প্রতিশোধের আগুন থেকে প্রতিরোধের স্পর্ধা
- নীলাংশু পাজা
পর্বতসম বিপত্তি, প্রতি মূহূর্তে ভাঙতে চাইছে, বিভেদ করছে কখনো জাতে কখনো ধর্মেকখনো বর্ণেকখনো নারী-পুরুষে কখনো অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কিন্তু, ঘন অন্ধকারের বুক চিড়ে এক চিলতে ফুটফুটে সকাল দেখাচ্ছে একটা পতাকা, একটা আদর্শ, একটা লড়াই, একটা আবেগ, একটা ভালোবাসা, একটা স্পর্ধা ‘‘ভারতের ছাত্র ফেডারেশন’’। ঐতিহ্যটা মাটিতে মেশানোর নয়, ঐতিহ্যটা রক্ত দিয়ে কেনা মাটির।কতভাবে চেষ্টা করেছে আর, করে চলেছে। খুন, গুলি, বোমা, ধর্ষণ সর্বশক্তি দিয়েও মুছতে পারছে না আপসহীন সংগ্রাম এর অমোঘ বাণীকে। যতো মারছে ততো যেন জেদটা দ্বিগুণ হচ্ছে। প্রতিটা ধাক্কা বুক পেতে নিচ্ছে শ্বেত পতাকাটা। তারপর স্বমহিমায়, সুসজ্জিত হয়ে ফিরে আসছে। কি করে হয় এমনটা? বাকিরা তো কেউ কলেজ গেটে তোলা তুলছে, কেউ ‘‘রাম নাম’’ টুকুই ‘‘সত্য হে’’ করতে ব্যস্ত। ‘‘কিসের এতো দায় পড়েছে এই ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়েগুলোর? কি চাই ওদের? কিসের স্বপ্ন? কোন সমাজ চাইছে ওরা?’’
এই প্রশ্নটা শেষ করেছেন সবে প্রিয়াংশুবাবু। চায়ের দোকানে বেশ জনা দশেক লোক এর মধ্যে এক কোণে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলো সমর। বুকের ভেতরটা জ্বলে গেলো প্রশ্নটা শুনে কিন্তু, মৃদু হেসে বললো, ‘‘দাদা এমন বলছেন? জানেন ওরা কি চায়? কিসের স্বপ্ন বোঝেন না? যথেষ্ট মান্য গণ্য তো আপনি! তাও এমন বলছেন? তবে, দোষ আপনার নয়। আমিও আপনার মতো চোখে কালো কাপড় বেঁধেই ছিলাম, শুনেও শুনতাম না ওদের কথা, ভাবতাম এদের খালি বড়ো বড়ো আওয়াজ! মুখেই খালি হাতি-ঘোড়া মারছে। কিন্তু, কতদিন চোখ বন্ধ থাকবে? আমি পারিনি চোখ-কান বন্ধ করে থাকতে। ওরা থাকতে দেয়নি। আমার মেয়েটা ক্লাস ৯-এ পড়ে। দেশজোড়া লকডাউন এ সবটা লন্ডভন্ড, ওরা মেয়েটাকে খাতা-পেন দিলো পড়বার জন্য। আমি যখন পেট চালানোর চিন্তায় নাজেহাল, ওরা তখন মেয়েটাকে পেন-খাতা দিলো। যা আমি ভাবিনি, ওরা ভেবেছে। এক্ষুণি বলবেন যে, অমন পেন-খাতা সবাই দিতে পারে। আমিও ভাবছিলাম যে সবাই তো পারে কিন্তু, ওরা করে দেখালো। সেই ছোটবেলা শুনতাম ওদের মিটিং-এ রঞ্জন গোস্বামী’র কথা। ওরা গর্বকরে প্রাণ দিতে পারে বাবু, ওরা মরতে ভয় পায় না। ওরা এই সমাজ ব্যবস্থাটাকে পাল্টে অধিকার বুঝে নেওয়ার আর, বুঝিয়ে দেওয়ার লড়াইটা করছে। ওরা গরীবের ঘরে আবার শিক্ষার আলো জ্বালানোর দিন আনবার কথা বলে। ওরা গলা ফাটিয়ে বলে শিক্ষা সকলের, না ধর্মের না বাজারের। সহজ কথাগুলো বুঝতে পারেন না? আমার মতো কম জানা লোক যদি ওদের ভালোবেসে ফেলে আপনিও দেখুন, ভাবুন ওদের কথা আপনিও পারবেন। আর, হ্যাঁদয়া করে এবার চোখের কালো পর্দাটা সরিয়ে দিন।’’

হেঁটে চলে গেলো সমর। সবকটা কথা খুব বুকে লেগেছিলো প্রিয়াংশু বাবুর। বাজার করতে বেরিয়ে হঠাৎ একটা মোড় এর মাথায় দেখলেন কয়েকটা ছেলে-মেয়ে জড়ো হয়ে গলা ফাটিয়ে বলছে, ‘‘সুদীপ্তদা তোমার অসমাপ্ত কাজ আমরা সমাপ্ত করবোই…’’
নামটা শুনে আর, ওই ছবিটা দেখে ওনার ততক্ষণে মনে পড়ে গেছে ঘটনাটা। বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে উনি এগিয়ে এসে ছেলে-মেয়েগুলো কে বললেন, ‘‘সুদীপ্ত আজ আবার ফিরে এসছে। পারেনি সুদীপ্তকে মারতে। ওরা সুদীপ্তদের মারতে পারবে না।’’
হ্যাঁ… ওরা পারেনি সুদীপ্তদাকে মারতে … ওরা পারেনি স্বপন কোলেকে মারতে… ওরা পারেনি তিলক টুডুকে মারতে….কারণ, এরা সবাই রঞ্জন গোস্বামীদের রক্তিম উত্তরাধিকার বহন করেছে। আর, এদের উত্তরাধিকার বহন করছি আমরা। লড়াই হবে রাজপথে, স্লোগান হবে, ‘‘আপোষ না সংগ্রাম’’…
শিক্ষার অধিকার বজায় রাখতে, কলেজগেটে দালালী আর, দাদাগিরি বন্ধ করার লড়াই-এর দায় এবং দায়িত্ব তো সুদীপ্ত, স্বপন, সঈফুদ্দিনদের কমরেডদেরই। এ দায়ভার কাঁধে নিয়ে আরো বড়ো লড়াইয়ে, আরো বড়ো ময়দানে দেখা হবে কমরেড।
কি কমরেড হবে তো দেখা?
রঞ্জন গোস্বামী থেকে আজকের আনিস খান হয়তো আজকে হাসতে হাসতে বলছে, ‘‘You Can Only Kill A Man, But Not His Idiology’’।

