কিছু কথা, কিছু কাজ
দেবাঞ্জন দে
আমাদের দেশের গণশিক্ষার কাঠামোটির দার্শনিক বুনন সর্বজনীন স্বার্থে হলেও, কালক্ষেপে তা মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পর্যবসিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও যেটুকু গণতান্ত্রিক পরিসর অবশিষ্ট ছিল দেড় দশক আগে তাও ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেমন বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষাক্ষেত্রের সীমাহীন দুর্নীতি। কেন্দ্র-রাজ্য দুই সরকারই অক্লেশে দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে তুলছে। পকেট ভরছে সরকারি দলের নেতা মন্ত্রীদের। মুনাফার পাহাড় চড়ছে কিছু একচেটিয়া বেনিয়া। আর সাধারণ মানুষের কপালে জুটছে শুন্যডালি। আর পাঁচটা দুর্নীতির সাথে শিক্ষা দুর্নীতির তফাৎ হলো, শিক্ষার সর্বনাশ হলে দেশ গঠনের প্রতিটি উপাদান ভেঙে পড়ে। দেশ ভাবনা বিপন্ন হয়।
দেশের মাথায় বিজেপি-আরএসএস পরিচালিত কর্পোরেট স্বার্থে চলা সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার উপর বহুমাত্রিক আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য ছিল বিবিধ। এক, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে খোলাবাজারের পণ্যে পরিণত করে কর্পোরেট মুনাফার পথ প্রস্তত করা। দুই, শিক্ষার মেশিনারিকে হিন্দুত্বের মগজধোলাইয়ের অস্ত্রে রূপান্তরিত করা। তিন, জ্ঞানচর্চার গুরুত্বকে লঘু করে দিয়ে বাজার চাহিদা ভিত্তিক সস্তার শ্রমিক উৎপন্ন করা। এই লক্ষ্যেই শিক্ষাকে নয়া ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য উপকরণ করে তোলা হচ্ছে। নয়া উদারনীতির আবশ্যিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মেনেই শিক্ষার মধ্যে প্রবেশ করছে দুর্নীতি। সম্প্রতি নেট এবং নীট পরিক্ষার দুর্নীতি জনসমক্ষে এসেছে এবং তা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু এই প্রকাশিত খতিয়ান হিমশৈলের চূড়া মাত্র। হিমশৈলের পূর্ণ স্বরূপ উদঘাটন করতে হলে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর দার্শনিক এবং বস্তুগত গতিবিধি অনুধাবন করা প্রয়োজনীয়।
অনুরূপভাবে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাও গহীন অন্ধকারমগ্ন। শিক্ষা কাঠামোর প্রতিটি উপাংশ দুর্নীতিতে জর্জরিত। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে স্কুল স্থাপন, সীমাহীন অবৈধ লেনদেনের ভিতেই দাঁড়িয়ে আছে রাজ্যের শিক্ষার সালতামামি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুরমুশ করে সেই ভগ্ন কাঠামোর আধারেই নির্মিত হচ্ছে দুর্নীতি চক্র। কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া রীতিমতো নিলামের চেহারা নিয়েছে। নেপথ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। ব্যবহার করছে অবৈধ ইউনিয়নের কাঠামো। ওই ইউনিয়নের ছত্রছায়াতেই গজিয়ে উঠছে অপরাধী চক্র। কাটমানি জেনারেটিং মেশিনের পাশাপাশি লুম্পেন ম্যানুফ্যাকচারারে রূপান্তরিত এই ঐতিহ্যমন্ডিত প্রতিষ্ঠান। এদিকে বন্ধ ছাত্রসংসদ নির্বাচন। একই হাল স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রেও। সেখানে আবার দুর্নীতির প্রশ্নে অতিরিক্ত কয়েকটি ক্ষেত্র আছে। যেমন মিড-ডে-মিল, পরিকাঠামো তহবিল ইত্যাদি। মোদ্দা কথা, দুর্নীতির সর্বব্যাপী প্রকোপে ধ্বংসের মুখে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা।
এমতাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব শিক্ষার সার্বজনীন রূপ পুনরুদ্ধার করা। দুর্নীতিমুক্ত, ভয়মুক্ত এবং অপরাধ মুক্ত
শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার পরিবেশ স্থাপন করা। ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে দুই সরকারের আসল উদ্দেশ্য এক। যার জেরেই রাজ্যে আট হাজার স্কুল বন্ধ হয়েছে, বেড়েছে বেসরকারি স্কুল এবং আরএসএসের বিদ্যামন্দির প্রকল্পের স্কুলসমূহ। ফলশ্রুতিতে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে গণশিক্ষার পরিসর। গণতান্ত্রিক চরিত্র লোপ পাচ্ছে। গণতন্ত্রের মর্মার্থ বৈষম্যহীন বন্দোবস্ত। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা গরীবের থেকে অনেক দূরে চলে গিয়ে ধনী শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। এই অভিগমন ব্যাহত করতে হবে। সর্বস্ব দিয়ে। নাহলে রাজ্য বা দেশ কোনোটাই বাঁচানো যাবে না।
ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের আন্দোলনের ব্লু প্রিন্ট এই নির্যাসের পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত। সমগ্র লড়াইটা আদতে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সন্দর্ভটি পুনরুদ্ধার করে জনগণের হাতে ন্যস্ত করা। সেই অভিমুখেই এই লড়াইয়ের পাতায় নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন চ্যাপ্টার। যাদবপুর, মেদিনীপুর, দার্জিলিং, কোচবিহার থেকে হাওড়া হুগলি দুই চব্বিশ পরগনা সর্বত্র। অভিন্ন স্লোগান ‘রিক্লেইম দ্য এডুকেশন’। এই লড়াইয়েই মুক্তির আলোকদিশারি অনুসন্ধানের যাত্রা চলবে। এই লড়াইয়ের অভিঘাত ব্যাপক। কেউ ‘খেলা হবে’ বলে তাণ্ডবের চোখ রাঙানি করলে, দ্বিগুণ প্রত্যয়ে ক্যাম্পাস আগলে রেখে শিক্ষা বাঁচাতে পাল্টা হুঁশিয়ারি ছুঁড়তে হবে ‘চালিয়ে খেলা হবে’।

