বামপন্থাই বিকল্পের ভাষ্য
-সুজন চক্রবর্তী
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের সবার কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লড়াই এর ফলে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করলাম তাতে অনেক অপূর্ণতা থাকলেও স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তা আমাদের কাছে গর্বের। স্বাধীনতা সংগ্ৰাম থেকে সঞ্জাত সংবিধান আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংবিধানের প্রস্তাবনা অথবা সম্পূর্ণ সংবিধান পড়লে বুঝতে অসুবিধে হবে না যে আমাদের মতাদর্শের সঙ্গে সংবিধানের সম্পূর্ণ মিল না হলেও তাতে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার কথাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
‘India, that is Bharat, shall be a union of state.’ – এই বাক্যটির ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনাতে Justice, Liberty, Equality, Fraternity কথাগুলোকেও ভেঙে ভেঙে পরিস্কার করে বলা আছে। অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের দেশের সব নাগরিকের জন্য বৈষম্য ছাড়াই সমস্ত অধিকার ও সুযোগের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সেই প্রস্তাবনায় ভারতবর্ষকে সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আপাতত ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এই মনোভাব নিয়ে চলা এবং তাকে রক্ষা করাটাই সবচেয়ে জরুরী।
যখন খসড়া গৃহীত হচ্ছে, তখন সংবিধানের মূল রচয়িতা ডঃ বি আর আম্বেদকর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উত্থাপন করেছিলেন। যেটা খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বহু লড়াই করে যে সংবিধান তৈরি করা হল, তাতে রাজনৈতিক সাম্যকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট – ওয়ান ভোট ওয়ান ভ্যালু।’ আম্বেদকর স্পষ্টতই বললেন, এই রাজনৈতিক সাম্যকে রক্ষা করার জন্য জরুরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য গড়ে তোলা। অর্থাৎ তিনি প্রথম থেকেই আমাদের রাজনৈতিক সাম্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা এখন কী দেখতে পাচ্ছি? দিন যত যাচ্ছে সাম্য দূরে থাক আমাদের আর্থিক বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। অক্সফার্ম সর্বশেষ রিপোর্টে দেখিয়েছে আমাদের দেশে ক্রমশই ধনী ও গরীবের ফারাকটা বেড়ে যাচ্ছে। ১% নাগরিকের কাছে দেশের ৪৩% সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একইভাবে সামাজিক ক্ষেত্রেও সমানতলে বাড়ছে বৈষম্য এবং তা কেন্দ্রীয় সরকারের মদতেই। জাত-ধর্ম-বর্ণের পরিকল্পিত বিভাজন আমাদের ভবিষ্যতকে সর্বনাশের পথেই নিয়ে যাবে। আম্বেদকর যা বলেছিলেন সেই আলোকে তা বোঝা কঠিন নয়। আসলে আমাদের দেশের সংবিধানের মূল মর্মবস্তুটাই আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। ভারতবর্ষের সংবিধানের ঐক্যের, গণতন্ত্রের, ধর্মনিরপেক্ষতার মূল সুরটাই বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। দেশের ওপর এই আক্রমণ। এই আক্রমণ আমাদের রুখতেই হবে।
এটা সত্য, স্বাধীনতার পর থেকে গড়ে ওঠা যে ভারতবর্ষ আজ আমরা দেখছি তার আড়ালে আছে এমন অনেকগুলি সিদ্ধান্ত যা গ্ৰহণ করার বিষয়ে বামপন্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। যেমন, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন লাগু হওয়ার পিছনে তেভাগা-তেলেঙ্গানার কৃষক আন্দোলনের ভূমিকা অস্বীকার করার সূ্যোগ আছে কী? অথবা ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর জন্য লড়াই – সবেতেই প্রথম থেকে বামপন্থীরা যথাযথ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আবার একইসাথে আমাদের মনে রাখতে হবে সংবিধানের ৩৫৬ ধারার প্রয়োগের প্রথম বলি কিন্তু ভারতবর্ষের প্রথম কমিউনিস্ট সরকার, যেটি ১৯৫৭ সালে কেরালায় গঠিত হয়েছিল। দেশের বর্তমান শাসক গোষ্টী কোনভাবেই বামপন্থীদের বিকল্প ভাষ্যটাকে মানতে পারেনা। মানতে চায় না। অথচ বিকল্প ভাষ্যের যে কোনো বিকল্প নেই সেটা দিন দিন ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে দেশের গণতন্ত্রের ওপর চরম আঘাত নেমে আসল। জারি হল জরুরি অবস্থা। তখন কঠিন আক্রমণের শিকার হয়েছিল দেশের মানুষ। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির আগেই ১৯৭২ সালে পশ্চিমবাংলায় আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, যার শিকার বাংলার মানুষ, বিশেষত কমিউনিস্টরা। আমরা তখনও লড়াই ছাড়িনি। কারণ গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে মানুষের জন্য, কোনও দলের জন্য না। মানুষের জন্যই তখন তা ছিল জরুরি। ঠিক তেমনই আজকের দিনে যখন আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিগুলো ভয়াবহভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না।ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে মানুষের মধ্যে সাম্যের মনোভাব গড়ে উঠতে পারে না। এই বাস্তবটা বুঝেই দিল্লির শাসকগোষ্ঠী ভাঙতে চাইছে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, চেতনার মূল সূত্রগুলিকেই। জরুরী অবস্থায় গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য যেভাবে বামপন্থীরা রুখে দাঁড়িয়েছে তেমনই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষার জন্য লড়াই এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইতেও বিকল্প মনোভাব নিয়ে বামপন্থীরাই থাকবে এই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এইসব প্রশ্নে বামপন্থীরা কখনও আপোষ করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।
যদি আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে দেখি, তাহলে পশ্চিমবাংলার অনেকগুলি অভিজ্ঞতা গোটা দেশেই আমাদের পথ চলতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে, ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিকল্প চিন্তাগুলো আরও স্পষ্টভাবে তারা সামনে নিয়ে এলো। এটা ঠিক, বামফ্রন্ট সরকারের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল না। সেটা বাস্তবসম্মতও নয়। একই ভাবে মানুষের সব সমস্যার সমাধান করাও সম্ভব ছিল না। সে কথা বারবার বামপন্থীরা তাদের প্রতিটা নির্বাচনী ইস্তাহারে এবং বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছে। কিন্তু ১৯৭৭ এ বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেমন, রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি। সরকার এটা জানত, এই রাজনৈতিক বন্দীদের মধ্যে একটা বড় অংশই, হয়ত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল বামপন্থীদের বিরোধী। কংগ্রেস এবং নকশালপন্থীরা। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার পক্ষেই ছিল এই সরকার। কারণ এটা একটা গণতান্ত্রিক বোধ। কে আমার পক্ষে, আর কে আমার পক্ষে নয় সেটা বড় কথা নয়, তার চেয়ে বড় কথা হল রাজনৈতিক আন্দোলন করতে গিয়ে কেউ দিনের পর দিন বন্দি হয়ে থাকবেন, এটা হতে পারেনা। সেই মনোভাব নিয়েই রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভা। পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট ৩৪ বছর সরকার চালিয়েছে। কিন্তু কখনও সরকার এই মনোভাব নেয়নি, যে শাসক দলের কথাতেই পঞ্চায়েত, পৌরসভাকে চলতে হবে। তাদের স্বয়াত্বশাসন রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেছে বামপন্থীদের সরকার। এমন বারবার হয়েছে, বিরোধী দল হিসেবে তারা ভোটে দাঁড়িয়েছেন, জিতেছেন এবং পঞ্চায়েত বা পৌরসভা চালিয়েছেন। অনেক সময়, বামপন্থীরা আর বিরোধীরা হয়ত পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপালিটিতে সমান সংখ্যক আসন পেয়েছে। তখন অন্য দলের জন প্রতিনিধিকে কিনে নেওয়ার চেষ্টা বা জোর করে দলবদল করানোর চেষ্টা বামফ্রন্ট কখনোই করে নি। বরং দেখা গেছে, বহুক্ষেত্রে টসে জিতে পঞ্চায়েত অথবা মিউনিসিপালিটি পাঁচ বছর ধরে কোনও উপদ্রব ছাড়াই বিরোধীরা চালিয়েছে। আসলে গণতন্ত্রে বিরোধী স্বর ও মননকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বামফ্রন্টের ছিল এবং তারা মানুষের সামনে সেই আদর্শ তুলে ধরতে পেরেছিল। একই রকম ভাবে, তখন দেশের রাজ্যগুলিতে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই রাজ্যে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটিতে বিরোধীদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই কমিটির কাজ হল সরকারের আর্থিক ত্রুটি খুঁজে বের করা। সে দায়িত্বভার দেওয়া হল বিরোধীদের হাতে। পরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম বামফ্রন্ট সরকার পৌরসভা বা পঞ্চায়েত পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরোধীদেরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিরোধী দলের নেতাদের অর্থ সহ বিভিন্ন কমিটিতে রাখার চল শুরু করে। এমনকি জেলা পরিষদেও বিরোধী দলের নেতাকে অধ্যক্ষ পদে বসানোর মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বামফ্রন্ট। যে অধ্যক্ষের কাজ পঞ্চায়েত পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি সহ বিভিন্ন অভিযোগ আসলে তার তদন্ত করা। গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে যে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ তা বামফ্রন্ট সরকার কার্যকরী করেছে। যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবা কার্যত অসম্ভব।

গণতন্ত্রের প্রসারের সাথে সাথে বামফ্রন্ট যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা হল মানুষের ক্ষমতায়ন। বর্তমানে যারা আমাদের দেশ চালাচ্ছে বা আমাদের রাজ্য চালাচ্ছে তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে। সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। বেআইনি ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় তৈরি করে। কিন্তু বামপন্থীরা মনে করেন রাজনীতিটা ক্ষমতার জন্য নয়, রাজনীতি দায়িত্ব পালনের জন্য। ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব – এই মনোভাব নিয়েই বামফ্রন্ট সরকার চলেছে। তাই বামপন্থীদের পঞ্চায়েত পরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল – মানুষের ক্ষমতায়ন। কার ক্ষমতায়ন দরকার? যাদের আপাত দৃষ্টিতে ক্ষমতা কম তাদের ক্ষমতায়ন দরকার। মহিলা, সংখ্যালঘু, গরীব, সামাজিকভাবে অনগ্রসর তাদের। পিছিয়ে থাকা মানুষের ক্ষমতায়নের মধ্যে দিয়ে মানুষের ক্ষমতাবৃদ্ধিটাই ছিল বামফ্রন্টের লক্ষ্য। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠনের পর ১৯৭৮ সালে এই রাজ্যে প্রথম ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। তখন মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। বামফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিল, পঞ্চায়েতে দুজন করে মনোনীত মহিলা সদস্য থাকবে। তারপর ধাপে ধাপে বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েতের তিনটি স্তরেই মোট আসনের ৩৩ শতাংশ এবং তারপর মোট আসনের ৫০ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করে। শুধু তাই নয়, মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য, তাদের অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষেই কাজ করেছে বামফ্রন্ট সরকার। তাদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে। যৌথ পাট্টা বামফ্রন্ট আমলেই। স্বনির্ভর গোষ্টীও তাই। তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। একইরকম ভাবে সংখ্যালঘু, তপশিলী সহ সমাজের পিছিয়ে থাকা সমস্ত অংশের মানুষের ক্ষমতায়নকে বামফ্রন্ট সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের শিক্ষা – সংস্কৃতি – শিল্প সবকিছুতেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ মনযোগ দেওয়া হয়েছে।
এরই সঙ্গে বাংলার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কাজেও বামফ্রন্ট সরকার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেয়। কারণ স্বাধীনতার আগে বাংলা প্রায় সব ক্ষেত্রেই শীর্ষে ছিল। সেই রাজ্যই, বামফ্রন্ট সরকার আসার আগেই, ৬০’র দশকে প্রতিটি ক্ষেত্রে নামতে নামতে অনেকটা নীচে নেমে গিয়েছিল। ১৯৫১ সালে মাথাপিছু আয়ে বাংলা ছিল প্রথম। ১৯৬৭-৬৮ তে পশ্চিমবঙ্গ নামলো অষ্টমে, তখনও বামফ্রন্ট আসেনি। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে ১৯৫১ সালে বাংলা ছিল দ্বিতীয় স্থানে। সেখানে ১৯৬১ সালে নেমে গেল পঞ্চম এবং পরে নামতে নামতে নেমে এলো ৮ নম্বরে। তখনও বামফ্রন্ট সরকার আসেনি। যখন ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট প্রতিষ্ঠিত হল তখন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লক্ষ। যখন বামফ্রন্ট চলে যাচ্ছে তখন এ রাজ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ১০ লক্ষ। শহর কেন্দ্রীক শিক্ষার বদলে গোটা রাজ্যজুড়ে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছিল বামফ্রন্ট। তাই আর এখন শুধু শহর থেকে নয় মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতি ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন জেলা থেকে উঠে আসছে। এই প্রবণতা বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। পরিবেশের ক্ষেত্রেও তাই। অরণ্যধ্বংস নয়, বৃক্ষসৃজনই ছিল সেই সময়ের নীতি।
শুধু শিক্ষাই নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাই। কলকাতায় নন্দন থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় রবীন্দ্রভবন, বামফ্রন্ট আমলে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, রাজ্যের জেলায় জেলায় স্টেডিয়াম সেই আমলে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেট্রোপলিটন বাইপাস, দ্বিতীয় হুগলী সেতু, নিবেদিতা সেতু, ঈশ্বর গুপ্ত সেতু, গৌরাঙ্গ সেতু সহ অসংখ্য সেতু – যেদিকে তাকাবেন সবই বাম আমলের ফসল। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস, সল্টলেক ইলেকট্রনিক্স, আইটি হাব, লেদার কমপ্লেক্স ইত্যাদি তৈরি হল। কলকাতা থেকে হলদিয়া অবধি সার্কিট প্রকল্প ছিল বামফ্রন্টের। তৃণমূলের উন্মত্ত বাহিনী তা রূপায়ন করতে দিলনা।
পরিকল্পনা চলছিল কীভাবে আরও এগোনো যায়। পালাবদলের পর তা বাস্তবায়িত তো হলই না। বরং এই সময়ে রাজ্যের সব কিছু ধ্বংস করেছে তৃণমূল। ১২ বছরে অন্ধকারে নিমজ্জিত হল বাংলার ভবিষ্যৎ। অর্থনীতি, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ধাপে ধাপে সব ধ্বংস হয়েছে এই সময়ে। প্রতি বছর পরীক্ষা দেওয়া ও চাকরি পাওয়া নিয়মে পরিণত হয়েছিল বামফ্রন্ট আমলে। তখন কাউকে চাকরির জন্য রাস্তায় বসতে হয়নি। ধ্বংস করেছে তৃণমূল। দুর্নীতিতে ডুবে গিয়ে ডুবিয়েছে এ রাজ্যের কমবয়সী ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ। গ্রাম বাংলার সর্বনাশ করেছে। শুধু লুঠ, চুরি, দুর্নীতি আর বেআইনী সম্পদের রমরমা। নীতি-মূল্যবোধ-সংস্কৃতি সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে তৃণমূল। এ জিনিস চলতে পারেনা। আবার বাংলাকে গড়তে হবে। মানুষ গড়তে হবে। লড়াইটা সেইজন্যই। পঞ্চায়েতে শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই পথে এগোতে হবে। মানুষকে নিয়ে জোটবদ্ধভাবে লড়াই করে তৃণমূলের এই ভৈরববাহিনীকে পরাস্ত করেই ফের বাংলার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কাজে এগোতে হবে।

