরো বেশ খানিকটা বেড়েছে।
বহুযুগ ধরে চলে আসা একাধিক অন্যায়, জালিয়াতি-কে এই সময়ে পুঁজিবাদ নতুন মোড়কে হাজির করছে আমাদের কাছে। তাদের মধ্যে পোস্ট লকডাউন প্রোডাক্টটি হলো ‘অনলাইন প্রেডিকশন অ্যাপ’। একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায়, একটি ম্যাচে (ধরা যাক ক্রিকেট) দুটো প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে শীর্ষ ১১ জনের একটি টিম বানাতে হবে উভয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়েই। তাদের মধ্যে সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ দুই খেলোয়াড়কে বানাতে হবে ক্যাপ্টেন এবং ভাইস ক্যাপ্টেন; যাদের পয়েন্ট যথাক্রমে দ্বিগুণ এবং দেড়গুণ বৃদ্ধি পাবে বাকিদের তুলনায়। প্রত্যেকটি প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট পয়েন্ট টেবিল আছে যা অনুযায়ী খেলা চলাকালীন তারা পয়েন্ট পায়। এই কন্টেস্টগুলোর প্রবেশমূল্য পাঁচটাকা থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকা‌ পর্যন্ত হতে পারে। খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত সমস্তটুকু প্রবেশমূল্য প্ল্যাটফর্মের হাতে থাকে। শেষ হলে, জয়ী ব্যক্তিরা পুরষ্কৃত হয়।‌ খুব সাধারণ চোখে দেখলে এই ধারণাকে সাধুবাদ জানানো ছাড়া অন্য কিছু মাথায় আসে না। কিন্তু একটু গভীরে ঢুকলে আমাদের চোখে পড়বে আসল রহস্য। এইরকম অনলাইন‌ গেমিং কোম্পানিগুলো মূলত‌ আমেরিকা দ্বারা পরিচালিত। ওরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যেখানে একমাত্র বিজয়ীরা নিজেরাই। তারা ঝুঁকি নেয় না। কিন্তু যারা এই খেলায় নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করছে গোটা খেলাটাই হয় তাদের কাঁধের উপর বন্দুক চালিয়ে। এই গেমিং এককথায় কারচুপির খেলা, আপনি যত ভালোই টিম বানিয়ে‌ ফেলুন না কেন শেষ অবধি গেলে দেখতে পাবেন সহস্রাধিক একাউন্টের মধ্যে এমন একটা আছে (বট্ প্লেয়ার; প্ল্যাটফর্ম দ্বারা নির্মিত), যে হুবহু নিঁখুত টিম বানিয়েছে । আপনার তো লাভ হলোই না বরং পুরস্কারের প্রতি আসক্তির থেকে আরো বেশি করে খেলায় নিমজ্জিত হতে দেখা যায় এবং কোম্পানিই শেষ অবধি মুনাফা লাভ করে। এই ফ্যান্টাসি স্পোর্টস পুঁজিবাদী শোষণের আরেকটি মাধ্যম মাত্র। রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখে এখনও একে সাধারণত জুয়ার একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না , এই ধরণের খেলা মূলধারার জুয়ার তুলনায় অনেক কম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এটি একটি অবিশ্বাস্যভাবে লোভনীয় বিষ যা সিস্টেমকে সচল রাখে এবং নিশ্চিত করে যে এটি করার জন্য যারা মূল্য দেয় তাদের দেওয়ার কিছু নেই। অনলাইনে এইপ্রকার অ্যাপসের সহজলভ্যতা রয়েছে। যে কেউ চাইলেই সহজেই সফটওয়্যার সেটআপ করে ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট করে এই অনলাইনে জুয়া খেলতে পারেন।এই তরুন বা তরুনীটি যে সামান্য কিছু উপার্জন করে সপ্তাহের পকেটমানিটুকু আর সামান্য বাড়ানোর কথা ভেবেছিল সে নিজের গচ্ছিত টাকা হারায় এবং তার লোকসানের পিছনে ছুটতে থাকে। সে হারানো সমস্ত কিছু ফিরে পেতে তার বাজি দ্বিগুণ করে। এবং হারায়। শেষ অবধি ক্ষতি ও লজ্জা ছাড়া আর কিছুই ছেড়ে দেয় না বরং তাকে চিরকালের জন্য জর্জরিত হতে হয় এবং পুঁজিবাদী যন্ত্রে জাঁতাকলে পিশে যেতে হয়।
ফ্যান্টাসি গেমিং-এর মূল দ্বন্দ্বটাই হলো দক্ষতা বনাম ভাগ্যের। ভারতীয় আইনে এই খেলা “দক্ষতার খেলা” বিভাগে পড়ে, যা আইনত অনুমোদিত। এগুলি ১৮৬৭ সালের পুরাতন পাবলিক জুয়া আইন দিয়ে শুরু হয় যা ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত পাবলিক জুয়া ঘর এবং যেকোনো ধরণের জুয়াতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার জন্য। ফ্যান্টাসি স্পোর্টসের ফলাফল কেবল দৈবক্রমে নির্ধারিত হয় না বরং খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যান, ফর্ম এবং বাস্তব জীবনের পারফরম্যান্স দ্বারা নির্ধারিত হয়। কিন্তু সবকিছুর পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়, রক্তমাংসে গড়া কোনো মানুষের নির্দিষ্ট দিনের পারফরম্যান্স কি পূর্ব ভবিষ্যদ্বাণী করা যেতে পারে? যদি নাই পারা যায় তা হলে তা কিভাবে ‘গেম অফ লাক’ এর বদলে ‘গেম অফ স্কিল’ হয়?
এখন বলা যেতে পারে এই জুয়ার চাকাকে থামাতে রাষ্ট্র এক্ষেত্রে কি কোনো সদর্থক ভূমিকা নিচ্ছে? খুব সহজ উত্তর, না।
সরকার যেকোনো অঙ্কের টাকা জেতার উপরে ৩০ শতাংশ কর রাখছে। কর দিয়ে বৈধ ভাবে গেমিং ব্যবসাকে সুযোগ করে দিলে নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে সে দিকে ঝুঁকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তারকা ক্রিকেটাররা বিভিন্ন ফ্যান্টাসি গেমের প্রমোশনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞাপনে মহেন্দ্র সিং ধোনি, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, বিরাট কোহলির মতো ক্রিকেটারদের মুখ দেখা যায়। তাঁদের মুখ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শিশু এবং যুবকরা এই গেম খেলতে উৎসাহিত হয়ে পড়ে। অজ্ঞতার কারণে অনেকেই এর পিছনে প্রচুর অর্থ নষ্ট করে। অর্থ হারিয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেঁচে নিয়েছে। সরকার যদি পুরোপুরি ফ্যান্টাসি গেম বন্ধ করে দেয়, তাহলে কিন্তু ক্ষতির চেয়ে লাভ হবে বেশি। কিন্তু তার বদলে আইপিএল-এর মত টুর্নামেন্টগুলোতে স্পন্সরশীপ নিতে ব্যস্ত এই কোম্পানিগুলোর থেকে।
গবেষণা বলছে, জুয়ার নেশা মদ বা ধূমপানের নেশার মতো নয়। বাইরে থেকে দেখে এর উপসর্গগুলির আন্দাজ পাওয়াও কার্যত অসম্ভব। কিন্তু জুয়ার নেশা ডেকে আনতে পারে গুরুতর মানসিক সমস্যা। বিশেষত দাম্পত্য ও সামাজিক জীবনের জুয়ার নেশা অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জুয়ার নেশা জন্ম দিতে পারে অপরাধ প্রবণতাও। গবেষকরা বলছে ১৬-৩০বছরের বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে জুয়ার চেহারা বদলে গিয়েছে। বর্তমানে ঘরে বসেই মোবাইল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জুয়ায় অংশ নেওয়া যায়। কাজেই যদি দেখা যায় যে, কারও এই ধরনের খেলার প্রতি আসক্তি তৈরি হচ্ছে, তবে অবিলম্বে মনোবিদদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে আর্থিক, সাইবার এবং গেমিং পোর্টাল ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে এই ক্ষেত্রে। সঙ্গে নতুন সংযোজন হয়েছে বিদেশের বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের ঘটনাগুলো।
আজকের সময়ে আমাদের প্রকৃত শিল্পের প্রয়োজন; জুয়ার মতো মিথ্যা শিল্পকে লালন করার প্রয়োজন আমাদের সমাজে নেই। এইগোটা গেমিং সিস্টেমকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এক উন্নততর সমাজের পথে আমাদের উত্তরণ হবে অন্যথা গোটা সমাজকে বিপথে চালনা করার যে প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে আমাদের দেশে শুরু হয়েছে তা সফল হওয়ার থেকে আটকাতে আমরা অপারক থাকবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *