শ্রমিক মহল্লার ‘‘ভালো লাগা’’
- পূজা চন্দ
সমস্যার মধ্যে দিয়ে বড় হলেও রিঙ্কি কখনও বোঝেনি অভাব কি জিনিস। বাবা কারখানার শ্রমিক। মা লোকের বাড়িতে দু’বেলা রান্নার কাজ করে। ছোটো থেকে বড্ড আদরে বড়ো হয়েছে রিঙ্কি। ওরা মফঃস্বলে থাকে।
সকাল ৫.৫৫’তে কারখানার বাঁশিতে ঘুম ভাঙে। তারপর মায়ের সাথে হাতে হাতে ঘরের কাজ গুছিয়ে, রিঙ্কি বইটা খুলে পড়তে বসে, আর ওর মা কিছুটা কাজ সেরে বেড়িয়ে পড়ে মালিকের বাড়ির রান্নার কাজ করতে।
রিঙ্কি এখন সবে ১৭। পরেরবার উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। স্কুল যাতায়াতের পথে পাশে! পাড়ার গোকুলের সাথে ওর রোজ দেখা হয়। গোকুলও সবে সবে কারখানার কাজে ঢুকেছে। রোজ সকালে কাজে যায়, কিন্তু লকডাউনের পরে রোজ কাজ পায় না। যেদিন যেদিন কাজ হয় সেদিন করে, আর বাকি দিনগুলো
এদিক-ওদিক করে কাটিয়ে দেয়। বাড়িতে মা আর ছেলে, কোনোভাবে দিন কেটে যায়। বাবাও কারখানার শ্রমিক ছিল। ছোটোবেলা থেকে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর পরিবেশে বড় হয়েছে গোকুল।
রিঙ্কিকে খুব পছন্দ করে গোকুল। গোকুলকেও রিঙ্কির বরাবর ভালো লাগে। গতবছর পাড়ার রবীন্দ্র জয়ন্তীতে যখন রিঙ্কি গান গায় তখন থেকে গোকুলের ভালোলাগা শুরু। ওদিকে মাস ছয়েক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন রিঙ্কি দেখে কারখানার বন্ধ গেটের সামনে হাতে মাইক ধরে ‘সবার যেন কাজ থাকে’ সেই দাবি নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে গোকুল। রিঙ্কির ভালো লাগা সেখান দিয়ে। কিন্তু ওরা কখনও এসব প্রকাশ করেনি।
রিঙ্কি আর গোকুলের বেড়ে ওঠা উদ্বাস্তু অঞ্চলে। শ্রমিক মহল্লা একধারে, অপরদিকে রেলের কোয়ার্টার। এখানে সন্ধ্যার পর কাজ সেরে সবাই আড্ডা্মারে। সারাদিনের যত গল্প সবটা ভাগ করে নেয়। রিঙ্কিরা সন্ধ্যাবেলা পড়ার পর যেখানে গল্প করে ঠিক তার থেকে দু’হাত দূরেই গোকুলদের আড্ডার ঠেক।
গোকুল ঠিক করেছে কাল সে রিঙ্কিকে জানাবে যে ও রিঙ্কিকে খুব পছন্দ করে। সেই মতো পরেরদিন ও রিঙ্কিকে জানায়। প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরে রিঙ্কি কিছুটা সহজ হয়ে জানায় যে সেও গোকুলকে পছন্দ করে। তারা ঠিক করে তারা এই ভালো লাগাকে সামনের দিনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

রিঙ্কি ছোটোবেলা থেকে দেখেছে তার মা অল্প রোজগারেও কতো গুছিয়ে সংসার চালায়। টাকা প্রচুর না থাকলেও ভালোবাসা রয়েছে প্রচুর, তাই নিজেও স্বপ্ন দেখে গোকুলের সাথে থেকে সারাটা জীবন কাটানোর। এক হয়ে যাওয়ার। একসাথে থাকার।

