অমানিশা থেকে নক্ষত্র অবধি – আমরা জেগে থাকবই
আকাশ কর
নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে নরেন মোদী বলেছেন ওনারা স্কুল কলেজ সব বেসরকারি কোম্পানিকে দিয়ে দেবেন। এদিকে আরএসএস এর মেধাবী ছাত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও থেমে নেই। বাংলার সব স্তরের স্কুলগুলোকে পিপিপি মডেলে ছেড়ে দেওয়ার প্ল্যান কষছেন তিনি। বাংলায় শিক্ষাব্যবস্থা এতদিন ছিল অভিভাবক কিছু দেবেন, বাকিটা দেবে সরকার, এই সব মিলিয়ে যা পয়সাকড়ি হবে তা দিয়ে সমস্ত স্তরের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে। এদিকে এই পিপিপি মডেলের মানে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ। অর্থাৎ, পাবলিকই বেশিটা দেবে, প্রাইভেট অল্প দেবে – খাবে বেশি। এভাবেই চলবে স্কুল। মাঝখান থেকে সরকারটা ধাঁ। লাখ লাখ পয়সা থাকলে পড়ো। নাহলে
কেটে পড়ো। সিধি বাত। কোন ভাষায়, কোন বোর্ডে, কত টাকা দিয়ে পড়তে হবে সবই ঠিক করবেন পেটমোটা কোম্পানির মালিক। দিল্লীর লাড্ডু ভালোই খেয়েছে নবান্ন। ওরা পস্তাবে … উল্টোদিকে আমাদেরও একটা পিপিপি মডেল রয়েছে। প্রেম-পড়াশোনা-পলিটিক্স এর এই মডেলে তোমায় স্বাগতম। পড়াশোনা করেই তো কাটবে জীবন। শুধু কি সিলেবাসের পড়া? আস্ত পৃথিবীটাই তো আমাদের সিলেবাস। ‘আই হেট পলিটিক্স’ এর যুগে রাজনীতির প্রতি যাবতীয় ঘৃণার কারণগুলির বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই। কারণ, চাই অথবা না চাই রাজনীতি ছাড়া গতি নেই! আর প্রেম? ওটা আমাদের স্বভাবজাত। পড়ার ব্যাচের আড়চোখ থেকে মিছিলে মিছিলে অ্যাড্রিনালিন রাস – ভালোবাসা সর্বত্র। ভালোবাসা এই দুনিয়ার সমস্ত বঞ্চিতের প্রতি। দুরন্ত প্রেমিক বা প্রেমিকা না হলে লড়াইয়ের মৌতাতে তুমি কোত্থাও নেই। কাজ অনেক। লড়াই প্রতিদিন। যে কোনও শাসক বোঝে তার কাছে সবচেয়ে বড় থ্রেট কে! তৃণমূলও ভালোই বুঝেছিল। তাই সবার আগে ওরা কলেজগুলো থেকে বের করে দিতে উদ্যত হয়েছিল এসএফআইকে। আমরাও এক পা পিছিয়ে দু-পা এগোনোর ব্লু-প্রিন্ট এঁকে ফেলেছিলাম দ্রুত। নানা মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করার কঠিনতম কাজে আমরা সফলই হয়েছি। কারণ, ‘এসএফআই কে শেষ করে দিয়েছি’ ভেবে যারা সুখে ঘুমাবে ভেবেছিল আমরা তাদের ঘুমাতে দিইনি। রেড ভলেন্টিয়ার হয়ে এই এসএফআইরাই যারা মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কোভিডে তারাই স্কুল কলেজ খোলার আন্দোলনেও কখনও ডিএম অফিসের একেবারে অলিন্দে ঢুকে পড়েছে, কখনও আবার পুলিশ-তৃণমূলের সাথে চোখে চোখ রেখে লড়েছে এই জেলায় এই সময়ে। এপিসি কলেজে ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনরত বাম ছাত্রছাত্রীদের উপর টিএমসিপির এক দল আক্রমণ করতেই পরেরদিন মিছিল করে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা – কত বড় মাতব্বর তৈরি হয়েছে সেখানে খোঁজ নিতে। কলেজ গেটে তালা ঝুলিয়ে ওরা পালালেও আমাদের মিছিলে গাড়ি ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাংলার বহুরূপী মুকুল রায়। তার গাড়ি আটকে দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বলে দেয়, মিছিল শেষ না হওয়া অবধি গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে আপনি ভেবে ঠিক করুন, কোথায় আছেন এখন তৃণমূল না বিজেপিতে। মাটিয়ায় ধর্ষিতা হল একরত্তি মেয়ে। মহিলাদের নিয়ে ছাত্ররা ছুটে গেল সেখানে। থানা ঘিরে জানিয়ে দিল, স্পষ্ট কথা – শাস্তি চাই। স্কুল কলেজ খুলেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের যে অসংখ্য বন্ধু হারিয়ে গেল পড়াশোনার আঙিনা থেকে, যে বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেল ছোট্ট বয়সেই! তার কি হবে? আমরা গড়লাম অ্যান্টি ড্রপআউট স্কোয়াড। এই সংক্রান্ত সমীক্ষা করে তা তুলে দেওয়া হল আদালতের কাছে। আরও অনেক বিকল্প ভাবনা নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। একদিকে ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে সীমিত ক্ষমতা নিয়েই নানা বিকল্পের কাজ করে যাওয়া। অন্যদিকে আপোষহীন লড়াই-আন্দোলন। মিথ্যে মামলা, আক্রমণ, হুমকি মাথায় নিয়েই ইস্পাতের মর দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের কমরেডরা। এক সময় এসএফআই-কে রক্ষা করাই ছিল চ্যালেঞ্জ। এখন আবার বাড়ছে এসএফআই। ভরসা বিশ্বাস সবই ফের ফিরছে আমাদের দিকে। ধীরগতিতে হলেও অল্প অল্প করে আমরা আবার ফিরতে চাইছি আমাদের স্বাভাবিক ক্ষেত্র স্কুল কলেজের ক্যাম্পাসে। ভীতির পরিবেশ তো আছেই। কিন্তু আমাদের কথা স্পষ্ট। পৃথিবীতে কোথাও কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘর্ষছাড়া হয়নি। আমাদের কমরেডদের জন্য আমাদের বার্তা – পড়ে পড়ে মার খাওয়ার দিন শেষ। যথেষ্ট ভদ্র ছেলেমেয়ে আমরা। আগ বাড়িয়ে কখনও কাউকে আক্রমণ করি না। কিন্তু কেউ যদি আগ বাড়িয়ে আমাদের আক্রমণ গিফ্ট করে তাহলে ভদ্রতার খাতিরেই তাদের রিটার্নগিফট দেওয়া আমাদের পবিত্র কর্তব্য। সোজা হয়ে দাঁড়াও। শক্ত করে। কলেজের গেটে, কলেজের ক্লাসে। চোখে চোখ রেখে। সুদীপ্ত থেকে আনিস তাদের রক্ত স্মরণে রেখে কোমর বেঁধে নাম। দুষ্টু-দামাল ছেলেরা দুষ্টুমি করতে এলে কিভাবে সেই ভূত ভাগাতে হয় আমাদের তা জানা আছে। উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার গোটা এসএফআই ঝাঁপিয়ে পড়তে তৈরি সেখানে। আকারে এবং বৈচিত্র্যে উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার জুড়ি মেলা ভার। তার নানা ভিন্নতাকে মাথায় রেখেই আমরা পরিকল্পনা করছি ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করার। তাদের বিভিন্ন চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে ভাগ ভাগ করে আমরা ভাবছি, কিভাবে এই প্রতিযোগিতার যুগে তাদের স্বাবলম্ভী করতে তুলতে ভূমিকা নিতে পারি আমরা। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর সাথেই সঠিক দাবিতে, সাহসী আন্দোলন ছাড়া কোনও গতি নেই। রঞ্জন গোস্বামী থেকে সুভাষ চক্রবর্তী কিংবা গৌতম দেব – এছাড়াও আরও অসংখ্য রত্নের জন্ম দিয়েছে এ জেলার ছাত্র আন্দোলন। ম্যাকনামারাকে আটকে দেওয়া কিংবা নুরুল ইসলামদের খাদ্য আন্দোলন বহু চমকে দেওয়া লড়াইয়ের ইতিহাস লেখা হয়েছে এই জেলাতেই। আমরা তাদেরই উত্তরসূরী। এই জেলার ছাত্র ফেডারেশনের সমস্ত কর্মীদের কাছে আমাদের অনুরোধ, এই ঐতিহ্যের পাহারাদার আমরা। গোটা দেশের বাম প্রগতিশীল আন্দোলন তাকিয়ে আছে আমাদের মুখের দিকে। আমাদের দায় তাদের ভরসা দেওয়া। আমাদের দায় শত শহীদের রক্তঋণ শোধ করার। এসো, আমরা এক হয়ে দাঁড়াই বুক চিতিয়ে। আমাদের প্রত্যেকের যেটুকু কাজ – হৃদয় দিয়ে ঘাম ঝরিয়ে আমাদের সর্বস্ব দিই সেই কাজে। অভেদ্য সংগঠন, আগুনের মত জেদ আর বিদ্যুতের মত উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিয়ে যদি আমরা পথ হাঁটা শুরু করি – ওরকম অনেক মাতব্বরের মাতব্বরি আমরা ছুটিয়ে দিয়েছি। আবার দেব। সাধারণ গরীব ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা আজ রীতিমত কঠিন হয়ে উঠেছে, চারিদিকে ভয়ের পরিবেশ। কথা বলতে পারছে না কেউ। তাই আমাদের পালটা লড়াইয়ের দিকেই ভিড় বাড়ছে রোজ। চোখের মণির মত এই ভিড়কে লালন করে পাহাড় কাটতে কাটতেই এগোব আমরা। এগোচ্ছি… ক্ষমতার পাহাড় টলার শব্দ স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। আরেকটু জোরে ধাক্কা চাই। হাত লাগাও। জোর লাগাও। দম লাগাও…


