অভয়ার এই লড়াইয়ে আমরা হারবো না
সুবর্ণ গোস্বামী
শুধু অভয়ার ঘটনা বলে নয় আমরা যারা সংগঠিত চিকিৎসা আন্দোলনের কর্মী, তারা বিগত ১০-১২ বছর ধরে আমাদের রাজ্যে অন্যান্য যে দপ্তরগুলো তার মধ্যে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি চলছে, স্বজনপোষন চলছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চলছে সেটার বিরুদ্ধে আমরা প্রথম থেকেই সরব। আমরা বহুবার চিঠি দিয়ে জানাতে চেয়েছি রাজ্যের সর্বোচ্চ মহলে, ডেপুটেশন দিতে গিয়েছিল কিন্তু তাদের সময় হয়নি। আমরা সাংবাদিক বৈঠক করে তথ্য প্রমাণও দিয়েছি তবুও প্রশাসনের দিক থেকে কোনোরূপ কর্ণপাত করা হয়নি।২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে আমরা দেখলাম শাসক ঘনিষ্ঠ বহু নতুন লোকজনকে সামনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হলো যেমন মেডিক্যাল কলেজগুলোর মাথায়, স্বাস্থ্য ভবনের মাথায়, যেখানে হেল্থ রিক্রুটমেন্ট হয় তার মাথায়, মেডিক্যাল কাউন্সিলের মাথায়। ফলত মেডিক্যাল বর্জ্যের ব্যবসা, বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে যারা গবেষণার ক্ষেত্রে দেহ দান করেন সেই দেহ পাচারের ঘটনা, জাল ওষুধের ব্যবসা সংগঠিত ভাবে শুরু হলো।
আমরা ২০২৩ সালে জুন মাসে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানালাম গোটা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে করে স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসকদের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে তার বিস্ফোরণ শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু আমরা এটা বুঝতে পারিনি যে এর পরিণতি দিতে হবে আমাদেরই এক সহকর্মী, আমাদেরই এক বোনের ইজ্জত এবং প্রাণের বিনিময়ে। এই জন্যই ২০২৪ সালে ৯ আগস্ট যখন প্রথম ঘটনাটা ঘটল তখন আমাদের সংগঠনের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল যে এই গোটা দুর্নীতির, অপরাধচক্রের শিকার হয়েছে এই তরুণী এবং আজ মানুষ জানতে পারছে তার মনোবিদও বলেছেন যে তিনি জাল ওষুধ চক্রের ব্যাপারে জেনে গিয়েছিলেন এবং তা নিয়ে তার কাছে কিছু প্রমাণও ছিল এবং তা নিয়ে তিনি সরব হয়েছিলেন। একটা জিনিস আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের যা সমাজব্যবস্থা যা রাষ্ট্রব্যবস্থা তাতে অপরাধ তো থাকবেই কিন্তু তাতে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত অপরাধ করলে তা দ্রুত তদন্ত করে, চিহ্নিত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া যাতে করে অন্য অপরাধীরা অপরাধ করার আগে সতর্ক হয়ে যায় বা অপরাধ করার আগে ভাবে। কিন্তু তা না করে রাজ্য সরকার অপরাধীদের পক্ষে চলে গেছে, ধর্ষক খুনীদের আড়াল করা থেকে শুরু করে তথ্য প্রমাণ লোপাট করায় সরকারের ভূমিকা দেখা গেছে। পাশাপাশি যারা প্রশ্ন করেছে, যারা বিচার চেয়েছে, যারা প্রতিবাদ করেছে তাদেরকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা কখনো পুলিশ পাঠিয়ে, কখনো লালবাজারে ডেকে। কয়েকজন যুবক হয়তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলেছেন তাদেরকে থানায় নিয়ে গেছে। নৈহাটিতে দেখলাম মহিলাদের গ্যাং মলেস্টেশন করলো যেখানে পুলিশ নিরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, বারাসাতে দেখলাম রাস্তায় বসে শিল্পীরা ছবি আঁকছে তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের মাথা ফাটিয়ে দিল। উত্তরবঙ্গে দেখলাম কয়েকজন মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে মন্ত্রী দাঁড়িয়ে থেকে সেই মোমবাতিতে জল ঢেলে আগুন নিভিয়ে দিল। রাজ্য সরকার প্রত্যক্ষভাবে দোষীদের শাস্তি না দিয়ে সমাজ বিরোধীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে বার্তা দিল যে তোমরা এই ঘটনাগুলো চালিয়ে যাও প্রশাসন তোমাদের পাশে আছে। অর্থাৎ এই সমাজবিরোধী দুষ্কৃতীদের বুকে ভয় দেখালো না উল্টে সাহস দিল। আগে সমাজবিরোধীরা খুন এবং ধর্ষণের হুমকি দিত কিন্তু অভয়া পরবর্তীতে তারা হুমকি দিচ্ছে ‘আর.জি.কর’ করে দেবো। ‘আর.জি.কর’ কথার অর্থ শুধু খুন করে, ধর্ষণ করেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, খুন করে, ধর্ষণ করে তথ্যপ্রমাণ এমন করে লোপাট করে দেবো সিআইডি কেন স্কটল্যান্ড এর বাপ ঠাকুরদারাও এই প্রমাণ খুঁজে বার করে দোষীদের চিহ্নিত করতে পারবে না। এই নতুন টার্মিনোলোজি সমাজবিরোধীদের উপহার দিল প্রশাসন, এর ফলে সমাজবিরোধীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে গেল। আরেকদিকে আমাদের রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল যারা কিনা কেন্দ্রের সরকার চালাচ্ছে, যারা কিনা হাথরাস, উন্নাও, মনিপুরে ধর্ষকদের পক্ষ নিয়েছে তারাও রাজ্যের সরকারকে বিভিন্নভাবে এই অপরাধমূলক কাজে সাহায্য করছে।সরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি চলছে যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে গোটা শিক্ষা দপ্তর অর্ধেকটাই জেলের অভ্যন্তরে, স্বাস্থ্যদপ্তর, পুরদপ্তর সহ বিভিন্ন দপ্তর বলা চলে যে গোটা রাজ্যটাই দুর্নীতির আঁতুরঘর হয়ে যাচ্ছে। এক চূড়ান্ত অব্যবস্থা রাজ্যের মানুষকে গ্রাস করে নিচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা এরকম অবস্থা দেখা যায়নি। গোটা রাজ্যে লুঠের রাজত্ব চলছে গত ১২-১৪ বছর ধরে কয়লা, বালি, গরু থেকে শুরু করে বেকারের স্বপ্ন, চাকরিরতদের চাকরি, মহিলাদের সম্মান সমস্ত কিছু লুঠ চলছে আর এই লুঠের রাজত্বকে কায়েম করার জন্য রাজ্য সরকার রাজ্যের প্রশাসন এক ভয়ের রাজনীতি বা ভয়ের পরিমণ্ডল তৈরি করছে। আসলে মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আর দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলেই মানুষ গত সাত মাস ধরে যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে তা স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের বুকে তথা রাজ্যের বুকে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
আসলে অভয়ার মৃত্যু শুধু একটা মৃত্যু নয় এটা একটা প্রতীক হয়ে গেছে দ্রোহের প্রতীক, প্রতিবাদের প্রতীক। আসলে অভয়াকে প্রতিটা মানুষ মনে করছে তার নিজের মেয়ে, নিজের বোন, আসলে মানুষ তার নিজের মেয়ের নিরাপত্তা, নিজের বোনের নিরাপত্তা চাইছে এবং গোটা রাজ্যের নিরাপত্তা চাইছে। কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার মানুষের মনে দ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে তাই রাজ্য সরকার ভয় পেয়েছে তাই আন্দোলনের সামনে সারিতে যারা আছে তাদেরকে লালবাজারে ডাকছে, বদলি করছে। কিন্তু সরকার ভুল করছে তারা ভাবছে এইভাবে ভয় দেখিয়ে বদলি করে আমাদেরকে দমিয়ে দেওয়া যাবে কিন্তু আমরা যারা এ আন্দোলনে আছি, তারা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধের আন্দোলন থেকে কোনোভাবেই পিছু হাঁটবো না সে দার্জিলিং-এ থাকি, বর্ধমানে থাকি, যেখানেই থাকি আমরা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালিয়ে যাবো।

