লড়ছে কামারহাটি, জিতবে কামারহাটি
• নীলাংশু পাঁজা
আধাফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস যে সময়ে গোটা রাজ্যজুড়ে হাজার-হাজার শহীদ উপহার দিচ্ছে লাল ঝান্ডা কে , সে সময়ের একেবারে শেষ পর্যায়ের মর্মান্তিক-পৈশাচিক পরিকল্পনার স্বাক্ষী থাকলো বাংলা , স্বাক্ষী থাকলো কামারহাটি।
কঠিন সময়ে চিরাচরিত স্রোতের বিরূদ্ধে প্রতিদিন জানকবুল লড়াইয়ে তৎকালীন অবিভক্ত ২৪ পরগণা (উত্তর ও দক্ষিণ) জেলাজুড়ে ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করছিলেন যাঁরা , তাঁদের অন্যতম নেতৃত্ব কম: রঞ্জন গোস্বামী। ১৯৭২ এর লুঠ-সন্ত্রাসের নির্বাচনে একপ্রকার বেপরোয়া বুথ দখল এবং প্রবল ভোট লুঠের কারণে পার্টির সিদ্ধান্তে অন্যান্য নেতৃত্বের মতোন কম: রাধিকারঞ্জন ব্যানার্জী (বিধায়ক: ১৯৬৭-৭১, ১৯৭৭-৮৭) নির্বাচন থেকে নাম প্রত্যাহার করলেন। লুঠের ভোটে জয়ী হলেন জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী প্রদীপ কুমার পালিত। গোটা বাংলার মতোন , গোটা কামারহাটি জুড়ে শুরু হলো অভাবনীয় আক্রমণ – অত্যাচার। লাল ঝান্ডার কর্মী – সমর্থকদের উপর নেমে এলো অকথ্য আঘাত। ১৯৭২-৭৭ সমগ্র বাংলা যখন প্রতিদিন পরিত্রাণ চাইছে এই আধা ফ্যাসিবাদী শক্তির , সেই সময়ে প্রতিরোধের নকশা রচনা শুরু হলো কামারহাটি থেকে। নেতৃত্ব বুঝলেন বাংলার অন্যতম শক্তিশালী সাংগঠনিক এলাকা এই কামারহাটি। একের পর এক গোপন বৈঠক , পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন কিভাবে হবে , কোথায় হবে সেই সবটা ঠিক করা শুরু হলো কামারহাটি তে। ইতিমধ্যে সমগ্র বাংলার প্রায় প্রতিটা পাড়ায়-মহল্লায় ন্যূনতম একটি করে “শহীদ বেদী” উপহার পেয়েছে লাল ঝান্ডা ! অবশেষে ১৯৭৭ এর নির্বাচন। চিত্র খানিকটা একই। তবে, সংগঠনের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় জনগণ। জ্যোতি বসু’র বিখ্যাত উক্তি ,” মানুষ , একমাত্র মানুষই পারেন ইতিহাস রচনা করতে ” – তা যেন বাস্তবের মাটিতে করে দেখালেন বাংলার মানুষ। ১৪ ই জুন , ১৯৭৭ নির্বাচনের দিন সন্ত্রাসবাদীরা যখন বুঝতে পারছে তাদের বিরুদ্ধে সারাদিন বাংলার আপামর জনগণ নির্বাচনমুখী , শেষ আঘাত করলো তারা। সেইদিন নির্বাচন শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিলেন কম: রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জী এবং ভারতের ছাত্র ফেডারেশন , অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলার তৎকালীন সম্পাদক কম: রঞ্জন গোস্বামী। ফেরার পথে খুন হলেন কম: রঞ্জন গোস্বামী। আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের শেষ শহীদ কম: রঞ্জন গোস্বামী।
কামারহাটির মানুষ , তাদের রাজনৈতিক চেতনা এবং রাজনৈতিক মননে আজও কম: রঞ্জন গোস্বামী জীবিত।
সমগ্র রাজ্যের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির বৈপরীত্য নিয়ে যে বিধানসভা অঞ্চল গুলি রয়েছে তাদের অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা হলো কামারহাটি।
১৯৭৭ এর পর কামারহাটি কখনো লাল ঝান্ডা কে নিরাশ করেনি।লাল ঝান্ডা যতবার হাত বাড়িয়েছে , কামারহাটি তাকে বুকে আগলে রেখেছে ততবার। একইভাবে লাল ঝান্ডাও উজাড় করে দিয়েছে কামারহাটি কে।
কামারহাটি জানে তার প্রতিটা দেওয়ালে , ইট-বালি-সিমেন্টে লাল ঝান্ডার নাম লেখা আছে। বেলঘড়িয়া ব্রীজ এবং তার সংস্কার , ভৈরব গাঙ্গুলী কলেজ , হীরালাল মজুমদার মেমোরিয়াল কলেজ এর সংস্কার ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন , ইন্ডিয়া ফয়েলস , কামারহাটি জুট মিল, উইমকো, প্রবর্তক জুট মিল, সেফটি গ্লাস , এলাকায় ১০ টির বেশী সরকারি বিদ্যালয় (ছাত্র এবং ছাত্রী দের ভিন্নভাবে), সাগর দত্ত হাসপাতাল কে জেলার প্রথম মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তরিত করা , আড়িয়াদহ ফেরীঘাট, দক্ষিণেশ্বর মেট্রো লাইনের কাজ শুরু, দশ এর বেশী কমিউনিটি হল, কামারহাটি নজরুল মঞ্চ, সমাজসদন এবং তার ই সঙ্গে পূর্ব বঙ্গ ( বর্তমানে বাংলাদেশ ) থেকে রিফিউজি হয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ কে কাছে টেনে নেওয়ার জন্য একের পর এক উদ্বাস্তু কলোনী, বেলঘড়িয়া উৎসব এবং আরো অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড উপহার হিসেবে কামারহাটি কে দিয়েছে লাল ঝান্ডা।
মিথ্যার উপর ভর করে পরিবর্তনের ঝুটা-আশ্বাস, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার যে সুচারু ষড়যন্ত্র রচনা করলো আরএসএস এবং তার প্রধান মুখ মমতা ব্যানার্জি , সেই নাটকে লাল ঝান্ডা কে ভুল বুঝলেন কামারহাটির মানুষ। মানুষ কে বোঝাতে ব্যর্থ হলাম আমরাও। কামারহাটি পেলো একজন চোর-আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত-তোলাবাজ বিধায়ক। মানুষের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তার ঠিকানা হলো জেলে। গোটা বাংলার কাছে লজ্জায় মাথা হেঁট হলো কামারহাটির। সারা বাংলা দেখছে টেলিভিশনের পর্দায় – কামারহাটির মানুষের ভোটে নির্বাচিত বিধায়ক ঘুষ নিচ্ছেন হাত পেতে! এ লজ্জা কামারহাটিকে, কামারহাটির আপামর মানুষ কে আহত করলো। ২০১৬ সালে বিজেপি ভোটকাটুয়া হিসেবে প্রায় ৭০ এর বেশী আসনে তৃণমূল-কংগ্রেস কে জিততে সহায়তা করলো পরোক্ষভাবে। তবে, কামারহাটির মানুষ ছিলেন বদ্ধপরিকর। লাল ঝান্ডার প্রতি আস্থা-ভরসা উপচে পড়লো ইভিএম মেশিনে। জিতলো লাল ঝান্ডা , জিতলো কামারহাটি।
২০২১ এর কর্পোরেট মিডিয়ার তৈরি বাইনারি যখন গোটা রাজ্যে প্রবলভাবে জাঁকিয়ে বসেছে। বামপন্থীরা যখন প্রায় ধুলিস্যাৎ হয়েছে একের পর এক জায়গায় , সেই সময়েও হাতে গোনা কয়েকটা আসনের মধ্যে অন্যতম কামারহাটি যেখানে লাল ঝান্ডার প্রাপ্ত ভোট প্রায় ২০ শতাংশ ( ১৯.৬২% )। তারপর ২০২২ সালের লুঠ-গণতন্ত্রের হত্যার স্বাক্ষী হয়েছে কামারহাটি পৌরাঞ্চল।
তবে, এবার লড়াই হবে চোখে চোখ রেখে !
ফিরে আসার তাগিদ শুধু নয় , ফিরিয়ে আনার জেদ তৈরি করেছে কামারহাটির মানুষ।
একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের হাহাকার , পৌরসভার চাকরি দুর্নীতি, মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার হওয়া, গেস্ট হাউসের আড়ালে অবৈধ ব্যবসা , অপসংস্কৃতির চাষ , গোটা অঞ্চল জুড়ে ‘উন্নয়ন-বাহিনী’র তোলাবাজি র ফরমান, এলাকার সরকারি বিদ্যালয় গুলো র অচলাবস্থা , বেহাল রাস্তা-নিকাশি ব্যবস্থা , মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতা , সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে দালালরাজ , অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো, কলেজ গুলোয় আসন সংখ্যা ফাঁকা পড়ে থাকা , এলাকায় এলাকায় জমি দখল / জলাশয় বুজিয়ে অবৈধ বহুতল নির্মাণ!
কামারহাটি পরিত্রাণ চায়। কামারহাটি পরিবর্তন চায়। কামারহাটি তার অতীত ঐতিহ্য, গৌরব, সংস্কৃতি তাকে ফেরত পেতে চায়। কামারহাটির মানুষ জানেন একমাত্র লাল ঝান্ডা পারবে এই ভীষণ অন্ধকারের অনিশ্চয়তা কে কাটিয়ে নিশ্চিত সূর্যোদয়ের দিক নির্দেশ করতে। লাল ঝান্ডা অতীতে করে দেখিয়েছে , লাল ঝান্ডা আবার করে দেখাবে। প্রতিদিন এই মেজাজ সঞ্চারিত হচ্ছে মানুষের মধ্যে। পাড়ায়-পাড়ায় আলোচনা হচ্ছে ,” লাল ঝান্ডা ভালো ছিলো ” / ” পারলে ওরাই পারবে ” / ” লাল ফিরে আসুক “। শক্তিশালী হচ্ছে মানুষের মন। মানুষ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এই চোর – তোলাবাজ – ঘুষখোর দের বিরুদ্ধে। “দুর্নীতীর বুর্জ খলিফা’র” সাথে মানুষের এই লড়াইয়ে কামারহাটি তে মানুষের হাতিয়ার এবারে লাল ঝান্ডা।কয়দিন আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে সারা রাজ্যে র মানুষ শুনলেন , ” মারলে পাল্টা মার হবে “। সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে কামারহাটির মানুষের মেজাজ এটাই। শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হলো মানুষের আন্দোলনের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে।
আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধের ব্যারিকেড গড়ে সেই আক্রমণ কে প্রতিহত করতে প্রস্তুত এবারে কামারহাটি। প্রতিটা বুথে কমরেডরা জানকবুল লড়াই করছেন। নির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়নি, তবু একের পর এক এলাকা সেজে উঠছে লাল ঝান্ডায়। মানুষ দেখছেন , খুশি হচ্ছেন লাল ঝান্ডায় সেজে ওঠা পাড়া গুলো দেখে। বৈঠকি সভা গুলি তে ভীড় বাড়ছে প্রতিদিন। যে মানুষ দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন রাগে – অভিমানে – যন্ত্রণায়, সে মানুষ বুকে আগলে ধরছেন কর্মী-নেতা দের। যে মানুষ দূরে চলে গেছিলেন ক্ষোভে-খারাপ লাগায় , সে মানুষ হাত লাগাচ্ছেন ঝান্ডা লাগানোর সময়ে। পুরনো ছন্দে , পুরনো মেজাজে “কামব্যাক” করছে কামারহাটি।
শহীদ কম: রঞ্জন গোস্বামী’র মাটিতে সমাপ্তি সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়েছে “বাংলা বাঁচাও যাত্রা”। সেই মাটিতেই কমরেডরা শপথ নিয়েছেন হাল ফেরানোর-লাল ফেরানোর। সাধারণ মানুষ প্রত্যয় নিয়েছেন লাল ঝান্ডা কে ফেরানোর।
এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ আর, কর্পোরেটের বাইনারি র বিরুদ্ধে কামারহাটির মানুষের ন্যারেটিভ –
“লাল ঝান্ডা জিতলে , কামারহাটি জিতবে”।
সেই ন্যারেটিভ এর উপর ভর করেই সমগ্র কামারহাটি তৈরি হচ্ছে –
গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর সাথে ,
কামারহাটিতে লালবৈশাখী ঝড় এর জন্য !
এ লড়াইয়ে পাশে থাকুন আপনিও।
কারণ,
লড়ছে কামারহাটি, জিতবে কামারহাটি !

