ট্রাম্পদের রোষে বিপ্লবী দ্বীপ

ট্রাম্পদের রোষে বিপ্লবী দ্বীপ

ময়ূখ বিশ্বাস

সম্প্রতি আমেরিকার ৪৭তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই গণতান্ত্রিক ভাবনাকে দূরে সরিয়ে ‘জোর যার মু্লুক তার’ ভাবনাকে সামনে রেখে ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির অঙ্গ হিসাবে গ্রীনল্যান্ড, পানামা, কানাডাকে মার্কিন মানচিত্রে জোড়ার কথা বলেছেন। WHO-কে এক পয়সাও না দেওয়া, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে  পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া থেকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হাতকড়া পরিয়ে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সবটাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ইউক্রেন ইস্যুতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অন্যদিকে ইজরায়েলের খুনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে পাশে বসিয়ে গাজা দখলের ঘোষণা- এই দুই পরস্পর বিরোধী অবস্থানের পিছনে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের অন্য ছক। চীনের উত্থান, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির বিকল্প নীতি, ডলারকে বাদ রেখে ব্যবসা ইত্যাদি ঘটনা মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীদের সামনে দুটি পথ খোলা রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে পরমাণু সংঘাতের বিন্দু পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যাওয়া অথবা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের ধীর লয়ে ক্ষয়প্রাপ্তিকে মেনে নেওয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার বাইডেনের নীতির ব্যর্থতা ট্রাম্পকে বাধ্য করছে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করে রাশিয়াকে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে চীনকে একা করার চেষ্টা করতে। কারণ বিশ্বজোড়া উগ্র দক্ষিণপন্থীরা এখনও জানে বিশ্বের মূল দ্বন্দ্ব ‘ধনতন্ত্র বনাম সাম্যবাদ’ এখনও বিদ্যমান। তাই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই আবার কিউবাকে ‘সন্ত্রাসবাদকে সাহায্যকারী দেশ’ -এর তালিকায় ফেলেছে কারণ মোদীর বন্ধু ট্রাম্পের আদর্শগত শত্রু সমাজতন্ত্রের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন এই দেশটি।
          প্যালেস্টাইনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ২০০ জন ফিলিস্তিন পড়ুয়াকে স্কলারশিপ দিয়ে ডাক্তারি পড়ানো, করোনাকালে ইতালির লম্বার্ডি, চীনে মেডিক্যাল টিম পাঠানো – ফিদেলের মতোই মিগুয়েল দিয়াজও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে। এই জন্যেই ইলন মাস্কদের চোখে ‘সন্ত্রাসবাদী’ এই বিদ্রোহী দ্বীপটি।করোনার সময় কিউবাকে সাহায্য করতে চীনা শিল্পপতি জ্যাক মা ২ মিলিয়ন মাস্ক সহ র্যাপিড টেস্ট কিট এবং ভেন্টিলেটর পাঠাচ্ছিলেন বিমানে করে যা মার্কিন প্রতিরোধের কারণে কিউবা পৌঁছাতে পারেনি। শুধুমাত্র করোনার সময় মার্কিন অবরোধের কারণে ২ লক্ষ মার্কিন ডলার সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় কিউবা।
         যে বছর বব ডিলানের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় সেই বছরই কিউবার উপরে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো মার্কিন সরকার। কারণ ফিদেল-রাউল-চে দের অপরাধ ছিলো বিপ্লবোত্তর কিউবায় বিদেশী সম্পদের জাতীয়করণ করা। প্রায় ৬০ বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক অবরোধে কিউবার ক্ষতি হয়েছে প্রতি বছর প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার উন্নতি আরও বাধাপ্রাপ্ত হয়। সেইসময় সারা দেশ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে ‘ক্যারিবিয়ান কুইন’ জাহাজে করে আমাদের হলদিয়া বন্দর থেকে সাহায্য পাঠিয়েছিলো সিপিআই(এম)।
           ২০২০-২০২৪ সাল অর্থাৎ কোভিড এবং তার পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাব আরও জোরালো হয়ে ওঠে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় বছরে গড়ে ২৫-৩০%, যা ২০২২ সালে ৪০%-এ পৌঁছায়। অভাব দেখা যায় জ্বালানি, ওষুধ, খাবারের। ২০১৯ সালে কিউবার নিজস্ব ক্ষমতার থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি হয় ৩০%। ২০২৪ সালে গোটা কিউবা মোট ৩ বার অন্ধকারে ডুবে যায়।পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ঘাটতি প্রভাব ফেলে দেশের কৃষি ও শিল্পোৎপাদোনেও। অর্থনীতিবিদদের অনুমান অমানবিক মার্কিন অবরোধ না থাকলে কিউবান অর্থনীতি বৃদ্ধির হার ২০২১ সালে ৪%, ২০২২ সালে ৯% এবং ২০২৩ সালে ৮% অবধি হতে পারতো।
        সোভিয়েত পতনের পর কিউবা বাধ্য হয় অর্থনীতিতে অনেক বদল আনতে, যার অন্যতম ছিলো পর্যটনের প্রতি অত্যাধিক নির্ভরশীলতা। প্যান্ডেমিকের আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যথাক্রমে ৪৮.৫ এবং ৪২ লক্ষ পর্যটক এসেছিলো কিউবায়। সেখানে মাত্র ১৬ লক্ষ ২০২২ সালে ও ২৪ লক্ষ এসেছিলো ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালে লক্ষ্য ছিলো ৩০ লাখ, হয়েছে ২৮ লক্ষ। এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে অর্থনীতিতে, আজ অনেক দেশ কিউবার পাশে এসে দাঁড়াতে চাইলেও করোনা পরিস্থিতির জটিলতা ও মার্কিন অবরোধের ফলে তা সম্ভব হচ্ছে না।
       এই জটিলতার সুযোগে ট্রাম্পের আমেরিকা মিয়ামি থেকে উস্কানি দিয়ে উত্তপ্ত করতে চাইছে কিউবাকে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে কৃত্রিমভাবে সামাজিক সংকট তৈরি করে কিউবান বিপ্লবকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাইছিলো তারা। কিউবায় অবস্থানরত মার্কিন-মদতপুষ্ট প্রতিবিপ্লবীরা যত না প্রতিবাদ করেছে, মিয়ামি থেকে মার্কিনীরা তার থেকে বেশি পোস্ট করেছিলো বিজেপির আইটি সেলের কায়দায়।
       সাম্রাজ্যবাদীরা ভেবেছিলো কাস্ত্রোদের পরবর্তী নেতারা পারবেনা। কিন্তু কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি, লড়াকু মানুষ ও প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ কানেলের নেতৃত্বে প্রশাসন তৈরি ছিলো। প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল সেসময় বলেন, ‘দেশ অস্থিতিশীল হলে বৈপ্লবিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে বিক্ষোভকারীদের। পাশাপাশি আমরা সকল বিপ্লবী এবং কমিউনিস্টদের রাস্তা দখলে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি’। এইসময়ে যেখানে অশান্তি হয়েছে সেই মহল্লায় প্রেসিডেন্ট নিজে মিছিল করেছেন, মানুষের সাথে কথা বলে করোনা কালে সরকারের সীমাবদ্ধতা বুঝিয়েছেন, রুখে দিয়েছেন মার্কিনী চক্রান্ত।
     এই সংকট থেকে বাঁচতে বিকল্পের সন্ধান করছে বিপ্লবীদের দঙ্গল। কিউবায় সরকারী ক্ষেত্রের পরিধি সীমিত, এমতোবস্থায় কিউবা বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। ২০০৮ সাল থেকে ব্যক্তি মালিকানায় ছাড় এবং গ্রামীণ কৃষিক্ষেত্রে সমবায় ব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো।  ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সময় স্বনির্ভরতা বাড়াতে আরো ব্যক্তিগত মালিকানার প্রসার হয়। ২০১৩ সালে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ সম্মেলনে পার্টি অনুমোদন দেয় নতুন সামাজিক এবং আর্থিক নীতি গ্রহণের। এইসময়ই বিপ্লবের পর প্রথমবার বিদেশী বিনিয়োগ, মিশ্র অর্থনীতির কথা বলা হয়। মূলত এই বিনিয়োগকারী প্রবাসী কিউবান, বা কিউবার বন্ধু রাষ্ট্রগুলো। ২০১৬ সালে মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানাল কিউবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সংবিধান সংশোধনীর কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে।
    এরপরেই নেমে আসে কোভিড সঙ্গে আরও চেপে বসে মার্কিন অবরোধ, আবারও ধ্বংস হয় কিউবার অর্থনীতি। কিন্তু সে ধাক্কা সামলে ওরা এখন থিতু হয়েছে, অর্থনৈতিক পথকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভাবনা চলছে আরও জোরকদমে। সাম্প্রতিক জৈব চাষের মধ্যে ‘জমির সাথে মানুষকে যুক্ত করো’ নামে একটি শ্রম প্রক্রিয়াও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিছুদিন আগেই চীনে গিয়েছিলেন কিউবার প্রেসিডেন্ট। তেল, যোগাযোগ, কৃষি, পরিবহণ, অন্যান্য পরিকাঠামো খাতে চীন ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করেছে। কিউবার রেলব্যবস্থা পুনর্বিকাশের জন্য এখন চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
      ফ্যাসিস্টদের মহাসম্মেলনে মোদী -মেলানি-ট্রাম্পের জয়গান হচ্ছে তাই আমাদেরও বন্ধু বাড়াতে হবে। পুরনো বন্ধুদের আগলে রাখতে হবে। আমাদের সামনে আর সোভিয়েত নেই, কিন্তু কিউবা আছে, মানবতার কম্পাস ওরা। ট্রাম্পের আক্রমণকালে গোটা পৃথিবী আর্থিক – মানবিকভাবে ওদের সাহায্য করেছে। দায়িত্ব আছে আমাদেরও – ওদের পাশে থাকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *