Gen -Z: মনের সন্ধানে

Gen -Z: মনের সন্ধানে

  সৌভিক দাস বক্সি

মানুষই প্রেম করে, সেই মানুষই খুন করে! ‘ যে মন কখনো আঁকড়ে ধরতে চায় সব কিছু, যে মন গান রচনা করে ‘ভালোবাসি সবকিছু একসাথে’ সেই মনই আবার কখনো সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মানুষের এই মন আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করে সভ্যতার আলো জ্বালিয়েছে যেমন তেমনই আবার কখনো নিজেকে ঝলসে দিয়ে আত্মহত্যার পথ খুঁজেছে এই মনই। সুতরাং একই সাথে সরল এবং জটিল চিন্তার সর্ববৃহৎ গবেষণাগার হলো মানুষের মন।


আবার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করে। বয়স, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম বিভিন্ন ক্ষেত্র এই মননকে ঘুরিয়ে দিয়েছে নানা পথে। এই মুহূর্তে যে প্রজন্মকে নিয়ে সব থেকে বেশি চর্চা অর্থাৎ Gen-Z, তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক পরিকাঠামোর মধ্যে। বর্তমানে এই মন দখলের প্রতিযোগিতায় সামিল আমরা প্রায় প্রত্যেকেই।

খাতায় কলমে নির্দিষ্ট করে লেখা না থাকলেও গত শতাব্দী থেকে আজকের দিন পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের জন্ম গ্রহণের সময় অনুসারে কয়েকটি ভাগে তাদের বিভক্ত করা হয়েছে। মোটামুটি ১৯০১ – ১৯২৭ এর মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন যারা, সেই অংশটি গ্রেটেস্ট জেনারেশন নামে পরিচিত। একইভাবে ১৯২৮-১৯৪৫ পর্যন্ত সাইলেন্ট জেনারেশন। ১৯৪৬-১৯৬০ পর্যন্ত বেবি বুমার্স। ১৯৬৫-১৯৭৯ পর্যন্ত জেন-এক্স। ১৯৮০ – ১৯৯৫ পর্যন্ত জেন-ওয়াই এবং ১৯৯৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত জেন-জি।

এই প্রতিটি জেনারেশনের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে। এই মুহূর্তে আমাদের অধিকাংশই এই জেন-জি প্রজন্মের অংশ। একইসাথে এই সময় যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত যাদের কাছে পৌঁছতে হবে আমাদের তারাও আছে এই প্রজন্মেই। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তার অভাব, নয়া উদারনীতির আগ্রাসনে এই প্রজন্মের মন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে ক্রমাগত। ফলত যা আমি নই, তা হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়ছে। স্বাভাবিক ছন্দ থেকে হারিয়ে গিয়ে অনুকরণের নেশায় নিমগ্ন হয়ে পড়ছে এই জেনারেশন। আসলে এই সমাজ বর্তমান প্রজন্মকে ‘মে’, ‘মেরা’, ‘মুঝে’ এই ছোট্ট গন্ডিতে আবদ্ধ করতে চাইছে। ‘আমরা’ হয়ে ওঠার চেষ্টা অথবা ‘সংকোচন’ এর বদলে ‘সামগ্রিকতায়’ ভরসা রাখতে পারছে না আজকের তরুণ মন। মার্কিন মুলুক থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রজন্ম ভাগের এই হিসেবে জেন-জি যদিও ডিজিটাল নেটিভ। তারা অন্যকে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারে। তারা ইন্টারনেট জেনারেশন, টেকনোলজিক্যালি সাউন্ড কিন্তু অপরের সাথে মানসিক যোগাযোগের বন্ধন গুলো দুর্বল। দূর্বল কারণ বিশ্বায়নের সাথে সাথে এক ভাবনা, এক সংস্কৃতির চল বাড়ছে। পোশাকে, শব্দে, ব্যবহারে সবাই একই পদ্ধতির অনুকরণের ফলে বৈচিত্র্য কমছে। থাকছে না তর্ক – বিতর্কের সুযোগ, ফলত ‘অল্টারনেট নেই’ এই ধারণা বাড়ছে Gen-Z এর মধ্যে। এই প্রজন্মে তথ্যের অবাধ ব্যবহার আছে, সময়ের নিয়ম মাফিক ব্যবহার আছে ‘তবুও কিছুই যেনো ভালো যে লাগেনা কেনো’ – তার উত্তর মিলছে না। সবসময়ই কিছু না কিছু খুঁজছে এই প্রজন্ম। আসলে তারা নিরাপত্তা খুঁজছে। পরিবারের, সম্পর্কের, রোজগারের, জীবনের নিরাপত্তা। আমাদের কাজ সমাজের এই তরুণতম অংশের ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠা। তাদের ভরসা স্থল হয়ে ওঠা।


আসলে যে রাষ্ট্রের কাজ ছিল এই প্রজন্মকে নিরাপত্তা দেওয়া, সেই কাজে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আতঙ্কে এবং অনিশ্চয়তায় ভুগছে জেন-জি। সেই কারণে তাদের ফোন সর্বদা সাইলেন্ট। ফোন ধরতে ইচ্ছে না হওয়া, মনের ভিতরে ভয় এই বুঝি অপর প্রান্ত থেকে কোন দুঃসংবাদ আসছে। তাই কথোপকথনের জন্য মেসেজ শ্রেয়। মুখের কথার তুলনায় ভরসাযোগ্য একমাত্র স্ক্রিন শট। নয়া উদারনীতির সমাজ আসলে এই অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দিচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়ার অসংখ্য ফলোয়ার থাকলেও, বন্ধু নেই। পার্কে যাওয়ার সঙ্গী থাকলেও, ভরসা দেওয়ার মুখ নেই। ‘জীবন’ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পরিণত হচ্ছে ‘মুহূর্তে’। এটাই Gen-Z এর ট্রেন্ড।

চোখের সামনে এই অবাধ আনাগোনার হাতছানি অথচ স্বপ্ন পূরণের উপায় নেই। সাধ এবং সাধ্যের দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে এই জেনারেশন ক্রমশ শিকার হচ্ছে ডিপ্রেশনের। মানসিক শান্তি পেতে অসহায়ের মতো জড়িয়ে যেতে হচ্ছে নিষিদ্ধ নেশায়। ৪২ শতাংশ তরুণ তরুণী মেন্টাল হেলথ জনিত সমস্যায় জর্জরিত। নিজেকে প্রচার করতে না পেরে, বিজ্ঞাপিত না করতে পারলে, রিলের ফলোয়ার্স না বাড়লে এই প্রজন্ম FOMO ( Fear of Missing Out) হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ভোগে। বাড়ছে কম বয়সে আত্মহত্যা করার প্রবণতা। অসংখ্য অপশনের প্রাচুর্যতা আসলে কনফিউজ করে তুলছে আজকের প্রজন্মের ‘মন’ গুলোকে। ফলত বাড়ছে জেন-জি মনের অস্থিরতা। তৈরি হচ্ছে হাইপার রিয়েলিটি। আজকের জেনারেশন ঘুমানোর সময় ছাড়া বাকি সময়ের অর্ধেকটা ব্যয় করে ইন্টারনেটে। যা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের ব্যক্তিগত চাহিদা, পছন্দ, ইচ্ছা, ভাবনা। রিলস্ এর ভিডিওতে দেখে তাজমহলের সামনে হীরের আংটি দিয়ে প্রপোজাল বা আইফেল টাওয়ারের সামনে পছন্দের মানুষকে চুম্বনের ‘ইচ্ছে’ যখন আর পূরণ হয় না তখন তৈরি হয় হাইপার রিয়েলিটি। ওই যে সাধ এবং সাধ্যের দ্বন্দ্বে ভোগা জেন-জি। আরও উন্নত iphone, আরও দামি বাইক, আরও বেশি ফলোয়ার্স – চাহিদার বাজারীকরণ দখল করছে এই প্রজন্মের মন।

‘শুধু শুধু হেঁটে চলা, একই একই কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে! জেন-জি আসলে ইন্টারনেট বেস প্রজন্ম। পরপর চলতে থাকা রিলসের অ্যালগরিদমের চক্করে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাচ্ছে আমাদের। More we consume, hungrier we get, ফলত কন্সট্যান্ট স্টিম্যুলেসন যে চাহিদা তৈরী করে দিচ্ছে তার পিছনে ছুটতে ছুটতে কানাগলিতে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এই জেন-জি প্রজন্ম, যাদের মন নানাভাবে বিভক্ত, দ্বিধাগ্রস্থ, অনিশ্চিত, আতঙ্কিত তাদের বাঁচার রসদ যোগানোর কাজ আমাদেরই। বিকল্পের সন্ধানে আলোকবর্তিকা হতে হবে আমাদের। সমাজের তরুনতম অংশের ‘মন’ সুরক্ষিত করতে আমাদের হয়ে উঠতে হবে সংকটদুঃখ ত্রাতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *