শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি: গণতন্ত্রহীনতার ফল ও আস্থাহীনতার কারণ

শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি: গণতন্ত্রহীনতার ফল ও আস্থাহীনতার কারণ

ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

দুর্নীতি। করাপশন। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান যে শব্দটিকে ব্যাখ্যা করেছে “dishonest or fraudulent conduct by those in power, typically involving bribery,” এই ভাবে। Corruption শব্দটির উৎস খুঁজলে দেখা যাবে শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষার corrumpere শব্দ থেকে, যার অর্থ ” to physically damage, destroy, or ruin something.” দুর্নীতি শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দের উৎস আর শব্দার্থের দিকে সামান্য খেয়াল করলেই এই তিন অক্ষরের শব্দের ফলাফল কতটা মারাত্মক হতে পারে তা আন্দাজ করা যায়। সমাজের যেকোন ক্ষেত্রে, যেকোন দুর্নীতিই ঘৃণ্য। তবুও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি ঘৃণ্যতম, কারণ তার ফল সুদূরপ্রসারী।

টাকা নিয়ে অ্যাডমিশন থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি এবং চরম অনিয়ম, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। শিক্ষকতার চাকরি বিক্রি করে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ধ্বংস স্তুপে পরিণত করেছে এই সরকার। একটা সময় ছিল যখন অভিভাবকরা চোখ বন্ধ করে শিক্ষক শিক্ষিকাদের বিশ্বাস করতেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কারণে আদালতের রায়ে ২৬০০০ নিয়োগ বাতিলের ঘটনা, সেই সহজ বিশ্বাসের জায়গাটাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবারগুলি, যাদের কাছে সরকারি স্কুলই এখনও শিক্ষার একমাত্র উপায়, সেইসব অঞ্চলে শিক্ষক- অভিভাবকদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস চোখে পড়ার মত। অভিভাবকরা শিক্ষকদের বিশ্বাস করতে পারছেন না। কাজেই যাদের সামর্থ্য আছে তারা ছেলেমেয়েদের বেসরকারি স্কুলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আর এদিকে একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ করে সরকার সেই বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৭৪, ৭১৭টি, ২০২২ সালের ৩১শে মার্চের হিসাব অনুযায়ী সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৬৭, ৬৯৯তে। অর্থাৎ স্কুলের সংখ্যা কমেছে ৭,০১৮ টি।

শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলাফল শুধু সাময়িক নয়, তা হতে পারে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রাচীন গ্রীসে ডেলফি শহরে ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা অ্যাপোলোর বিখ্যাত এক মন্দির ছিল। ডেলফির সেই মন্দিরে, অ্যাপোলো পাইথিয়া নামে এক মহিলা পুরোহিতের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। আরেকজন পুরোহিত সেই ভবিষ্যদ্বাণী ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন। বলা বাহুল্য যে দুজনেই অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। এথেন্সে তখন শাসন করছে পেসিস্ট্র্যাটিডস পরিবারের শেষ শাসক হিপ্পিয়াস। আর এদিকে পেসিস্ট্র্যাটিডসদের দাপটে এথেন্সের আরেক ধনী পরিবার অ্যালকমেওনীডেরা এথেন্স ছাড়া। হেরোডোটাস তাঁর বইয়ে লিখেছেন যে অ্যালকমেওনীডেরা যখন এথেন্সে ফেরার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁরা ডেলফির সেই মন্দির কর্তৃপক্ষ কে ঘুষ দিয়েছিলেন যাতে তাঁরা আরেক শক্তিশালী রাজ্য, স্পার্টার নেতাদের কোনোভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন যে – পেসিস্ট্র্যাটিডসদের হাত থেকে এথেন্স কে মুক্ত করা স্পার্টার পবিত্র কর্তব্য। সেই মতো স্পার্টা এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে। এই ডেলফি- গ্রীস- হেরোডোটাস এতকিছু বলার একটাই কারণ, এটা প্রমাণ করা যে, দুর্নীতি একটা জাতির ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আগামী সমাজ ব্যবস্থায় তার কুপ্রভাব অবশ্যম্ভাবী।

এই রাজ্য সরকারের আমলে দুর্নীতি যে শুধুমাত্র শিক্ষক নিয়োগে তা নয়, ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রেও বিপুল ভাবে আছে। মেধাকে বাইপাস করে টাকা নিয়ে ছাত্র ভর্তির ঘটনাও আকছার ঘটছে। এমন একটা ব্যবস্থা এই তৃণমূল সরকার কায়েম করেছে, যেখানে টাকা দিয়ে নিয়ে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে সেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও পাশ করা যায়। আবার টাকা দিয়ে চাকরিও কেনা যায়। তৃণমূলের কায়েম করা এই দুর্নীতির বৃত্তে মেধা কোনভাবে বিবেচ্যই হচ্ছে না। এই সমস্ত ছাত্ররাই পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় যাবে। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে সমাজের প্রভাবশালী অংশীদার হয়ে উঠলে, তার ক্ষতিকর প্রভাব সমাজে কতটা পড়তে পারে, সেই ফলাফল অনুধাবন করতে পারার জন্যই ইতিহাসের এই উদাহরণ।

দুর্নীতির ফলাফল ইতিমধ্যেই আমরা পাওয়া শুরু করেছি। নিয়োগক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় অনীহা দেখা দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের কলেজ গুলিতে স্নাতকস্তরে আসন সংখ্যা ৯.৫ লক্ষ মত। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত বছর সেন্ট্রালাইজড অ্যাডমিশন পোর্টালের মাধ্যমে ভর্তি হয়েছিলেন ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭৭৭ জন। অর্থাৎ মোট আসনের ৭০ শতাংশও পূরণ হয়নি। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ISC এবং CBSE বাদে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ(WBCHSE)
থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট ৪,৩০,২৮৬ জন ছাত্রছাত্রী সফলভাবে পাশ করেছিলেন, যার অর্ধেক সংখ্যাও কলেজে ভর্তি হয়নি।

শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধে সর্বপ্রথম জরুরী শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র ফেরানো। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত পরিচালন সমিতি এবং ছাত্র ইউনিয়নের যে দায়বদ্ধতা অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি থাকে, সেই দায়বদ্ধতা শাসকদলের মনোনীত কোন ব্যক্তির থাকে না। তার দায়বদ্ধতা থাকে শাসকদলের প্রতি। স্কুল, কলেজের উন্নয়ন তহবিলের টাকা তছরুপ করে ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং দলীয় কর্মসূচির খরচ বহনের একটা স্থায়ী উপায় মনে করে নিয়েছে শাসক দলের নেতারা।

একটা কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে, তাদের সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক। একটা ছাত্র,যে পঞ্চায়েতে অথবা পৌরসভায়, বিধানসভায়, লোকসভায় নিজের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে বেছে নেওয়ার অধিকার পেয়ে গিয়েছে, সে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও নিজের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। স্কুল পড়ুয়াদের অভিভাবকরা নির্বাচিত করবে বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি। সেই নির্বাচিত পরিচালন সমিতির হাতে থাকবে বিদ্যালয় পরিচালনার ভার। ফান্ডের টাকা কোথায় কীভাবে খরচ করা হবে সেটা তারা ঠিক করবে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। কিন্তু এই রাজ্য সরকার স্কুল ভোট, ছাত্র সংসদ নির্বাচন সব বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ এই শাসকদল তার নেতাদের ‘করেকম্মে’ খাওয়ার রাস্তাটাকে নিষ্কণ্টক রাখতে চায়। সেই সঙ্গে দুর্নীতির একটা সামাজিক ভ্যালিডেশন তৈরি করতে চায় এই সরকার। “ক্ষমতায় থাকলে একটু আধটু খেতেই পারে”, জনমানসে এই ধারণার স্বাভাবিকীকরণ করতে চায় এরা। আমাদের লড়াই এই মানসিকতা তৈরির বিপক্ষে। রাজনীতিটা যে ‘করেকম্মে’ খাওয়ার জায়গা না, সেই বিশ্বাসটা মানুষের মধ্যে আবারও প্রতিষ্ঠা করতে হবে আমাদের।
কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকার ফল কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। তিলোত্তমার বিচার চেয়ে আন্দোলনে বারবার উঠে এসেছে থ্রেট কালচারের কথা। অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসদের দাদাগিরির কথা শুনে শিউরে উঠেছে এই রাজ্য তথা দেশের মানুষ। কলেজে কলেজে থ্রেট কালচার থেকে শুরু করে উন্নয়ন তহবিলের টাকা তছরুপ, সব সম্ভব হতে পেরেছে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে। দীর্ঘদিন ভোট না করেই, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়ন রুমগুলো দখল করে রেখে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের জমিদারিতে পরিণত করেছে। ফান্ডের টাকা নয়ছয় করে তার ভাগ বাটোয়ারা হোক বা সাধারন ছাত্রছাত্রীদের জোর করে তৃণমূলের দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো, সমস্ত কিছু পরিচালিত হয় এই অনির্বাচিত ইউনিয়ন রুমগুলো থেকে। অনির্বাচিত ইউনিয়নের দাদাগিরি বন্ধ করতে চাই ছাত্র ভোট। চাই নির্বাচিত ছাত্র সংসদ। ভবিষ্যত প্রজন্মের নৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা জরুরী। আর একমাত্র নির্বাচিত পরিচালন সমিতি এবং ছাত্র ভোটের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব।