ভাতার গোলকধাঁধা ও বিপন্ন যৌবন: বাংলার কর্মসংস্থান কোন পথে?

ভাতার গোলকধাঁধা ও বিপন্ন যৌবন: বাংলার কর্মসংস্থান কোন পথে?

অর্চিত সিনহা

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘ভাতা’ বনাম ‘কর্মসংস্থান’-এর সংঘাত এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজ্য সরকার সম্প্রতি ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২১ বছর বয়সী মাধ্যমিক উত্তীর্ণ যুবকদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা দেওয়ার যে ঘোষণা করেছে, তা আদতে বেকারত্বের জ্বলন্ত ক্ষতে সাময়িক প্রলেপ দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভারতীয় যুবসমাজের বিপ্লবী চেতনাকে স্তিমিত করতে এবং সশস্ত্র আন্দোলন থেকে বিচ্যুত করতে বিভিন্ন ধরণের আর্থিক প্রলোভন বা নামমাত্র ভাতার টোপ দিত। সেই সময়কার ছাত্র ও যুব সমাজ এই ‘খয়রাতি’ বা ‘ভাতা’র রাজনীতিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল, কারণ তারা জানত যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য প্রয়োজন অধিকার, কোনো ঔপনিবেশিক করুণা নয়। আজকের পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে যেখানে যুবসমাজকে স্থায়ী কাজ দেওয়ার বদলে ভাতার মায়াজালে আবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।

প্রকৃতপক্ষে এই ‘ভাতা’র রাজনীতি একটি গভীর দুর্নীতির বলয়ের অংশ। এক সময় ঘটা করে ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল, কিন্তু আজ সেই প্রকল্পের সুবিধা প্রাপকদের তালিকা কেন ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং কেন বহু যুবকের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকা বন্ধ হয়ে গেছে, তার কোনো স্বচ্ছ কৈফিয়ত সরকারের কাছে নেই। যুবশ্রীর ব্যর্থতাকে আড়াল করতেই এখন আবার নির্বাচনের আগে ‘যুবসাথী’র টোপ দেওয়া হচ্ছে। এটি আসলে একটি চক্রাকার প্রতারণা—একটি প্রকল্প ধুঁকতে শুরু করলে নতুন নামে আরেকটি প্রকল্প আনা হয় যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করা যায়। এই শোষণের প্রক্রিয়াটি কেবল বেকার ভাতায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার একদিকে সামান্য কিছু টাকা ছাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছে, যা সরকারি প্রচারে বড় করে দেখানো হয়, অথচ মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত অন্ধকার। আজ পশ্চিমবঙ্গের কলেজগুলোতে ভর্তি হতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের সামনে এক অদৃশ্য ‘রেট চার্ট’ ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং কোন বিষয়ে কত টাকা ঘুষ দিতে হবে, তার ওপর ভিত্তি করে ছাত্র সংসদ নামধারী কিছু দালালচক্র টাকার পাহাড় গড়ছে। পছন্দের বিষয়ে অনার্স নিতে গেলে বা ভালো কলেজে জায়গা পেতে গেলে হাজার হাজার টাকা ঘুস দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ, সরকার এক হাতে যা ‘অনুদান’ হিসেবে দিচ্ছে, অন্য হাতে তার কয়েক গুণ বেশি টাকা ভর্তির সময় তোলা হিসেবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

এই সামগ্রিক ব্যবস্থাটি আসলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ইকোসিস্টেম। একদিকে নিয়োগ দুর্নীতিতে যোগ্য প্রার্থীরা ১০ লক্ষ, ২০ লক্ষ টাকায় চাকরি বিক্রি হতে দেখছেন, যেখানে SSC থেকে শুরু করে প্রাথমিক নিয়োগ—প্রতিটি ক্ষেত্রে অযোগ্যদের কাছে মেধা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আজ যোগ্য প্রার্থীরা রাজপথে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর ধরনায় বসে চোখের জল ফেলছেন, আর সরকার মেলা-খেলা-উৎসবে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে যুবসমাজের ক্ষোভকে ভাতার প্রলেপ দিয়ে ঢাকতে চাইছে। গত ১৫ বছরে রাজ্যে কোনো নতুন ভারী শিল্প গড়ে ওঠেনি, অথচ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘বিজনেস সামিট’-এর নাটক করা হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলার মেধাবী যুবসমাজ আজ ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের স্পষ্ট মনে রাখতে হবে, এই ভাতা কোনো ভিক্ষা বা দয়া নয়। রাষ্ট্র যদি তার সক্ষম নাগরিকদের কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার খেসারত হিসেবে বেকার ভাতা প্রদান করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। ১৫০০ টাকার এই অনুদান কোনোভাবেই একজন শিক্ষিত যুবকের আত্মসম্মান রক্ষা করতে পারে না এবং এটি স্থায়ী চাকরির বিকল্প হতে পারে না। ব্রিটিশরা যেমন ভারতীয়দের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চেয়েছিল, বর্তমান ব্যবস্থাও ভাতার নেশায় যুবসমাজকে বুঁদ করে রেখে তাদের লড়াকু মানসিকতা কেড়ে নিতে চাইছে। তাই আজ সময় এসেছে এই ভাতার গোলকধাঁধা ছিন্ন করে স্বচ্ছ নিয়োগ, শিল্পায়ন এবং মেধার ভিত্তিতে স্থায়ী কর্মসংস্থানের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার।