SIR : Specially Irritating Representative

SIR : Specially Irritating Representative

পুরুষোত্তম গুপ্ত

সারাদেশে মোট 12 ভোটমুখী রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক। কমিশনের বক্তব্য হল বিভিন্ন রাজ্যে যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন হবে সেই রাজ্যের নির্বাচন যেন বিশুদ্ধ ভোটার লিস্ট দিয়ে হয়। যেখানে কোন মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত বা অনুপস্থিত ভোটার থাকবেনা। কিন্তু এই কাজ তো কমিশনের রুটিন মাফিক কাজ তাহলে হঠাৎ করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন হচ্ছে কেন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী বিদেশী ভোটারদেরও চিহ্নিত করা হবে এবং তাদের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের থেকে এক ধাপ উপরে উঠে বিজেপি বলছে যে এই রাজ্যে নাকি রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে বসে আছে। তাঁদের তাড়াতেই মূলত এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে বিজেপির যেকোনো ছোট বড় নেতারা কোন না কোন সংখ্যার উল্লেখ করছেন। তাঁদের সবারই বক্তব্য এই রাজ্যে প্রায় ১-১.৫ কোটি  বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা ঢুকে গেছে। তাদের সনাক্তকরণ করো, ভোটার লিস্ট থেকে ডিলিট কর এবং ডিপোর্ট অর্থাৎ তাড়াও, এটাই এখন বিজেপির বক্তব্য। এখানেও অনেক প্রশ্ন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মনে জেগেছে যে, তাঁরা কি করে জানলেন যে এই রাজ্যে এতো এতো অনুপ্রবেশকারী ঢুকে গেছে। তাঁরা কি রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশীদের কেমন দেখতে হয়? এরা কোন ভাষায় কথা বলে ইত্যাদি জানেন?  বিজেপির আরো বলেছে যে রাজ্য সরকার ফেন্সিং বা কাঁটাতার বসাতে দিচ্ছে না এবং তাঁরাই এই রাজ্যে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকাচ্ছে। এই কারণেই নাকি তৃণমূল ভোটে জিতছে। অপরদিকে তৃণমূল বলছে যে বর্ডার বিএসএফ এর হাতে থাকে, তাহলে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকছে কিভাবে। এইভাবে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে। এবং এর ফলে শিক্ষার দুরাবস্থা, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো চরম সমস্যা গুলিকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাধারণ মানুষকে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের দায়ে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে।কমিশনের এই প্রক্রিয়া খানিক এইরকম যে ধরুন আপনার পাড়ায় হঠাৎ কোনো বাড়িতে চুরি হলো, পুলিশ আপনাকে তুলে নিয়ে গেলো চোর সন্দেহে এবং থানায় নিয়ে গিয়ে বলল যে আপনি চোর না, এটি প্রমাণ করুন তবেই আপনাকে ছাড়া হবে। তেমনই এই প্রক্রিয়াও এইরকম যে আপনি বা আপনার নথি বৈধ, কোনো অনুপ্রবেশকারী নয় তার প্রমাণ আপনাকেই করতে হবে। ভোটারদের নথি যাচাই করে কি আদৌ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা সম্ভব নাকি এই SIR আসলে রাজনৈতিক কর্মসূচি যা কিনা আসলে আমলাতান্ত্রিক নজরদারির কৌশল। এর ফলে রাজ্য তথা দেশের সাধারণ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বিশেষ করে গরিব খেটে খাওয়া মানুষ পিছিয়ে পড়া বা সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের বঞ্চিত করা এবং রাজ্য তথা দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা আসলে বিজেপি বা আরএসএস এর মদতপুষ্ট এবং তাদের রাজনৈতিক প্রজেক্ট, তারা দেশের মানুষদের মধ্যে ধর্মীয়  বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে ভোটবাক্সে সুবিধা করতে চাইছে। তবে এর প্রভাব শুধুমাত্র ভোট বাক্সে সীমাবদ্ধ নেই বরং এর প্রভাব শিক্ষা স্বাস্থ্য বা সংস্কৃতিতে কিংবা জনজীবনে, বিশেষ করে প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া, সংখ্যালঘু বা উদ্বাস্তু মানুষদের উপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতার গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের আবেগ নয় বরং সেই কঠিন সংখ্যা তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে যা মানবিক ট্রাজেডিকে সংজ্ঞায়িত করে।


পদ্ধতি ও পরিসংখ্যান :
নির্বাচন কমিশন এই রাজ্যের প্রতিটি বুথে বুথ লেভেল অফিসার বা BLO নিয়োগ করেছে, তাঁদের সাথে থাকতে পারবে বুথ লেভেল এজেন্ট বা BLA, যাঁরা আসলে এক একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। কমিশনের দেওয়া একটি ফর্ম ফিলাপের মাধ্যমেই BLA হিসেবে নিযুক্ত হতে হয়েছে। SIR এর পদ্ধতি হলো, BLO প্রত্যেক ভোটারদের দুটি করে গণনা ফর্ম দিয়েছেন ইত্যাদি আমরা জানি। তাই এই বিষয়ে বেশি কিছু লেখার নেই।


খসড়া তালিকা

SIR পূর্ববর্তী অর্থাৎ ২৬শে অক্টোবর ২০২৫ সালের নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই রাজ্যে মোট ভোটার ছিল ৭.৬৬ কোটি মানুষ। খসড়া তালিকা বেরোনোর পর অর্থাৎ মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত এবং অনুপস্থিত ভোটারদের বাদ দিয়ে সংখ্যাটা দাড়ালো প্রায় ৭.০৮ কোটি। প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম সরাসরি বাদ। তবে এক্ষেত্রে অনেক অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে কোনো অনুপ্রবেশকারী কে এখনো সরাসরি নির্বাচন কমিশন চিহ্নিত করে নি।


নোটিশ আতঙ্ক:

খসড়া তালিকা বেরোনোর পর প্রথম ধাপে শুনানি হলো তাদের যাদের নিজের বা বাবা মা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ম্যাপিং হচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে BLO রা যখন গণনা বা এনিউমারেশন ফর্ম বাড়ি বাড়ি দিচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তখন প্রতিদিন নতুন নতুন নোটিশ বা নিয়ম এনেছে। প্রাথমিক ভাবে কমিশন বলেছিল বাবা, মা, ঠাকুরদা অথবা ঠাকুমা এর নাম দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করতে হবে পরে তারা মোটামুটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নাম দিয়েও ফর্ম ফিলাপ করা যাবে, এমনটাই বলেছে। এদেরই বেশিরভাগ প্রথম ধাপের শুনানিতে ডেকেছিল। পরে কমিশন আবার নতুন করে শুনানি শুরু করে, এক্ষেত্রে ভোটারদের নাম ২০০২ সালের তালিকার সাথে ম্যাপ করা থাকলেও “লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি” বা “যৌক্তিক অসঙ্গতি” এর নোটিশ পাঠানো হয়। সংখ্যাটা প্রায় ১.৩৬ কোটি। অর্থাৎ রাজ্যের মোট ভোটার এর ২০ শতাংশ। কম্পিউটার আলগরিদম বা সফ্টওয়ার এর চোখে এই সকল ভোটার দের অস্তিত্বই অসঙ্গত।নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী পরিচয় পত্র যাচাইকরণের নামে সাধারণ ভোটারদের বাধ্য করেছে ২০০২ সালের তালিকার সাথে নাম মেলাতে বা ম্যাপিং করতে। যাদের বয়স হয় নি সেই সময় ভোটার হওয়ার, তাঁদের কে বাধ্য করেছে প্রোজেনি ম্যাপিং বা বংশগত যোগসূত্র এর তথ্য দিতে। যা কার্যত সাধারণ ভোটার দেরকে জেরার সম্মুখীন করেছে। ২৪ বছর আগের নথিপত্র খোঁজা ভূমিহীন কৃষক, পরিযায়ী শ্রমিক বা বস্তির মানুষদের কাছে কার্যত অসম্ভব। উদ্বাস্তু যারা ২০০২ সালের আগেই পাশের দেশ থেকে এই দেশে এসেছে, এখানে স্থায়ী ভাবে থাকে এবং কাজ করে বা সংখ্যালঘু মানুষদের কাছে নথি মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রমাণ চরম দুঃস্বপ্নের। আর যাদের ঘর বন্যায় ভেসে গেছে বা আগুনে পুড়ে গেছে, তাঁদের কাছে ২০০২ সালের নথির প্রমাণ দেওয়া আসলে এক মৃত্যু পরোয়ানা। কমিশন প্রায় এখনো পর্যন্ত ৮৫-৯০ লক্ষ ভোটারের বাবার নামে অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে। এছাড়া ২.০৭ লক্ষ পরিবারকে চিহ্নিত করেছে যেখানে এক দম্পতির ৬ বা ততোধিক সন্তান ভোটার। বাংলার যৌথ পরিবারের এই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যান্ত্রিক মাপকাঠি চাপিয়ে দিতে চাইছে।


বিজেপির “ব্যাকডোর এনআরসি”:

বিজেপি এই SIR প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের সাম্প্রদায়িকতা কে বাস্তবায়িত করতে চাইছে। লাগাতার আন্দোলনের ও প্রতিবাদের ফলে দেশব্যাপী এনআরসি কার্যকর করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, তারা নির্বাচন কমিশন এর মাধ্যমে বিভাজনের রাজনীতি করছে।
• মতুয়াদের সাথে ধাপ্পাবাজি: এই রাজ্যে বিজেপি মতুয়াদের নাগরিকত্বের টোপ দিয়ে বছরের পর বছর ভোট নিয়েছে। বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল কোনো হিন্দু বা মতুয়া ভোটারদের নাম বাদ যাবে না। যাদের বাদ যাবে তাদের নাকি CAA এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেবে। কিছু জায়গায় বিজেপি ক্যাম্প করে, মতুয়াদের হিন্দু কার্ড দেওয়ার নামে টাকা তুলছে। এর সাথে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা হলো মতুয়া প্রধান ১৬ টি আসনে ভোটার বাদ পড়ার হার গড়ে ৩৩%। নদীয়ার কালীগঞ্জে এই হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪২%। বিজেপির সাংসদ শান্তনু ঠাকুর বলেছেন ৫০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী হঠাতে গিয়ে যদি আমাদের ১ লক্ষ মানুষ ভোট না দিতে পারে, তাতে ক্ষতি নেই। এর ফলে বোঝা যায় যে বিজেপির কাছে সাধারণ জনগণ কেবলই ভোটব্যাঙ্ক, নাগরিক নয়।

সংখ্যালঘুদের হয়রানি:

সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলমানদের নামকরণের বৈচিত্র্য বা বানান ভুলকে গুরুত্ব না দিয়ে AI চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে চিহ্নিত করে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। খসড়া তালিকা বেরোনোর পর দেখা গেছিলো যে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় তুলনামূলক কম অবৈধ ভোটারের নাম বাদ গেছে কিন্তু এরপর আমরা দেখলাম যে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি এর নামে মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো জায়গায় একই বুথ থেকে ৭০০-৮০০ জনকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। মুসলমান মেয়েরা যাঁরা বিয়ের আগে খাতুন এবং বিয়ের পর বিবি বা বেগম হয়েছেন তাঁদেরও শুনানির মাধ্যমে হয়রানি করা হয়েছে। এই রাজ্যের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, রাজ্যে কাজ না পেয়ে বহু মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে চলে গেছে। বিশেষত মালদা, মুর্শিদাবাদ থেকেই সবথেকে বেশি মানুষ পরিযায়ী হয়ে বাইরে গেছেন। তাঁরা যেমন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাদেশী সন্দেহে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন তেমনি কমিশনের মাধ্যমে রাজ্যেও শুনানির যাঁতাকলে পড়ছেন।

কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা:

গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ভারতের নির্বাচন কমিশন আজ কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ও সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস এর সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। এই রাজ্যের মানুষের কাছে আজ নির্বাচন কমিশন আস্থা হারিয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
• AI যখন হাতিয়ার: কমিশন  ভুয়ো ভোটার বা অবৈধ ভোটার বাদ দিতে যে AI সফটওয়্যারের ব্যবহার করছে, তা বাংলার মানুষের নামের বৈচিত্র্য বা পদবীর বিবর্তন বুঝতেই অক্ষম। ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ ও ‘ব্যানার্জি’ কিংবা ‘চট্টোপাধ্যায়’ ও ‘চ্যাটার্জী’ ইত্যাদি আরো অনেক পদবী আছে যেগুলো আসলে একই, তা বুঝতে না পেরে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় রেখেছে।
• সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ: দেশের ইতিহাসে প্রথমবার নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপের উপর হস্তক্ষেপ করলো সর্বোচ্চ আদালত। যার পিছনে অনেকখানি দায়ী আসলে রাজ্য সরকার। রাজ্য সরকার উদ্যেশ্য প্রণোদিত ভাবেই রাজ্যের অফিসারদের লিস্ট কমিশনকে দেয় নি। শুনানির গুরুভার দেওয়া হলো রাজ্যের বিচারপতি বা বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের উপর।
যে সকল ৬০ লক্ষ মানুষকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল, তাঁদের পুরো বিষয়টাই এবার এই বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরাই দেখবেন, তাই বলাই বাহুল্য যে এবার নাম বাদ বা লিষ্টে থাকা পুরোটাই বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের উপর নির্ভরশীল। এই ঐতিহাসিক এবং অভূতপূর্ব রায় দানের ফলে নির্বাচন কমিশনের অপদার্থতা, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও রাজনৈতিক অভিসন্ধি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।



দোসর তৃণমূল ও রাজনৈতিক নাটক:

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল নিজেদের বাংলার গরিব, বেকার, খেটে খাওয়া কিংবা সংখ্যালঘুদের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে দাবি করলেও, আমরা দেখলাম যে এই সংকটের সময়ে তাদের ভূমিকাও প্রশ্নাতীত নয়। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে SIR প্রক্রিয়া চলাকালীন শতাধিক মানুষ দুশ্চিন্তায় বা আত্মহত্যা করে মারা গেছে। কিন্তু ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়, তৃণমূল শুধু চাইছে মানুষের মৃত্যুকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। প্রশাসনিক স্তরে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে তারা জনগণের ভয়কে বড় করে দেখিয়ে নির্বাচনে ফায়দা তুলতে চাইছে। সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টকে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভে পরিণত করে নির্বাচনে সুবিধা পেতে চাইছে। এসআইআর এর ভয়াবহতা যখন চরমে, তখন রাজ্যের সরকার প্রয়োজনীয় সরকারি আধিকারিকদের সময়মতো কমিশনকে সরবরাহ করে নি। এই তৃণমূল আসলে সাধারণ মানুষের নাগরিকত্বের অধিকার রক্ষার চেয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার গড়তেই ব্যস্ত।


মানবিক ও মানসিক বিপর্যয়: আমলাতান্ত্রিক মৃত্যু
এই প্রক্রিয়া চলাকালীন শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এর পিছনে অসংখ্য মানুষের বুকফাটা হাহাকার লুকিয়ে আছে, কোথাও মা তার BLO ছেলের মৃত্যুশোকে চিৎকার করছেন, কোথাও মেয়ে তার বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু দেখেছে। এগুলি আসলে রাষ্ট্রের দ্বারা সংগঠিত ও সুপরিকল্পিত হত্যালীলা। শুনানি চলাকালীন আমরা প্রতিদিন দেখেছি যে কোথাও বৃদ্ধ বাবা কে নাকে নল লাগিয়ে ছেলে নিয়ে এসেছেন। কোথাও আবার নব্বই ঊর্ধ বৃদ্ধা লাঠি হাতে শুনানিতে এসেছে, কোথাও আবার এম্বুলেন্সে করে শুনানিতে আসতে হয়েছে অসুস্থ মানুষকে।

BLO: এক বিচ্ছিন্ন শ্রম
এই রাজ্যে প্রায় ৯০০০০ এর কাছাকাছি বুথ লেভেল অফিসার বা BLO নিয়োগ করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে প্রায় ৭৫% শিক্ষক শিক্ষিকা এবং বাকি প্রায় ২৫% অঙ্গনওয়ারি এবং আশা কর্মী। সরকারি বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষককে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রাক্কালে তাঁদের প্রিয় শ্রেণীকক্ষ থেকে বের করে নিয়ে এসে বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হল। অপরদিকে অঙ্গনওয়ারী বা আশা কর্মীদের, যাঁরা ন্যূনতম বেতন থেকেও বঞ্চিত, তাঁদের কেও BLO হিসেবে নিয়োগ করা হলো। এর অবশ্য একটা বড় কারণ হলো রাজ্যে জুড়ে শিক্ষকের ঘাটতি। যখন একজন শিক্ষক বা আশা কর্মী রাষ্ট্রের চাপে পড়ে সাধারণ মানুষের তথ্য সংগ্রহকারী বা অনুপ্রবেশকারী খোজার যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন তাঁরা নিজেদের কাজকে তাঁদের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে মনে করে না, কেবলই টিকে থাকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। একে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন শ্রম বলা যেতে পারে। কারণ এখানে শিক্ষক কিংবা আশা বা অঙ্গনওয়ারীর কর্মীরা চাইলেও এই কাজ থেকে অব্যাহতি নিতে পারছেনা, যা  এক যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা।

চূড়ান্ত তালিকা:

আগামী ২৮ তারিখ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে। যত দূর জানা গেছে যে খসড়া তালিকায় যে ৭.০৮ কোটি ভোটারের নাম ছিলো, তাঁদের সবার নামই এই তালিকায় থাকবে। শুধু নামের পাশে approved  বা অনুমোদিত লেখা থাকবে কিংবা যাঁদের শুনানি বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের তত্বাবধানে হচ্ছে, তাঁদের নামের পাশে adjudication লেখা থাকবে, যার অর্থ বিচার বিভাগীয় নিষ্পত্তি। এর সাথে যারা নতুন ভোটার  হয়েছেন, তাঁদের সাপ্লিমেন্টারি লিস্টও প্রকাশ হবে।


উপসংহার: বিভাজনের রাজনীতি ও বিকল্প
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, নির্বাচন কমিশনের এই এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া আসলে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের এক সুপরিকল্পিত ‘গট-আপ গেম’ বা সাজানো চিত্রনাট্য। একদিকে বিজেপি যখন এই প্রক্রিয়াকে তাদের সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা এবং ‘ব্যাকডোর এনআরসি’ (Backdoor NRC) বাস্তবায়নের হাতিয়ার করছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস তখন সেই ভয়কে মূলধন করে স্রেফ ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলে নিজের ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত রাখতে চাইছে। এই দুই শক্তির দ্বিমেরুকরণ বা বাইনারি রাজনীতি আসলে বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জ্বলন্ত সমস্যাগুলো—যেমন শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, চাকরি দুর্নীতি, বেকারত্ব থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার এক ধূর্ত কৌশল।


এই প্রক্রিয়াটি আসলে শ্রেণি শোষণেরই একটি নামান্তর। যখন একজন ভূমিহীন কৃষক বা পরিযায়ী শ্রমিককে দু দশক আগের নথি জোগাড় করতে বাধ্য করা হয়, তখন সেটি কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় প্রান্তিক মানুষের ওপর রাষ্ট্রের এক চরম দমনমূলক আচরণ। একদিকে আরএসএস-বিজেপি তাদের বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে মানুষের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে তৃণমূল সরকার প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক নাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে রক্ষাহীন অবস্থায় ছেড়ে দিচ্ছে। দুটো দলই আরএসএস এর মদতপুষ্ট, যাঁরা জনগণের সামনে একে অপরের প্রধান এবং একমাত্র শত্রু হওয়ার নাটক করছে। এরা দুজনেই আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যারা মানুষের নাগরিকত্বকে পণ করে ক্ষমতার মসনদ দখল করতে চায়।

এই সংকটে রাজ্যের শিক্ষক সমাজ এবং আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের যেভাবে ‘বিচ্ছিন্ন শ্রমে’ বাধ্য করা হচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে কেবল যন্ত্র হিসেবেই দেখে। এই যান্ত্রিকতা ও অমানবিকতার হাত থেকে বাংলাকে বাঁচাতে পারে একমাত্র সেই রাজনীতি, যা ধর্মের ভিত্তিতে নয় বরং শ্রেণী সংহতি এবং রুটি রুজির অধিকারের ওপর ভিত্তি করে লড়াই করে।
আজকের এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে, বিজেপি-তৃণমূলের এই বিভেদকামী বাইনারি রাজনীতির একমাত্র বিকল্প হলো বামপন্থী চেতনা। কারণ একমাত্র বামপন্থাই পারে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে, ধর্ম-জাত-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের গণতান্ত্রিক পরিচয় সুনিশ্চিত করতে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষের বিপরীতে একটি প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন বাংলার পুনর্গঠন করতে। তাই নথির লড়াইয়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষের প্রকৃত মুক্তি এই দুই শাসক শক্তির পতন এবং বামপন্থার বিকল্প রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত।