নয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে

নয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে

  • সৃজন ভট্টাচার্য

স্বাধীনতার ৭৫ বছর। চারিদিকে সাজো সাজো রব। অনেক অপ্রাপ্তি , দীর্ঘশ্বাস, না-পাওয়ার মধ্যে ও এ যেন এক বিশায় — 

এত এত বৈচিত্র্যের দেশ। কীভাবে এতগুলো বছর জাত-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষ এত মানষুকে একসাথে নিয়ে হেঁটে ফেলল পথ। কাজ সহজ ছিল না নেহাত। বিশেষত শাসকশ্রেণীর আক্রমণ সাধারণ মানুষের উপর। গত সাড়ে সাত দশকে বারংবার আহত করেছে জাতীয় সংহতির মূল ভিত্তিগুলিকেই। তথাপি — লড়েছে মানুষ, বেঁচেছে মানুষ। আমাদের ভারতীয় হয়ে ওঠার অনেকগুলি দিক। দেশের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ছাড়া খুব সমৃদ্ধির দেশ তৈরি হতে পারে না। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান — জীবনের আশু প্রয়োজনীয়গুলি মেটাতে সরকার বা রাষ্ট্র যদি দায়িত্ব না নেয়, সে দেশের ‘দেশ’ হিসেবে গড়ে ওঠা কঠিন আছে। আম্বেদকরের সংবিধান রচনার মুহূর্তেই ব্যক্ত করেছিলেন আশঙ্কার কথা। আমরা মুখে অনেক কথা বলছি সংবিধানের মাধ্যমে, কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারই সম্পূর্ণ হয় না গরিবদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুনিশ্চিত না করলে সেইটি আমাদের সংবিধান গ্যারান্টি করছে না — এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে বিপদ আছে, বলেছিলেন আম্বেদকর। আমরা, মার্কসবাদীরা তাই চেয়েছিলাম স্বাধীন ভারত সমাজতান্ত্রিক ভাবধারাকে বজায় রেখে এগিয়ে যাক। তা হলো না, নূ্ন্যতম নাগরিক অধিকারগুলি আজ ৭৫ বছর পর অস্তিত্ব সঙ্কটে।

হীরক রাজার দেশে নিয়ম ছিল ছাত্রদের বেশি লেখাপড়া করতে দেওয়া যাবে না কারণ তারা যত বেশি জানে, তত কম মানে। 

আমাদের দেশ এই মুহূর্তে পৃথিবীর তরুণতম দেশ। মান্যতা সম্পদ উন্নয়ণের উদ্দেশ্যেই যে বিপুল তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলা ছিল সরকারের আশু কাজ। গত ৭৫ বছরে ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্য থেকে ক্রমে সরতেই থেকেছে ভারতের শাসক। কোঠারি কমিশনের (১৯৬৪) সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৬% কোন দিন বরাদ্দ হয়নি, মোদী আমলে তা এসে ঠেকেছে সর্বনিম্ন পরিমাণে। কোভিডের সময়ে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁকিটা বেআব্রু হয়ে গেছে সকলের চোখের সামনে। ক্ষতি হলো কার? বামেদের না দেশের?

স্বাধীন ভারতে তিনবার জাতীয় শিক্ষানীতি গঠিত হয়েছে। ১৯৬৮ সালের শিক্ষানীতিতে কল্যাণকর রাষ্ট্রের মূল্যবোধগুলি কমবেশি তুলে ধরার চেষ্টাটুকু অন্তত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতি প্রথম উচ্চারণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা। ১৯৯১ পরবর্তী ভারতে, গ্যাটস চুক্তি পরবর্তী ভারতে লাগামছাড়া বেসরকারিকরণ শেষমেশ আমাদের এনে ফেলেছে ২০২০ সালের নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে, যার মূল বৈশিষ্ট্য তিনটি ‘C’ Centralisation, Commercialization and Communalization of Education. শিক্ষা যা ছিল Public Service রূপান্তরিত হয়ে গেল ‘Private Good’ এ। এই সব্বোনেশে শিক্ষানীতির প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন এখনই।

কেন বলছি একথা?

প্রথমতঃ, স্কুল শিক্ষাব্যবস্থাতে ১০+২ সিস্টেমের পরিবর্তে ৫+৩+৩+৪ ব্যবস্থা নিয়ে আসার কথাবলা হয়েছে। অঙ্গনওয়াড়িকে প্রাইমারী স্তরের সাথে মিশিয়ে ৩বছর বয়স থেকেই শিশুকে শিক্ষাক্ষেত্রের আওতায় নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। আপাতভাবে সাধুবাদযোগ্য মনে হলে ও আশঙ্কা থেকেই যায়, বিপুল অংশের শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে অঙ্গনওয়াড়ির যে অপরিহার্য ভূমিকা তা ক্ষতিগ্রস্থ হলে আদতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে শিশুশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। বিশেষত গ্রামীণ অনগ্রসর অঞ্চলে এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। এই আশঙ্কার কারণ হল, এই ফর্মুলার জন্য যে পরিকাঠামো দরকার তার জন্য অর্থবরাদ্দ কোথা থেকে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলা নেই। মিড ডে মিলে প্রাতঃরাশকে যুক্ত করা বা ছাত্র শিক্ষক অনপুাত যথাযথ করার মত ইতিবাচক প্রস্তাব থাকলে ও সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রশ্নে ধোঁয়াশাই থেকে গেছে। তাহলে কি বেসরকারীকরণের রাস্তা প্রশস্ত হবে এবং শেষমেশ আর্থনীতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়েপড়া পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে?

দ্বিতীয়তঃ, স্কুল শিক্ষায় হায়ার সেকেন্ডারি স্তর তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ক্লাস ৯-১২-কে সেকেন্ডারি স্তরের আওতায় এনে সেমিস্টার সিষ্টেম লাগু করার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে এরফলে পড়াশুনার খরচ বাড়বে। এমনিতেই বলা রয়েছে যে বেসরকারী স্কুল তাদের ইচ্ছামতো ফি নিতে পারবে। মূল কথা হল, ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা নেওয়ার ন্যূনতম পরিকাঠামো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে কিনা তা ভাবা প্রয়োজন। যদি সরকার নিজের খরচে পরিকাঠামো না বাড়ায়, তাহলে যাবতীয় প্রস্তাবই আসলে স্কুল শিক্ষাকে ব্যবসায়ীদের মগৃয়াক্ষেত্র বানিয়ে ফেলার চক্রান্ত বলেই বিচার্য হবে।

গোটা শিক্ষানীতি জুড়ে ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারী অ্যাপ্রোচ’র কথা বলা হয়েছে প্রতি স্তরে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানোর পরিকল্পনা শাসকের দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সি.বি.সি.এস. রূপায়ণের মধ্যে ও এর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আমাদের আশঙ্কা এরফলে কোন একটি বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের সম্ভবনা কমে যাবে। একই সাথে ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারী অ্যাপ্রোচ’ তৈরি করার জন্য যে পর্যাপ্ত পরিমাণ যোগ্য শিক্ষক এবং সামগ্রিক পরিকাঠামো দরকার তা আদৌ আছে, নাকি এ আসলে অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর দোহাই দিয়ে বেসরকারীকরণের পথ সুগম করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

স্কুল শিক্ষার সাথে যোগসূত্র রেখেই কলেজ শিক্ষা ব্যবস্থাকে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একটি কলেজের ভৌগোলিক পরিপার্শ্বে মধ্যে স্কুল কমপ্লেক্স তৈরি করে নেটওয়ার্কবানানোর কথা বলা হয়েছে , যদি ও একাজে প্রয়োজনীয় সরকারী ব্যয়বরাদ্দ সম্পর্কেপ্রায় কোনো কথাই নেই। এক্ষেত্রে ও ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারী অ্যাপ্রোচ’র কথা এসেছে। আমাদের আশঙ্কা আদতে এরফলে চাকরির প্রয়োজনে যে টুকু পড়াশুনা করা দরকার শুধু সেটুকুকেই গুরুত্ব দিয়ে এক জগাখিচুড়ি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। জ্যাক অব অল ট্রেডস, মাস্টার অব নান— এমন ছাত্র বছর বছর হাজারে হাজারে বেরোবে যারা এই মনুাফাভোগী ব্যবস্থার ক্রীড়নক হিসাবে কাজ করবে, আদতে হবে শোষকশ্রেণির দ্বারা কম ভায়ায় ইচ্ছামত খাটিয়ে নেওয়ার বাহিনী। ভোকেশনাল ও বাজার কেন্দ্রিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে, যা বাস্তবে আমাদের আশঙ্কার যাথার্থ্য প্রমাণ করে। সরকারি কর্তাব্যক্তিরা সম্ভবত মন দিয়ে ‘‘হীরক রাজার দেশে” দেখেছেন। আগামী প্রজন্মের মনে স্বকীয় ভাবনা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার বিকাশ ঘটুক তা তাঁরা চান না। তাই সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকেই তাই যন্তরমন্তর ঘর বানিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে।

উচ্চশিক্ষার ৩বছরের গ্র্যাজুয়েশনের সাথে ১ বছরের স্পেশাল বি.এড কোর্স জুড়ে দিয়ে ‘ফোর ইয়ার ইন্টিগ্রেটেড পোগ্রাম’ লাগু করার কথা বলা হচ্ছে। যদি ও ২ বছর বা ১ বছরে আলাদা বি.এড কোর্সের সুযোগও শর্ত সাপেক্ষে খুলে রাখা আছে। সমস্ত বি.এড কলেজকে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই গোটা প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন থেকে যায় ‘ফোর ইয়ার ইন্টিগ্রেটেড পোগ্রাম’র সুযোগকে বলমাত্র সমাজে আর্থিকভাবে সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতেই পৌঁছবে না তো? অভিজ্ঞতা বলে একটা বড় অংশের ছাত্রই চার বছর ধরে স্নাতক পড়ার বিলাসিতা দেখাতে পারে না মাঝপথে পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

সামগ্রিকভাবেই বিএড কোর্স এবং ভবিষ্যতের শিক্ষক প্রস্তুত করার প্রশ্নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরজন্যে তিনটি টাইপে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে — 

ক) গবেষণা বিশ্ববদ্যালয় খ) শিক্ষকতা বিশ্ববিদ্যালয় গ) সাধারণ 

কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারা অনমুমোদিত কলেজ ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় শর্তাবলী পূরণ করে কয়েক বছরের মধ্যে হয় কলেজগুলিকে স্বাধীন ডিগ্রিদানকারী কলেজে রূপান্তরিত হতে হবে নতুবা মিশে যেতে হবে টাইপ ১ বা টাইপ ২ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। আমাদের আশঙ্কা এরফলে পরিকাঠামোর অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে বা মিশে যাবে অজস্র কলেজ, যাতে আদতে কমবে শিক্ষার সুযোগ। এছাড়াও ডিগ্রিদানের অধিকার পেলে কলেজগুলিতে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে। ‘হিউম্যান রিসোর্সডেভেলভমেন্ট সেন্টার’গুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মিশিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সরকারি বেসরকারি স্কুল কমপ্লেক্সের নেটওয়ার্ক তৈরির করার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সামগ্রিকভাবে এই সকল কাজে সরকারি অর্থবরাদ্দ কি হবে তা নিয়ে যথারীতি কোন উচ্চবাচ্য নেই।

এই শিক্ষানীতিতে ইউজিসি’র পরিবর্তে উচ্চশিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র সংস্থা হিসাবে ‘ন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন রেগুলেটরি অথরিটি’ লাগু করার কথা বলা হয়েছে — এতে নীতিগত কেন্দ্রীকরণের আশঙ্কা থাকছে। ইউজিসি-কে তুলে দিয়ে যাবতীয় গ্রান্ট বা ফেলোসিপ দেওয়ার জন্য ‘হায়ার এডুকেশন গ্রান্টস কমিশন’ লাগু করার কথা বলা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলির এক্রিডিটেশন বা যোগ্যতামানের স্বীকৃতি দেওয়া হবে গ্রেডেড অটোনমি বা স্তরভিত্তিক স্বশাসনের সাথে তাল মিলিয়েই। এ আসলে বেসরকারীকরণ তীব্র করার ও আর্থনীতিকভাবে দুর্বল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরো দুর্বল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বলেই আমাদের আশঙ্কা। অনুমোদন বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ‘ওপেন অ্যান্ড ডিসটেন্স লার্নিং’ এ পরিকাঠামো গড়ে তোলায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অনলাইন কোর্সবেশি সংখ্যায় চালু করে অনলাইন পড়াশুনাতেই ছাত্রদের বেশি উৎসাহিত করার ইঙ্গিত রয়েছে এই খসড়ায়। এরফলে একাধারে লাভ হবে শিক্ষাব্যবসায়ীদের, অন্যদিকে গুণমান কমবে ক্যাম্পাসে পড়াশুনার। অনলাইন কোর্সে র সাথে ছাত্রসমাজকে ‘সড়গড়’ করার পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে রেট চার্ট হাতে এগিয়ে আসবে অজস্র প্রাইভেট টিউশন সেন্টার, নতুন করে ফুলে ফেঁপে উঠবে শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা। একই সাথে, অনলাইন কোর্স ও দূরশিক্ষণে জোর দেওয়ার মাধ্যমে এই শিক্ষানীতি আসলে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছে যে উদারীকরণের জমানায় ছাত্রাবস্থা থেকেই সম্পূর্ণশিক্ষা লাভের পরিবর্তেপেট চালানোর জন্য রোজগার করার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হতে হচ্ছে বড় অংশের তরুণ প্রজন্মকে। দূর শিক্ষণ এবং অনলাইন শিক্ষা এই প্রবণতাকে আরো বাড়াবে বই কমাবে না। গবেষণা খাতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন গঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের উপর গবেষণা হবে এবং সেই গবেষণাগুলির গুণমানের স্বীকৃতি নির্ধারিত হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। অর্থবরাদ্দ করবে এনআরএফ তবেই সবাইকে নয়। বলা হচ্ছে ‘কম্পিটিটিভ ফান্ডিং’এর কথা। লক্ষ্যণীয়ভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি ও সাহায্য পাবে সরকারের থেকে। শিল্পমহল থেকে অনদুান জোগাড় করার কথা বলা হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমাদের আশঙ্কা এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে আদতে কেন্দ্রের শাসক তার মতাদর্শগত রাজনৈতিক বোঝাপড়ার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে এবং তার মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানায় এমন মৌলিক গবেষণাগুলিকে দমন করার চেষ্টা করবে। উল্লেখ্য এমফিল তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এই শিক্ষা নীতিতে।

এবার আসা যাক বহু বিতর্কিত ভাষা মাধ্যম প্রসঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রস্তাবিত ‘থ্রি ল্যাঙ্গুয়েজ ফর্মুলা’র আমরা তীব্র বিরোধিতা করেছি। ভারতীয় ভাষার উপর জোর দেওয়ার নাম করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এ আদতে ভারতবর্ষের ভাষা ও সংস্কৃতিগত বহুত্ববাদী কাঠামোর উপর আক্রমণেরই নামান্তর। দেশজোড়া প্রবল প্রতিবাদের মুখে এই প্রশ্নে সরকার আপাতত পিছু হটেছে। যদি ও জে এনইউ-র সাম্প্রতিক অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ফের স্নাতক স্তরের কোর্সের ক্ষেত্রে হিন্দিকে বাধ্যতামলূক করার প্রস্তাব উঠেছে। শোনা যাচ্ছে ইউজিসি এবং মানব সম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক থেকেই নাকি পুনরায় এই নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। পাঠক এরসাথে যুক্ত করুন সংস্কৃত ভাষার উপর অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়াকে। গোটা শিক্ষানীতি জুড়ে ‘প্রাচীন যুগের শিক্ষাব্যবস্থা’র গৌরবগাথা তুলে ধরার মাধ্যমে ইতিহাসের পরবর্তী যুগগুলির অবদান অস্বীকার করার একটা পরোক্ষ প্রয়াস রয়েছে। এই শিক্ষানীতি নিশ্চিতভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উৎসাহিত করবে। আরএসএস-র ধাঁচে “একাল বিদ্যালয়” এর মতো সমান্তরাল স্কুল ব্যবস্থা স্বীকৃতি আছে এই শিক্ষানীতিতে। রয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে “রাষ্ট্রীয় শিক্ষা আয়োগ” নামক সংস্থা তৈরি করে কেন্দ্রীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রচেষ্টাও। সবার জন্য বৈজ্ঞানিক ও সংবেদনশীল এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ভারতবর্ষের মত বিশাল দেশে সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষাখাতে বাজেট ও জিডিপি’র অর্থবরাদ্দ বৃদ্ধি করা সে প্রশ্নে এই শিক্ষানীতির প্রবক্তারা নিশ্চুপই থেকেছেন।

প্রফেশনাল, টেকনিক্যাল ও মেডিকেল শিক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে এই খসড়ায় যা উল্লেখ আছে সে ব্যাপারে বিশদ আলোচনা এই লেখায় নেই। একেবারেই প্রাথমিক দৃষ্টিতে কিছু আপত্তিজনক প্রস্তাব নজরে আসছে, যেমন এমবিবিএস কোর্সের শেষে আরো একটি সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রস্তাব, বা এমবিবিএস বা নার্সিং কোর্সে, ‘ল্যাটারাল এটির প্রস্তাব। এটুকু বলাই যায়, সামগ্রিকভাবে এই শিক্ষানীতি শিক্ষা ও ছাত্র স্বার্থবিরোধী। একদিকে থাকছে নীতিগত কেন্দ্রীকরণের আশঙ্কা যা ভারতবর্ষের মতো বহুত্বপূর্ণ দেশে অবৈজ্ঞানিক ও ক্ষতিকারক। কোথাও কোথাও ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা থাকলে ও সরকারি বায় বরাদ্দ বাড়ানোর ইঙ্গিত নেই, অতএব বেসরকারি হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বৃহৎ অংশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ও সামগ্রিকভাবে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত অংশের জন্য শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে। সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে এ আসলে শাসকের মনাফার প্রয়োজনে, নির্দিষ্ট চাকরিরযোগ্য বৃহদাকার শ্রমিকবাহিনী তৈরির উদ্দশ্যে প্রস্তুত করা শিক্ষানীতি। শিক্ষা ও জ্ঞানের বৃহত্তর উদ্দেশ্যও আঙ্গিক এই শিক্ষানীতিতে অনপুস্থিত। আমরা এই শিক্ষানীতির সাথে একমত হতে পারছি না। দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে সর্বাংশের অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্র, শিক্ষাকর্মী ও অভিভাবকদের শামিল করে বৃহত্তর পরিসরে গভীর আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করুক কে ন্দ্রীয় সরকার। নতুবা এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পরবে দেশের সর্বত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *