ব্যারিকেড : গানের ব্যারিকেড – ব্যারিকেডের গান

ব্যারিকেড : গানের ব্যারিকেড  ব্যারিকেডের গান

দেবলীন গুহ


‘ব্যারিকেড’—শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজপথে আছড়ে পড়া মিছিল আর পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক অদম্য জেদ। কিন্তু ব্যারিকেড মানে কি শুধুই পুলিশের সাজানো লোহার গার্ডরেল, টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া আর জলকামানের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো জড় দেওয়াল?

না। ব্যারিকেড আসলে মিছিলে হাঁটা হাজারো কমরেডের হাতে হাত রাখা এক মানবপ্রাচীর। এটা আসলে শাসকের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে রাজপথ দখল নেওয়ার স্পর্ধা। উৎপল দত্তের নাটকের সেই চিরন্তন সত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—ব্যারিকেড শুধু রাস্তায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় মানুষের মনে, ভয় ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে।

লোহার ব্যারিকেড দিয়ে হয়তো শরীরটাকে আটকে দেওয়া যায়, কিন্তু চেতনার ব্যারিকেড? তাকে ভাঙবে কার সাধ্য! এখানেই উঠে আসে আমাদের ‘গানের ব্যারিকেড’। গান এখানে নিছক বিনোদন বা বিলাসিতা নয়, গান এখানে পারফর্মিং আর্টস-এর সেই রূপ—যা আসলে শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস জোগায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, যখনই শোষকের চাবুক নেমে এসেছে, তখনই পাল্টা জবাব দিয়েছে গণসংগীতের ঢল। পল রোবসন থেকে সলিল চৌধুরী, কিংবা হেমাঙ্গ বিশ্বাস—তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে হারমোনিয়ামের রিড বা গিটারের তার আসলে এক একটা রাইফেলের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
এই যে হাজারো কণ্ঠে কোরাস, বা রাজপথের মোড়ে পথনাটকের ভিড়—এটাই তো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম প্রতিরোধ। যখন একটা মিছিলের গান আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে, তখন সেটা আর শুধু সুর থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য দেওয়াল। এই দেওয়াল অন্ধবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা আর ভয়ের বিরুদ্ধে। গানের ব্যারিকেড যখন রাজনীতির ময়দানে নামে, তখন সে তৈরি করে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর, যার ওপাশে থাকে আপসকামিতা আর এপাশে থাকে স্পর্ধা। আজকের এই পণ্য-শিক্ষা আর বিভাজনের রাজনীতির সময়ে ‘গানের ব্যারিকেড’ বড় প্রয়োজন। শাসকের সবচেয়ে বড় ভয় সৃজনশীল সংস্কৃতি, তাই তারা চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। কিন্তু আমাদের ড্রামের বিট আর গিটারের স্ট্রোক সেই নীরবতার ষড়যন্ত্র ভাঙার এক-একটি হাতুড়ি। মিছিলের শেষে এই গানই ক্লান্ত কমরেডদের রক্তে জোগান দেয় নতুন অক্সিজেন। তাই শুধু স্লোগান নয়, সুর আর ছন্দেও রাজপথ আমাদের দখলে থাক। শাসকের ত্রাস হোক আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর।

ব্যারিকেডের এপার থেকে তাই ওপারে থাকা শোষকদের জানিয়ে দিতে চাই—যতদিন আমাদের গলায় সুর আছে, ততদিন তোমাদের সাধ্য নেই এই ব্যারিকেড ভাঙার। সলিল চৌধুরীর সেই অমর পংক্তি দিয়েই শেষ করি, যা আজও প্রতিটি মিছিলে আমাদের শিরায় শিহরণ জাগায়—

পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা
জনস্রোতে নানান মতে মনোরথের ঠিকানা,
হবে চেনা, হবে জানা

ইনক্লাব জিন্দাবাদ!