বর্তমান ভারতীয় ছাত্র রাজনীতি : রক্ত, ঘাম ও সংগ্রামের পথ

বর্তমান ভারতীয় ছাত্র রাজনীতি : রক্ত, ঘাম ও সংগ্রামের পথ

• কিন্নর রায়চৌধুরী

ভারতের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ কখনও কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ে সময়ে তারা হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের অগ্রদূত, প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর, আর ন্যায়ের দাবিতে রাজপথের সাহসী যোদ্ধা। স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণ বিপ্লবীরা যেমন খুদিরাম বসু ও ভগৎ সিং আত্মবলিদানের মাধ্যমে সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিলেন, তেমনি ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৭৪ সালের জেপি আন্দোলন এবং ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের সাক্ষী। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—ছাত্র আন্দোলন কেবল শিক্ষার দাবি নয়, এটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি। তবে বর্তমান সময়ে ছাত্র রাজনীতি নতুন এক সংকটের মুখোমুখি—শিক্ষার কর্পোরেটীকরণ, বেকারত্ব, মতাদর্শগত বিভাজন ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি তার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও বর্তমান সংকট
ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ছাত্রদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৪ সালের জেপি আন্দোলন, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা কিংবা নানান গণআন্দোলনে ছাত্ররা গণতান্ত্রিক অধিকারের রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে শিক্ষার বেসরকারিকরণ বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট ছাত্রসমাজকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য তা নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে।

গত এক দশকে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় তুলনামূলকভাবে স্থবির থেকেছে, অথচ বেসরকারিকরণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। University Grants Commission-এর অনুদান কমার অভিযোগ উঠেছে। Delhi University ও Jawaharlal Nehru University-এ ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ তারই প্রতিফলন।
২০২০ সালে ঘোষিত National Education Policy শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন কাঠামো আনার কথা বললেও সমালোচকদের একাংশের মতে এতে বাজারমুখী প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে NCERT-এর পাঠ্যবই সংশোধন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা যদি সমালোচনামূলক চিন্তা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত শিক্ষার রক্ষক হিসেবে দাঁড়ানো। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে “স্বনির্ভর” হওয়ার কথা বলা হয়, তখন বাস্তবে তার মানে দাঁড়ায় ছাত্রদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ।
Indian Institutes of Technology ও Indian Institutes of Management-এ ফি বৃদ্ধির প্রশ্ন বহুবার আলোচনায় এসেছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা ধীরে ধীরে একটি বিশেষ আর্থিক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে School Service Commission দুর্নীতি কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে কীভাবে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হতে পারে। শিক্ষা শেষে কাজের নিশ্চয়তা না থাকলে ছাত্রসমাজের হতাশা বাড়ে, আন্দোলনও তীব্র হয়।

একটি ছোট গল্প: অরিন্দমের দিনলিপি
অরিন্দম কলকাতার এক সাধারণ পরিবারের ছেলে। বাবা ছোট ব্যবসায়ী, মা গৃহবধূ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। প্রথম বর্ষেই শুনল ফি বাড়ছে। হোস্টেলের খরচও বেড়েছে। বাড়িতে টানাটানি, তবু পড়াশোনা ছাড়ার কথা ভাবেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের ডাক এলো। অরিন্দম প্রথমে দ্বিধায় ছিল—পড়াশোনা নাকি আন্দোলন? কিন্তু যখন দেখল তার মতো বহু ছাত্র একই সমস্যায় ভুগছে, তখন সে বুঝল—এ লড়াই ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক।
একদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে সে দেখল প্রশাসনিক কড়াকড়ি। কিছু বন্ধু সাসপেন্ড হলো। তবু সে ভেঙে পড়েনি। কারণ সে জানত, ইতিহাসে ছাত্রদের সংগ্রাম কখনও সহজ ছিল না।
অরিন্দমের গল্প একার নয়—এ দেশের হাজারো ছাত্রের গল্প।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন প্রশাসনিক চাপে পড়েছে। University of Calcutta, Delhi University, Jawaharlal Nehru University-এ বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
তবুও প্রতিবাদ থামেনি। পশ্চিমবঙ্গে Students’ Federation of India-সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ফি বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্মসূচি নিয়েছে।
ইতিহাস দেখায়—ছাত্র–শ্রমিক–কৃষক ঐক্য বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে। আজও যদি ছাত্র আন্দোলন বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতীয় ছাত্র রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে কর্পোরেটিকরণ, বেকারত্ব ও মতাদর্শগত বিভাজন; অন্যদিকে রয়েছে ইতিহাসের সংগ্রামী ঐতিহ্য।
ছাত্র আন্দোলনের শক্তি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন একটাই—এই শক্তি কি নতুনভাবে সংগঠিত হবে?
যদি ছাত্রসমাজ নীরব থাকে, তবে শিক্ষা আরও বাজারের নিয়ন্ত্রণে যাবে। কিন্তু যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে একটি সাশ্রয়ী, বৈজ্ঞানিক ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে।
শেষ কথা একটাই—
সংগ্রাম কেবল প্রতিবাদ নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের।