যুবসমাজের ভাঙন: পুঁজিবাদী প্রতিশ্রুতির গণহত্যা
• সমাদৃতা বিশ্বাস
যে সমাজ তার তরুণদের বাঁচতে শেখাতে পারে না, সে সমাজ তাদের মৃত্যুর দায়ও এড়াতে পারে না। অথচ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সমাজের তরুণ তরুণীদের মৃত্যু বিশেষত আত্মহত্যা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্পে পরিণত হচ্ছে, আর তার পেছনে থাকা বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোটি অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন আমাদের সামনে সাফল্যের কাহিনি তুলে ধরে কিন্তু ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা আর তার পরিণতিতে ভেঙে পরা মানসিকতার ইতিহাস সেভাবে কখনোই মূল আলোচনার কেন্দ্রে আসে না। ফলে আত্মহত্যা একদিকে পরিসংখ্যান, অন্যদিকে ক্রমাগত স্বাভাবিক হয়ে ওঠা একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তথ্য বলছে, এই বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার সমষ্টি নয় এটি একটি সুসংহত সংকট। সমীক্ষা অনুযায়ী আজকের ভারতে প্রতি আট মিনিটে একজন তরুণ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এই প্রবণতাকে যদি আমরা শুধুমাত্র মানসিক দুর্বলতার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে চাই, তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সমস্যার মূল আমরা আড়াল করছি।
এই সংকটের ভিত গড়ে উঠছে সেই সমাজব্যবস্থার মধ্যেই, যা তরুণ তরুণীদের জন্য একদিকে অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন তৈরি করে, আর অন্যদিকে সেই স্বপ্ন পূরণের বাস্তব উপকরণগুলিকে ক্রমাগত সংকুচিত করে। ছোটবেলা থেকেই একজন মানুষকে শেখানো হয় যে সে যদি যথেষ্ট পরিশ্রম করে, তবে সে সফল হবেই। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি, বাস্তব সমাজব্যবস্থা সেই প্রতিশ্রুতিকে আর ধারণ করতে পারছে না। ফলে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে ফাঁক তৈরি হচ্ছে।
একদিকে ভোগবাদী সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত নতুন চাহিদা তৈরি করছে। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে আকাঙ্ক্ষাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে “কম” মানেই ব্যর্থতা। একটি সাধারণ জীবনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে, প্রতিটি মানুষকে একটি উচ্চমূল্যের জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেন সেটাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। এর ফলে একজন তরুণ তরুণী তার নিজের জীবনকে আর নিজের মানদণ্ডে বিচার করতে পারছে না; সে বিচার করছে বাজারের তৈরি মানদণ্ডে। অন্যদিকে, এই বাজারই তাকে কোনো স্থিরতা দিচ্ছে না।
চুক্তিভিত্তিক কাজ, অস্থায়ী নিয়োগ, গিগ অর্থনীতির অনিশ্চিত কাজ সব মিলিয়ে আজকের কর্মজগত এক অনির্দিষ্ট ক্ষেত্র। একজন তরুণ তরুণী কাজ পাচ্ছে, আবার সেই কাজ হারানোর ভয়ও তাকে তাড়া করছে প্রতিনিয়ত। তার শ্রমের কোনো দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নেই, তার ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার অস্তিত্বই পরিণত হচ্ছে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে, যেখানে ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবার পরিজনের সম্পর্কের পরিবর্তিত প্রকৃতি। পরিবার ছোট হচ্ছে, সময় কমছে, আর কথোপকথন ক্রমশ কমে আসছে। একজন মানুষ তার ভেতরের দুঃখ নিয়ে, মনের মধ্যে চলতে থাকা দুশ্চিন্তা, সংকট নিয়ে কথা বলার জায়গা হারাচ্ছে। সে একা থাকছে আর সেই একা থাকার ভাবনাই ধীরে ধীরে তাকে বিচ্ছিন্ন করছে। এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও তীব্র করে তুলছে ডিজিটাল জীবন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া বাস্তবতা গভীরভাবে প্রতারণামূলক। সেখানে অন্যের জীবন সবসময়ই বেশি সফল, বেশি সুন্দর। এই তুলনা শুধুই হিংসা তৈরি করে না এটি আত্মপরিচয়কে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার অনেক ঘটনাই দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল নয়; বরং তাৎক্ষণিক আবেগের বিস্ফোরণ। সেই মুহূর্তে যদি কোনো সহায়ক কাঠামো, কোনো শ্রোতা, কোনো বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিত থাকত, তাহলে হয়তো সিদ্ধান্তটি অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু আমাদের সমাজ সেই কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য, অথচ অপর্যাপ্ত। মানসিক স্বাস্থ্য এখনও নীতিনির্ধারণের প্রান্তিক বিষয়। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই, নেই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, নেই শিক্ষাব্যবস্থায় এই বিষয়ে মৌলিক অন্তর্ভুক্তি। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিগত স্তরে শুরু হলেও, তার সমাধানটি আর ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এই কারণেই আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। এটি একটি সামাজিক লক্ষণ—একটি এমন ব্যবস্থার লক্ষণ, যা তার নাগরিকদের জন্য বেঁচে থাকার শর্তগুলোকে ক্রমশ অসহনীয় করে তুলছে। তাই প্রশ্নটা শুধু এটা নয় যে কেন একজন তরুণ আত্মহত্যা করছে ? বরং প্রশ্নটা হলো—কেন এই সমাজে একজন তরুণ তরুণীর কাছে আত্মহত্যাই সম্ভাব্য বিকল্প হয়ে উঠছে ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। এটি আমাদের সময়ের অন্যতম গভীর সত্য। কিন্তু সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস কি আমাদের আছে?

