গেরি, গুগলি, শামুকের দেশে
শাম্বদিত্য ঘোষ
‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’ এই কথাটার আক্ষরিক অর্থবোঝা যায় তখনই যখন সুন্দরবনের মতন একটি সুন্দর ও রহস্যময় গভীর বনকে যখন খুঁজে পাওয়া যায় আমার জন্মভূমির ঠিক পাশেই। শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ক্যানিংয়ে আসুন। এইবার ওখান থেকে অটো করে সোনাখালী ফেরি ঘাটে চলে আসুন, উঠে পড়ুন নৌকায়, প্রথমেই শুরু হবে হোগল নদী দিয়ে তারপর সেটার নাম বদলে হবে কর্তাল নদী। এই কর্তাল নদী গদখালীতে গিয়ে বিদ্যাধরী নদীতে মিশেছে। এই গদখালির উল্টো দিকে পড়বে গোসাবা। সেখান থেকে আবার নৌকা করে দূর্গাদুয়ানি নদী ও সেই দূর্গাদুয়ানি নদী থেকে গুমদী নদীর পাশ থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবন।
বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। এই বনভূমি দুই বাংলাকে একটা অদৃশ্য রাখিবন্ধনের ন্যায় বেঁধে রেখেছে। ওপার বাংলার পদ্মা নদী সাথে এপার বাংলার মেঘনা, ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই বনভূমি। এমনকি ওপার বাংলার খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলা আর এই পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা আর দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা জুড়ে এই সুন্দরবনের রাখিবন্ধনের ন্যায় অবস্থান। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার এই সুন্দরবন। সুন্দরবন সত্যিই সুন্দর কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কিন্তু এটা একটা বৈচিত্র্যপূর্ণ জায়গা সেটা নিয়ে কারোর দ্বিমত থাকতে পারে না। যেখানে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরনের মপাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। জরিপ মোতাবেক ১০৬ বাঘ ও ১০০০০০ থেকে ১৫০০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায়। মুঘল আমল থেকে আজ অব্দি সুন্দরবনের এই সুন্দরের রহস্যভেদ আজও পর্যন্ত কেউ করতে পারিনি, সারা বিশ্বের কাছে একটা আশ্চর্যতম বনভূমি যার অনেক রহস্য আজও রহস্যই থেকে গেছে। দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি (৬২%) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত।
দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বেবলেশ্বর নদী আর উত্তরে বেশি চাষ ঘনত্বের জমি বরাবর সীমানা। উঁচু এলাকায় নদীর প্রধান শাখাগুলো ছাড়া অন্যান্য জলধারাগুলো সর্বত্রই বেড়িবাঁধ ও নিচু জমি দ্বারা বহুলাংশে বাঁধাপ্রাপ্ত। উঁচু অঞ্চলে স্বাদুজলের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভারতীয় ম্যানগ্রোভ আর্দ্রভূমিগুলোর অনেকগুলোতে স্বাদু জলের প্রবাহ ১৯ শতকের শেষের দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। একই সাথে নিও- টেকটনিক গতির কারণে বেঙ্গল বেসিনও পূর্বের দিকে সামান্য ঢালু হয়ে গিয়েছে, যার ফলে স্বাদু জলের বৃহত্তর অংশ চলে আসছে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে।
সুন্দরবনে ব্যাপক প্রাণীবৈচিত্র্য বিদ্যমান। প্রাণী বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা সুন্দরবনের কিছু কিছু এলাকায় শিকার নিষিদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ অভয়ারণ্যের মত, যেখানে শর্তহীনভাবে বনজ সম্পদ সংগ্রহ করা যায়না এবং বন্য প্রাণীর জীবনে সামান্যই ব্যাঘাত ঘটে। যদিও এটা স্পষ্ট যে সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের প্রাণী সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। সুন্দরবন বাণিজ্যিক দিক থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণপ্রায় ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রাজাতির
পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ সরীসৃপ এবং ৮টি উভচর প্রাজাতির আবাসস্থল।
এতো কিছুর মধ্যেও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা উপন্যাসের একটা লাইন মনে পড়ে যায় নায়ক-ছেলেটি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘‘আপনি কাছিমের খোল একত্র করেন,মুক্তা বিক্রি করেন না?’’ বৃদ্ধের উত্তর — ‘‘না কাউকে দেখাই না। অনেক টাকার মাল। টাকা হলে মনে অহংকার আসবে, বিলাসের ইচ্ছা আসবে। এমন সুন্দর জায়গা থেকে হবে চির-নির্বাসন।’’ আসলে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা তার পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রের একটা নুন্যতম ভূমিকা ছিলো আর ম্যানগ্রোভ বেষ্ঠিত সুন্দরবন এর ন্যায় এইরকম একটা বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ঐতিহ্যপূর্ণবনভূমিকে সংরক্ষণ করা, ওই বনভূমির মধ্যে থাকা প্রচুর প্রজাতির পশু, পাখি থেকে বিভিন্ন জীবদের সংরক্ষণ করা, তবে বর্তমান রাষ্ট্রের কাছে এই সুন্দরবন একটা মুনাফা লাভের মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই না, এমনকি বর্তমানে সুন্দরবনের মধ্যে চোরা ব্যবসায়ীদের এতটাই রম রমা ব্যবসা যে এই চোরা শিকারীদের হাতে পড়ে বহু প্রজাতির জীব আজ তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে, তার সাথে অবাধে চলছে ম্যানগ্রোভ গাছের চোরা চালান। রাষ্ট্রের সেই নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, এমনকি সুন্দরবনের বর্তমানে ভৌগলিক অবস্থানেও অনেকটা পরিবর্তন দেখা গিয়েছে, তার কারণ স্বরূপ বলা যায় সেখানকার নদীর নাব্যতা বিপুল হারে কমছে, তার পিছনে বড় কারণ হলো নদীর ধার থেকে বেআইনি ভাবে নদীর থেকে বালি তোলা, শুধু তাই নয় নদীর ধারে অপরিকল্পিত ভাবে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ইট ভাটা, এই বেআইনি ভাবে ইট ভাটা আর মেছো ভেড়ি গুলো রাষ্ট্রের চোখের সামনে তৈরি হলেও প্রতিক্ষেত্রে রাষ্ট্র তা মুখ বুঁজে রয়েছে কারণ একটাই, কাটমানির জন্যে তারা সব কিছু করতে রাজি, কিন্তু এর ফলে তৈরি হচ্ছে একটা বিশাল শূন্যতা, আর আয়লা, আম্ফান পরবর্তী অবস্থা আরো খারাপের জায়গায় গিয়েছে, তার উপরে ক্ষয়িষ্ণু বাঁধ এর ফলে আর নদীর নাব্যতা বিপুল ভাবে কমায় নদীর জলোচ্ছ্বাস স্থলভূমিতে উঠে আসছে, আর শুধু তাই নয়, এর ফলে বিভিন্ন চাষ যোগ্য জমিতে সেই জল প্লাবিত হওয়ার ফলে সেখানকার ফসল নষ্ট হচ্ছে, আর এই সুন্দরবন এর জনজীবন কঠিন থেকে আরো কঠিনতর হয়ে উঠছে।
কৃষকসভার বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে সুন্দরবনের বুকে বিভিন্ন আবাদ জমির উপর চাষাবাদ করে সেখানে একটি জনবসতি তৈরির যে চেষ্টা হয়েছিলো, সেইখানে এখন অনেকটাই ভাটা পরে যাচ্ছে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ইচ্ছাকৃত গাফিলতির শিকার হচ্ছে ওই সুন্দরবনে থাকা কয়েকটি খেটে খাওয়া মানুষ, যারা প্রতিদিন তাদের বুকের রক্ত দিয়ে সুন্দরবন কে আরো সুন্দর করে তোলার চেষ্টায় আছে, তাদের কে আরো অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দিয়ে তাদের পরিযায়ী শ্রমিক পরিণত করেছে এই রাষ্ট্র। সুন্দরবনকে শুধুমাত্র মুনাফা লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে এখনকার রাজ্য সরকার। এখন সুন্দরবনের বুকে অবৈজ্ঞানিক ভাবে গভীর নলকূপ বসছে। এর ফলে আমাদের এই ‘গেড়ি, গুগলি, শামুকের দেশ’ অবলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে, আর এইভাবে চললে সারা বিশ্বের বুকে একটি রহস্যময় বৈচিত্র্যপূর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য হারিয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। আগামীদিনের ছাত্র যুবদের ওপর সুন্দরবনকে রক্ষা করার একটা গুরু দায়িত্ব পড়েছে, এই রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে আমাদেরকেই বাঁধ নির্মাণ ও বাঁধ এর পাশে বাদাবন তৈরির গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে, আর তার সাথেই এই চ্যালেঞ্জ দিয়ে যেতে হবে রাষ্ট্রকে যে তারা যদি এই সুন্দরবনকে তাদের মুনাফা লাভের প্রয়োজনে ব্যবহার করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে এই ছাত্র যুবরা, অতীতের ‘চিপকো আন্দোলন’ এর মতোন আরো কঠিন ও দীর্ঘতর আন্দোলনমুখী হবে তারা। এই সচেতন ছাত্র যুবরা থাকতে পৃথিবীর বুক থেকে একটা রহস্যময় বৈচিত্রপূর্ন এই সুন্দরী গাছের তৈরি সুন্দরবনকে এই বাংলার বুক থেকে কখনোই হারিয়ে যেতে দেবে না, তারা রক্ত দেবে, জীবন দেবে তবুও সুন্দরবনকে ধ্বংস হতে দেবে না। সুন্দরবনকে সারাজীবন ‘সুন্দর’ রাখার দায়িত্ব তাদের…!


