কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং হুমকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং হুমকি

অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য্য


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আধুনিক সমাজের অন্যতম শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ক্ষেত্র থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। স্বয়ংক্রিয়তা থেকে শুরু করে নিরবিচ্ছিন্ন নজরদারিতে AI-এর দ্রুত বিকাশ একদিকে প্রভূত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করছে, আবার অন্যদিকে তা বিপদের আশঙ্কাও তৈরি করছে। তবে, যারা সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমের অধিকার ও প্রযুক্তির গণতান্ত্রিক, নিয়ন্ত্রিত অগ্রগতিতে বিশ্বাসী, তাদের অবশ্যই AI-এর গতিপ্রকৃতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা উচিত। AI অসীম সম্ভাবনার সাথে সাথে শ্রম, গোপনীয়তা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে।

AI- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, পরিসেবা, সামরিক ক্ষেত্রসহ, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিপ্লব ঘটাতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে, AI- নির্ভর রোগ নির্ণয় দ্রুত ও নির্ভুলভাবে রোগ সনাক্ত করতে পারে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর করে তুলবে। একইভাবে, শিক্ষা ক্ষেত্রে AI-চালিত প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পাঠ-পরিকল্পনা গঠনে সহায়তা করতে পারে, যা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাধা দূর করতে পারে।

প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে, AI অবশ্যই জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হওয়া উচিত, ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়। AI- যদি গণতান্ত্রিকভাবে বিকাশিত হয়, তাহলে এটি সম্পদের সুষম বণ্টন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, সমবায় উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। ওপেন-সোর্স AI মডেলগুলি সমাজকর্মীদের সামাজিক প্রবণতা বিশ্লেষণ, ভুল তথ্য প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

AI-এর সবচেয়ে বড় হুমকির মধ্যে একটি হলো চাকরির সংকট। শিল্প ও পরিষেবা খাতে স্বয়ংক্রিয়তার ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক—বিশেষত নিম্ন মজুরি ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তিরা—চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও কর্পোরেট সংস্থাগুলির পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তবুও আশঙ্কা থেকে যায়, বাস্তবে এর সুবিধা ভোগ করবে মূলত পুঁজিপতিরা, শ্রমিকরা নয়।

AI-চালিত গিগ ইকোনমির বিকাশ ইতিমধ্যেই শ্রমিকদের শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে কর্মীদের উপর অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মানবিক তত্ত্বাবধানের কোনো সুযোগ ছাড়াই।

এর বিরুদ্ধে বামপন্থীদের দাবি হতে পারে বিশ্বজনীন নিয়ন্ত্রিত AI এর ব্যবহার ও বিকাশ, শক্তিশালী শ্রম আইন, সর্বজনীন মৌলিক আয়, এবং AI-নিয়ন্ত্রিত কর্মস্থলের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। স্বয়ংক্রিয়তা যেন শুধুমাত্র মুনাফা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত না হয়, বরং শ্রমঘণ্টা কমিয়ে একই বেতনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হোক, যাতে শ্রমিকরা আরও অবসর ও অন্যান্য গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

AI-এর বিকাশ নজরদারি পুঁজিবাদ (Surveillance Capitalism)-এর প্রসার ঘটাচ্ছে। গুগল ও মেটার মতো কর্পোরেশন AI-নির্ভর তথ্য সংগ্রহ করে জনসাধারণের আচরণের উপর নজরদারি চালাচ্ছে। সরকারগুলোও ব্যাপক নজরদারির জন্য AI ব্যবহার করছে, যা মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং শ্রমিক সংগঠকদের দমন করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাসম্পন্ন দেশগুলোতে AI-চালিত ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং পূর্বাভাসমূলক নজরদারি গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এছাড়াও, AI সিস্টেম প্রায়শই বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও গভীর করে তুলছে। রাষ্ট্রের পূর্বাভাসমূলক অ্যালগরিদম গরিব শ্রমজীবী মেহনতি এবং সংখ্যালঘুদের উপর প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে জাতি ও লিঙ্গ বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে। এই বৈষম্যের মূল কারণ হলো, AI-এর মাস্টার ডেটা সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যকে প্রতিফলিত করে, ফলে এটি বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে তাকে স্বায়িত্ব প্রদান করে।

AI-এর বিকাশ যদি কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় কর্পোরেট গোষ্ঠী ও বুর্জোয়া রাষ্ট্রশক্তির হাতে থাকে, তাহলে তা সমাজের ক্ষতির কারণ হবে। AI-কে জনস্বার্থে বিস্তৃত করতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা, নৈতিক ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক নজরদারির নিশ্চয়তা থাকে। শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন AI এর বিকাশ, শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ওপেন-সোর্স গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ একটি ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বামপন্থীদের উচিত AI-এর পণ্যায়ন (Commodification) -কে চ্যালেঞ্জ করা এবং এমন একটি বিকল্পের জন্য লড়াই করা, যা জনগণের কল্যাণকে মুনাফার চেয়ে অগ্রাধিকার দেবে। AI যেন নিপীড়ন নয়, বরং সম্মিলিত মুক্তির হাতিয়ার হয়। ন্যায়সংগত AI-চালিত সমাজ গড়ার সংগ্রাম আসলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামেরই অংশ—যা সংহতি, প্রতিরোধ এবং সমাজের পুনর্বিবেচনা দাবি করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *