হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় : প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক
• স্নেহাশীষ সরকার
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে মতুয়া সমাজের শিক্ষার অগ্রগতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হল—এই অগ্রগতি কার জন্য, কতজনের জন্য, এবং কোন শর্তের বিনিময়ে? যে সমাজ একদিন শিক্ষা, আত্মসম্মান ও সামাজিক মুক্তিকে আন্দোলনের কেন্দ্রে রেখেছিল, সেই সমাজ আজ কেন বারবার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাকের মুখোমুখি হচ্ছে— এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর শিক্ষাকে কখনও বিলাসিতা হিসেবে দেখেননি। তাঁদের কাছে শিক্ষা ছিল ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য, জাতিভেদ ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্র। সেই উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে আজকের মতুয়া সমাজ যখন প্রশ্ন তোলে — “হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও কেন হচ্ছে না?”— তখন তা নিছক আবেগের প্রশ্ন নয়, তা এক গভীর সামাজিক বঞ্চনার দলিল। বছরের পর বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে মঞ্চে উঠে বড় বড় কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বনগাঁ মহকুমা এবং রানাঘাট মহকুমার বিস্তীর্ণ মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা আজও উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা বা দূরবর্তী জেলায় যেতে বাধ্য। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা মাঝপথেই ঝরে পড়ছে। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়ার দায় কার? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক জটিলতা, নাকি প্রান্তিক সমাজের শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের তালিকার বাইরে ঠেলে দেওয়ার ধারাবাহিক চর্চা?
স্কুলছুট হওয়া এখানে ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত ঘটনা
বনগাঁ ও রানাঘাট মহকুমার মতুয়া অধ্যুষিত গ্রামগুলোর দিকে তাকালেই শিক্ষার বাস্তব ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষক, পরিকাঠামোর অভাব, দূরত্বের সমস্যা, বৃত্তি পেতে অনিশ্চয়তা এসবই নিত্যসঙ্গী। বহু পরিবার আজও দিন আনে, দিন খায় অবস্থায় বাস করে। পরিযায়ী শ্রম, ইটভাটায় কাজ, নির্মাণক্ষেত্রে অস্থায়ী মজুরি— এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে শিশুর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এক কঠিন লড়াই। স্কুলছুট হওয়া এখানে ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত ঘটনা। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন আজও করুণ। পানীয় জল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থায়ী কাজ—সবক্ষেত্রেই চরম অনিশ্চয়তা। তার উপর শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও ব্যয়বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। শিক্ষা আজ অধিকারের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে বাজারের পণ্যে পরিণত হচ্ছে। যার টাকা আছে সে পড়বে, যার নেই সে পিছিয়ে পড়বে—এই নীরব কিন্তু নির্মম নিয়মই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে SIR (Special Intensive Revision) নিয়ে মতুয়া সমাজের মধ্যে যে গভীর উদ্বেগ ও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকত্ব, পরিচয় ও ভোটাধিকার—এই প্রশ্নগুলি মতুয়া সমাজের কাছে কেবল কাগজপত্রের বিষয় নয়; এগুলি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। বহু মানুষ আজও পরিযায়ী, দারিদ্র্যতা ও নথির অভাবে নানা প্রশাসনিক তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় ভুগছেন। SIR-এর নামে নতুন করে যাচাই-বাছাই, কাগজ চাওয়া—এসব প্রক্রিয়া প্রান্তিক মানুষকে আরও আতঙ্কিত করছে। একই সঙ্গে দুই ফুলের রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে আজকে এক একটা কার্ড প্রতি ৮০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত মতুয়া সমাজের মানুষদের কাছ থেকে নিয়ে তাদের হিন্দু কার্ড, মতুয়া কার্ড নিতে বাধ্য করা হচ্ছে যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ক্ষেতমজুর, কৃষক, পরিযায়ী শ্রমিক যাদের কাজ না করলে পেটের ভাত জোটে না তারা এই চক্রান্তের শিকার হয়ে আতঙ্কে এই কার্ড বানাচ্ছে।

যে মতুয়া সমাজ ঐতিহাসিকভাবে উদ্বাস্তু, দলিত ও প্রান্তিক পরিচয়ের ভার বয়ে এনেছে, তাদের কাছে “নাগরিক প্রমাণ” বারবার চাওয়া মানে সন্দেহের চোখে দেখা। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা, সচেতনতা ও আইনি সহায়তার অভাব সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানে না কীভাবে SIR এ আবেদন করবে, কী নথি লাগবে, কোথায় গেলে সাহায্য মিলবে! কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতায় যারা বসে আছে তারা এই মতুয়া সমাজের মানুষের মধ্যে ভুল বুঝিয়ে আতঙ্কের সঞ্চার করছে। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তাদের কাছে হয়ে ওঠে ভয়ের আরেক নাম।
শিক্ষা যদি সত্যিই মুক্তির পথ হয়, তবে তা কেবল ডিগ্রি বা চাকরির সিঁড়ি নয়—তা হতে হবে অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার মাধ্যম। কিন্তু সেই শিক্ষাই যদি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না, তাহলে সমাজের ভিত আরও দুর্বল হয়। হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মতুয়া সমাজের আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের প্রতীক। এই বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়া মানে একের পর এক প্রজন্মকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
হরিচাঁদ ঠাকুর – গুরুচাঁদ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে জমি সরকার থেকে দেওয়া হয়েছিল সেই জমিতে জঙ্গল হয়ে পড়ে আছে। ভোটের সময় শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ভোট চলে গেলে আর মনে থাকে না শাসকদলের এগুলো কি মতুয়া সমাজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বঞ্চনা নয়! আজকে যারা মতুয়া সমাজের মানুষদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ভোট নিয়ে বিধায়ক, সাংসদ,মন্ত্রী হয়েছেন তারা মতুয়া সমাজের শিক্ষার্থীদের উন্নতি নিয়ে কি ভাবছে!
আজ মতুয়া সমাজের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই — আর কতদিন প্রতিশ্রুতির উপর ভর করে চলতে হবে? আর কতদিন শিক্ষার নামে অসাম্য, অবহেলা ও বিলম্ব মেনে নিতে হবে? বনগাঁ–রানাঘাট মহকুমার গ্রাম থেকে উঠে আসা ছাত্রছাত্রীদের কি চিরকাল দূরবর্তী শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল প্রশাসনিক ভাষায় দিলে হবে না। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা। শিক্ষা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা শাসকের ভাষায় নয়, শোষিত মানুষের প্রয়োজনের ভাষায় কথা বলবে। আর সেই লড়াই আজ মতুয়া সমাজের সামনে এক অনিবার্য সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

