সেদিন লাল পতাকার আর প্রয়োজন থাকবে না…

সেদিন লাল পতাকার আর প্রয়োজন থাকবে না

• দেবাঙ্কুর দাস

আমি চাই, একদিন পৃথিবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি উঠে যাক।
এই কথাটা প্রথম শুনলে অনেকেই অবাক হবে। কেউ হয়তো ভাববে—এ আবার কেমন কথা! যারা সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে, যারা শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নিয়ে কথা বলে, তাদেরই কি পৃথিবী থেকে বিদায় জানাতে বলা হচ্ছে? কিন্তু কথাটার ভিতরে অন্য এক অর্থ লুকিয়ে আছে।

কমিউনিস্ট পার্টি কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো রোমান্টিক রাজনৈতিক ধারণাও নয়। ইতিহাসের নির্দিষ্ট এক বাস্তবতা থেকে এর জন্ম। সমাজে যখন শোষণ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে মানুষের বেঁচে থাকার মর্যাদা বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখনই মানুষের ভেতর থেকে সংগঠনের প্রয়োজন তৈরি হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই একদিন ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের অন্ধকার কারখানাগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের জীবনের প্রশ্ন তুলেছিলেন Karl Marx এবং Friedrich Engels। ১৮৪৮ সালে তাদের লেখা The Communist Manifesto শুধু একটি রাজনৈতিক পুস্তিকা ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের ঘোষণা—মানুষের শ্রম ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা।
এই ধারণা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা—Russian Revolution। Vladimir Lenin-এর নেতৃত্বে শ্রমিক ও কৃষকদের নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি নতুন আশার দরজা খুলে দেয়। লেনিনের মৃত্যুর পরে সেই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা এবং দ্রুত শিল্পোন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এসে পড়ে Joseph Stalin-এর উপর। তাঁর শাসনকালে সোভিয়েত ইউনিয়নে দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষি সমবায়ীকরণের নীতি গৃহীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোভিয়েত প্রতিরোধও বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। যদিও তাঁর শাসনকে ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনাও ইতিহাসে সমানভাবে আলোচিত।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার পাহাড়ি জঙ্গল থেকে উঠে আসে আরেক বিপ্লবী প্রতীক—Che Guevara। কিউবার বিপ্লবে Fidel Castro-এর সঙ্গে লড়াই করে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজুড়ে তরুণদের কাছে প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এক প্রতীক। তাঁর মুখের ছবি আজও অনেক মানুষের কাছে শুধু একটি বিপ্লবীর প্রতিকৃতি নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের চিহ্ন।

এইসব ইতিহাসের মধ্য দিয়েই কমিউনিস্ট আন্দোলন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে—কখনো রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে, কখনো শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনের মাধ্যমে, আবার কখনো ছাত্র-যুবাদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসেও কমিউনিস্টরা প্রতিদিন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হিসাবেই উঠে আসেন।ব্রিটিশ শাসনের সময়ই শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তার বিস্তার শুরু হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বে কমিউনিস্ট কর্মীরা শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন, কৃষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। বাংলার গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলন, শহরের কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট—এসব ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে।

১৯৬৪ সালে ভারতীয় বাম রাজনীতির ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক পথনির্বাচনের প্রশ্নে বিভাজনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় Communist Party of India (Marxist)। সেই সময় যাঁরা এই নতুন দল গঠনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেককে পরে বাম আন্দোলনের “নবরত্ন” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন E. M. S. Namboodiripad, P. Sundarayya, Jyoti Basu, Promode Dasgupta, Harkishan Singh Surjeet, B. T. Ranadive, A. K. Gopalan, E. K. Nayanar এবং M. Basavapunnaiah। তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই শ্রমিক-কৃষকের অধিকারকে শক্তিশালী করা এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা।ভারতবর্ষের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাস শুধু তত্ত্ব বা বক্তৃতার ইতিহাস নয়; এটি মূলত মাটি, ফসল আর কৃষকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলার মাটিতে সেই সংগ্রামের এক বড় অধ্যায় হলো Tebhaga Movement। ১৯৪৬ সালে যখন বাংলার গ্রামাঞ্চলে এই আন্দোলন শুরু হয়, তখন হাজার হাজার ভাগচাষি জমিদার ও জোতদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দাবি তোলে—ফসলের তিনভাগের দুইভাগ থাকবে কৃষকের ঘরে। আগে নিয়ম ছিল উল্টো; চাষ করত কৃষক, কিন্তু বড় অংশ চলে যেত জমির মালিকের হাতে। কমিউনিস্ট কর্মীরা গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে তোলেন, কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। দিনাজপুর, রংপুর, মেদিনীপুর, খুলনা—বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষকরা নিজেদের অধিকারের জন্য লাঠি হাতে রাস্তায় নেমে আসে। বহু জায়গায় পুলিশি দমন-পীড়ন হয়, অনেক কৃষক প্রাণও হারান, কিন্তু সেই আন্দোলন বাংলার কৃষক রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়।

স্বাধীনতার পরে সেই সংগ্রামের ধারাই অন্য এক রূপ নেয়। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যে ভাগচাষিরা জমিতে চাষ করত, তাদের অধিকারের আইনি স্বীকৃতি প্রায় ছিল না। জমির মালিক চাইলে যে কোনো সময় তাদের উচ্ছেদ করতে পারত। এই পরিস্থিতি বদলাতে ১৯৭৭ সালের পরে বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে শুরু হয় Operation Barga। এর লক্ষ্য ছিল বর্গাদারদের নাম সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা এবং তাদের জমিতে চাষের অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়া। লক্ষ লক্ষ ভাগচাষি প্রথমবার আইনি স্বীকৃতি পায়। গ্রামীণ বাংলায় ভূমি সংস্কারের এই উদ্যোগ বহু মানুষের কাছে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তেভাগা আন্দোলনের লাঠি হাতে দাঁড়ানো কৃষক আর বর্গা আন্দোলনের নথিভুক্ত জমির অধিকার—এই দুই ইতিহাস আসলে একই ধারার অংশ। এগুলো দেখায় যে কমিউনিস্ট রাজনীতি কেবল সংসদের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ নয়; অনেক সময় তা মাটির মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কিন্তু পৃথিবী বদলালেও অন্যায়ের রূপ খুব বেশি বদলায়নি।
আজকের ভারতে আমরা দেখি ধর্মের নামে রাজনীতির উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা Narendra Modi-এর সময়ে ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আর সেই রাজনীতির আদর্শিক উৎস হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয় Rashtriya Swayamsevak Sangh-এর নাম। দেশের নানা প্রান্তে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে অস্থির করে তুলছে।
এদিকে গণতন্ত্রের আরেকটি জটিল প্রশ্ন উঠে এসেছে অর্থের প্রভাব নিয়ে। ২০১৭ সালে চালু হওয়া Electoral Bonds Scheme নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থায় কর্পোরেট অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রে যেখানে স্বচ্ছতা থাকা উচিত, সেখানে অর্থের উৎস গোপন হয়ে যাওয়া অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাগুলোও গভীর প্রশ্ন তুলে দেয়। গত কয়েক বছরে রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে ২০২২ সালে, যখন প্রাক্তন মন্ত্রী Partha Chatterjee-কে গ্রেফতার করে Enforcement Directorate। এই মামলায় অভিযোগ ওঠে যে বিপুল অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। বহু যোগ্য পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও চাকরি পায়নি।
একই সময়ে সামনে আসে কয়লা পাচারের অভিযোগ—যা পরিচিত হয় West Bengal Coal Smuggling Case নামে। তদন্তে উঠে আসে অবৈধ কয়লা উত্তোলন ও পাচারের বড় চক্রের কথা।
অন্যদিকে বেকারত্বের সমস্যাও রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। চাকরি দিতে না পারার পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার ২০২৩ সালে চালু করে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্প সহ বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। ২০২৬ সে বিধানসভা ইলেকশনের আগেই তরিহরি মমতা ব্যানার্জি শুরু করেন ” বাংলার যুবসাথি প্রকল্প”. সাধারণ সুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরা বলেন এগুলো সামাজিক সহায়তা হলেও এগুলো বেকারত্ব সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়,বরং নিয়োগ দুর্নীতি এবং বেকারত্ব ঢাকতেই এই প্রকল্পগুলো শুরু হয়।
ভারতবর্ষের রাজনীতি যখন অনেক সময় ধর্মীয় উত্তেজনা ও বিভাজনের প্রশ্নে আটকে পড়ে, তখন দেশের দক্ষিণে একটি ছোট রাজ্য নীরবে অন্য এক গল্প লিখছে—Kerala। বহু দশক ধরে সেখানে বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব শুধু নির্বাচনের ফলাফলে নয়, মানুষের জীবনের বাস্তব পরিবর্তনেও দেখা যায়।
এই পরিবর্তনের সূত্রপাত অনেক আগেই। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবার গণতান্ত্রিক ভোটে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল এখানেই, নেতৃত্বে ছিলেন E. M. S. Namboodiripad। সেই সময় থেকেই শিক্ষা, ভূমি সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়কে রাজনীতির কেন্দ্রে আনার চেষ্টা শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক নীতির ফলে আজ কেরালার সমাজে তার প্রভাব স্পষ্ট।
আজ ভারতের যে কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে কেরালা প্রথম সারিতে। রাজ্যের সাক্ষরতার হার প্রায় সম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে—৯৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ পড়তে-লিখতে পারে। শুধু সাক্ষরতা নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কেরালায় সরকারি সহায়তা অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকারি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য বিভিন্ন ভর্তুকি ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যার ফলে বহু পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চতর শিক্ষায় পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও কেরালা একটি আলাদা উদাহরণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প—বৃদ্ধভাতা, শ্রমিক পেনশন, খাদ্য সহায়তা—গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে নিরাপত্তা তৈরি করেছে। এই ধারাবাহিক নীতির ফলেই বহু গবেষণায় দেখা যায়, কেরালায় দারিদ্র্যের হার ভারতের বহু রাজ্যের তুলনায় অনেক কম।
রাজ্যের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও শিক্ষা ও দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পর্যটন ও শিক্ষা—এই সব ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। ফলে কেরালার বহু তরুণ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ পাচ্ছে।
অনেকেই তাই বলেন, ভারতের যখন অনেক জায়গায় মানুষ ধর্মের পরিচয় নিয়ে লড়াই করছে, তখন কেরালা অন্য এক পরিচয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের পরিচয় তার শিক্ষা, তার স্বাস্থ্য, তার সামাজিক মর্যাদা। সেই কারণেই অনেকের কাছে কেরালার অভিজ্ঞতা শুধু একটি রাজ্যের উন্নয়নের গল্প নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের পরীক্ষাগার, যেখানে সামাজিক ন্যায় ও মানবিক উন্নয়নকে রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে রাখার চেষ্টা হয়েছে।
এই বাস্তবতাই আবার আমাদের সেই পুরনো কথায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়—কমিউনিস্ট রাজনীতি আসলে ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মানুষের জীবনের মান উন্নত করার রাজনীতি। আর যদি একদিন পৃথিবীর প্রতিটি জায়গা এমনই হয়—যেখানে শিক্ষা সবার অধিকার, স্বাস্থ্য সবার অধিকার, সম্মান সবার অধিকার—তাহলে সত্যিই হয়তো একদিন লাল পতাকার আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না।

পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও মানুষ একইরকম সংগ্রামের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা Israel–Palestine conflict আমাদের দেখায় যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কে দেয়—সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একের পর এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়, বন্যা, দাবানল, তাপপ্রবাহ পৃথিবীকে নতুন সংকটের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। এই সব সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে সেই মানুষগুলোই যারা পৃথিবীর সম্পদের সবচেয়ে কম অংশ পায়।
তবু পৃথিবী শুধু অন্ধকারের গল্প নয়। লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ আবার সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতির দিকে তাকাচ্ছে। ব্রাজিলে শ্রমিক নেতা Luiz Inácio Lula da Silva আবার ক্ষমতায় ফিরে দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক কল্যাণের প্রশ্ন সামনে এনেছেন। চিলিতে ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতা Gabriel Boric নতুন সামাজিক সংস্কারের কথা বলছেন। আর দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতেও বামপন্থী নেতা Anura Kumara Dissanayake সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলছেন।

এই সব ঘটনা আমাদের একটা জিনিস মনে করিয়ে দেয়—কমিউনিস্ট পার্টি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি সেই জায়গায় জন্মায় যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়।

তাই একজন কমরেড হিসেবে আমি সত্যিই চাই—একদিন পৃথিবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি উঠে যাক।
কিন্তু সেই দিনটি তখনই আসুক, যেদিন পৃথিবীতে আর কোনো শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হবে না, কোনো কৃষক ঋণের বোঝায় আত্মহত্যা করবে না, কোনো ছাত্র ঘুষের কারণে চাকরি হারাবে না, কোনো মানুষ ধর্মের নামে ঘৃণার শিকার হবে না।
সেদিন লাল পতাকার আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না।
আর সেদিন, একজন কমরেড হিসেবে আমিও শান্তভাবে বলব—
হ্যাঁ, আজ কমিউনিস্ট পার্টি না থাকলেও চলবে।
কারণ পৃথিবী অবশেষে মানুষের হয়ে উঠেছে,অবশেষে সমাজতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে।।