ভারতীয় সমাজে বামপন্থা, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা

ভারতীয় সমাজে বামপন্থা, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা

• সৌভিক রাজবংশী

ভারতবর্ষের মতো বহুমাত্রিক দেশের মধ্যে সমাজের অলিতে গলিতে ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে রয়েছে বহুকাল ধরে, সেদিক থেকে বামপন্থা ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনার মধ্যে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সংঘাত রয়েছে প্রচুর।

গোটা বিশ্বের নিরিখে ভারতবর্ষই মূলত প্রধান হিন্দু ধর্ম সংস্কৃতির পীঠস্থান, এছাড়াও বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতেও হিন্দু রীতিনীতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। উদাহরন স্বরূপ বলতে গেলে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, আফগানিস্থান, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে বিভিন্ন অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের বুকে ধর্মীয় চিন্তাভাবনা পোষণ ও পালন করেন এমন বহু মানুষ রয়েছেন! ভারতবর্ষ মানেই ধর্মনিরপেক্ষ এক চিন্তাভাবনার কথা উঠে আসে, যেখানে সবাই নিজ নিজ ধর্মের আচার পালন করে থাকেন।

১৯৭৬ সালে দেশজুড়ে তখন জরুরি অবস্থা প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার ৪২ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দুটি যোগ করা হয়। তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ( CPI ) এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ( মার্কসবাদী ) অর্থাৎ CPI(M) আদর্শগত ভাবে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের এই অবস্থানকে সমর্থন জানায়। কারণ, বামপন্থীরা চিরকাল মনে করে এসেছে ভারতবর্ষ একটি বহু সমষ্টির দেশ যেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী, ধর্মাবলম্বী এবং সবশেষে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের দেশ এই ভারতবর্ষ, তাই রাষ্ট্র ও ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা রাখতে হবে।

বামপন্থী দলগুলি চিরকাল ধর্ম ও রাজনীতিকে মেশানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছে। ভারতের মতো একটি দেশে ধর্মকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার করে ধর্মে ধর্মে বিভেদ ঘটিয়ে চরম সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে সফল হয়েছে এবং এক চরম দক্ষিণপন্থী দলের ( ভারতীয় জনতা পার্টি ) নেতৃত্বে সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু এদেশের বামপন্থীরা সর্বদা ধর্মকে প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং মনে করেছে রাজনীতি, শিক্ষা, সরকার, প্রশাসন থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে হবে তবেই ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতবর্ষে সফলতা লাভ করার পথে এগোতে পারবে।

ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী শহীদ ভগৎ সিং মনে করতেন, “ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এতে অন্যের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। একইভাবে ধর্মকেও রাজনীতির সঙ্গে মেশানো উচিত নয় কারণ এটি মানুষকে একত্রিত করার বদলে বিচ্ছিন্ন করে।”

ভারতে প্রত্যেক বাড়িতে মানুষ পূজাপাঠ ও নিজ নিজ ধর্মের পালন করে থাকেন, উৎসবকালে তার বহর ও আবেগ আরও দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। প্রত্যেকে জাত, বর্ণ, ধর্মকে দূরে সরিয়ে উৎসবকে কেন্দ্র করে রাস্তায় মণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং খেটে খাওয়া শ্রেণীর লোকেরা তাদের রুটি রোজগার করতে বিভিন্ন স্টল ও পণ্যসামগ্রী নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁক দেন পেটে ভাত জোগানোর উদ্দেশে, ঠিক এইভাবেই ভারতবর্ষ উৎসবমুখর সময়ে ধর্মে ধর্মে বিভেদ ভুলে জীবনজীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণপন্থী শক্তির জোরালো উত্থানের ফলে ভারতবর্ষের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আজ নষ্ট হয়েছে। বিগত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস পালনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি একপ্রকার দেশজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে। সারা বিশ্ব যখন বড়দিন পালনে উৎসাহী হয়ে ওঠে, তখন ভারতের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর আঘাত নামিয়ে এনে গোটা বিশ্বের কাছে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতায় আঘাত এনেছে এই অশুভ শক্তিগুলি। ভারতকে যে চরম সাম্প্রদায়িক একটি সরকারের শাসনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়ে কার্যতই বামপন্থী ও সহযোগী শক্তিগুলি দেশের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক ও সুস্থ সমাজ তৈরির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।