মেনস্ট্রিম পলিটিক্সের ইস্যু: বামপন্থীদের প্রাসঙ্গিকতা
• তুহিন দাস
রবিবারের সকাল, চায়ের দোকানে বসে আছি, আমার পাশের জন এলাকারই একজন বর্ষীয়ান নাগরিক দেখলাম খুব মন দিয়ে কাগজ পড়ছেন, হঠাৎ দেখলাম তাঁর মুখে একগাল হাসি নিয়ে চায়ের দোকানদারকে বললেন ‘জানো, মমতা নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন করবে, খুব ভাল করবে’ শুনে সেই দোকানদার বলে উঠলেন ‘পড়েছি দাদা কিন্ত আমাদের কি লাভ হবে’ শুনেই প্রায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন সেই বয়স্ক ভদ্রলোক, ওদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুনে আমিও উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ ভদ্রলোককে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটা জাস্ট ভোট রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়, তারপর আমার সাথেও তর্ক জুড়ে দিলেন ‘তোমরা বামপন্থীরা বড় সেকেলে, ধ্যান ধারণা বদলাতে হবে, এই জন্যই মাকুরা শূন্য’ তারপর আরও বললেন ‘দিদি ভাতা দিচ্ছে, এটাও তোমাদের সহ্য হচ্ছে না? সবকটা বিজেপির দালাল’ বলে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন ঐ ৩৪ বছরের কথা! আমি আর কথা না বাড়িয়ে সময় নষ্ট না করে বাড়ি এসে একমনে ভাবতে শুরু করলাম এখনও এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে অন্ধত্ত্ব কিভাবে বাসা বেঁধে আছে তার থেকেও বড় কথা তৃণমূল সাধারণ মানুষকে কিভাবে ভীত, সন্ত্রস্ত করে রেখেছে এই ধরণের কথা বলে জাস্ট বিজেপির জুজু দেখিয়ে, বিজেপিই যে তৃণমূলের লক্ষ্মী তৃণমূলের এক প্রয়াত সিনিয়র নেতা বলে গিয়েছিলেন সাংবাদিকদের কাছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার ঠিক আগে অর্থাৎ ১৯৪৬’র দাঙ্গার পর বাংলার মাটিতে যে সুযোগ ছিল উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর কাছে এই মাটিকে ধর্মীয় গবেষণাগার বানানোর, তা তারা বানাতে পারেনি, তা দানা বাঁধে নি হাজার সমস্যায় থাকা শ্রমজীবী বঙ্গবাসীদের প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা, তাদের সৃজনশীল রাজনৈতিক আন্দোলন চলমান থাকায়- বলা বাহুল্য এ কৃতিত্ব বামপন্থীদেরই, সাধারণ, গরীব, মেহনতি মানুষের কথাকেই স্লোগানের রুপ দিয়েছেন বামপন্থীরা, রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়েছে জনজীবনের সমস্যা, কারণ বামপন্থীদের শক্তিশালী সংগঠন ও গণসংগঠনগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দেখা গেছে অতীতে কংগ্রেস শাসনে আর পাঁচটা বিষয়ে বামপন্থীদের সাথে তদানীন্তন সরকারের নানা মতবিরোধ থাকরেও ধর্মনিরপেক্ষ আবহ বজায় রাখার প্রশ্নে দুপক্ষকেই সমান অবস্থান নিতে। হায় রে বাংলা, সেদিন আর এদিন! মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার যখন চলে যাচ্ছে তখনও আলোচনা হত শিল্প না কৃষি?
২০১১ সালের পর বিজেপি-তৃণমূলের কল্যাণে বাংলায় আলোচনা হয় মন্দির না মসজিদ, হিন্দু না মুসলমান, রামনবমী নাকি হনুমান যাত্রা! রাজনীতির ফোকাস সরে গেছে, রাজনীতির ফোকাস নড়ে গেছে।বাংলায় এখন সাম্প্রদায়িক শক্তির দাপাদাপি বেড়েছে, তাদের পলিটিক্যাল আউটফিট এখন বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল।যে বিজেপি একসময় বাংলায় অচছুত ছিল, এখন তারা রাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্য তাল ঠুকছে তৃণমূলের সৌজন্যে।আগে বাংলায় আরএসএসের কটা স্কুল ছিল আর এখন কটা আছে? আগে বিজেপির কটা MLA, MP ছিল আর এখন কটা আছে? কিন্ত বাংলায় বিজেপিকে চিনিয়েছিল কে? কে বিজেপিকে ‘অচছুত নয়’ বলেছিল তা একটু ইউটিউব ঘাঁটলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে কারণ ইতিহাসকে যেমন বিকৃত করা যায় না তেমন ইতিহাসকে মুছেও দেওয়া যায় না।গণআন্দোলনের নেতা কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্র কথিত এই দুই দলের Competitive communalism আজকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।পরপর নির্বাচনে বামপন্থীসহ গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির হতাশাজনক ফলাফল এদের রাস্তাকে প্রশস্ত করছে, এখানেই লুকিয়ে আছে বামপন্থীদের প্রাসঙ্গিক থাকার বীজমন্ত্র। আবার যদি রুটি রুজির দাবীর কথা মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে তাদের মনে গেঁথে দেওয়া যায়, তাহলে বামপন্থীদের ঠেকাবে কার সাধ্য?
কিছুদিন পরেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে লাইনে দাঁড়াবে, এবারের নির্বাচন আমাদের কাছে কঠিন লড়াই, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যে তৃণমূলকে সরাতে চায় না তা এতদিনে নীচুতলার বিজেপি কর্মীরাও বুঝতে পারছেন তাইতো সারদা, নারদা, চাকরী দূর্নীতি, কয়লা ও গরু পাচারের মত মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে ধৃত একের পর এক তৃণমূল নেতারা জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন অবশ্য বিনিময়ে তৃণমূলও সংসদে বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’জোট যখন No confidence motion মুভ করল, বিরোধী সাংসদরা সেখানে সই করলেও নীরব থাকল তৃণমূল। পহেলাগামে সন্ত্রাসবাদী হানায় যখন কয়েকজন নিরপরাধ নাগরিককে খুন করা হয়, পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপারেশনে কয়েকজন সন্ত্রাসবাদী নিকেশ হওয়ার পর যে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলকে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সেনার সাফল্য প্রচারের জন্য, দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা সেই টিমে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অনুমোদিত প্রতিনিধি ছিলেন না তিরুবনন্তপুরমের সাংসদ শশী থারুর, কিন্ত কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধকে আরও উস্কে দিতেই তাকে টিমে রাখা হয় কংগ্রেসের আপত্তি সত্ত্বেও, অপরদিকে দেখা যায় টিমে নাম থাকা তৃণমূলের সাংসদ ইউসুফ পাঠানোর নাম দিয়ে যখন তাঁর দলই আপত্তি জানায় তখন সেই নাম খারিজ হয়ে গিয়ে অভিষেক ব্যানার্জীর নাম ঢুকে যায়।জাস্ট ভাবুন একবার, যার বিরুদ্ধে কয়লা, গরু পাচারের মামলা এখনও চলছে তাকে মোদী সরকার বিদেশে পাঠাচ্ছে ডেলিগেট করে! এভাবেই বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ছে! আবার তৃণমূলও কম যায় না আসানসোল দাঙ্গায় মূল অভিযুক্ত বিজেপির মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে গতকালই রাজ্যসভায় প্রার্থী করেছে তৃণমূল।এদের অশুভ আতাঁতের আরও হাজারটা উদাহরণ দেওয়া যায়। বিজেপির উগ্র ধর্মীয় জিগির আর দুর্নীতির কাদা গায়ে মাখা তৃণমূলের বিপুল অর্থশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াইটা এত সোজা না। সুতরাং Issue, Issue and Issue, ইস্যুতে ফিরতে হবে।খেটে খাওয়া মানুষের ইসুকে ফোকাস করতে হবে বামপন্থীদেরই, রাস্তাই একমাত্র রাস্তা, রাস্তাই পথ দেখাবে। এটা হয়তো দুঃসময় আবার এটাই সুসময়। যে মানুষ এখনও বিভ্রান্তিতে ভুগছেন যে এবার কাকে ভোট দেবেন, তাদের কাছে যেতে হবে, বারবার যেতে হবে, প্রত্যাখাত হলেও যেতে হবে।বামপন্থীরা প্রাসঙ্গিক হলে দুর্নীতিবাজ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারবারিরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।শেষে একটাই কথা বলার,
‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়,
আড়ালে তার সূর্য হাসে’।

