প্রকল্প নাকি বিকল্প
• অর্ঘ্য সরকার
সালটা এখন ২০২৬। বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট বেজে গেছে। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগের নির্বাচনগুলিকতে প্রধান বিষয় থাকতো স্কুল, কলেজ, শিক্ষাব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, শিল্প, কারখানা, অর্থনীতি ইত্যাদি । বর্তমানে তৃণমূল এবং বিজেপি সরকারের সৌজন্যে নির্বাচনের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাতা এবং ধর্ম । এই ভাতা এবং ধর্মের রাজনীতি দিয়ে মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ঠিক যেমন ধরুন তৃণমূল সরকার SSC (স্কুল সার্ভিস কমিশন) তে দুর্নীতি করে, নতুন করে বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থাপনা না করে ঘোষণা করলো যুবসাথী প্রকল্প। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সের বেকার যুবক ও যুবতীরা যারা মাধ্যমিক পাস করেছে তারা এই ভাতা পাবে। প্রত্যেক মাসে মাত্র ১৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে অর্থাৎ দিনে ৫০ টাকা। ২০২৬-২০২৭ এ এই প্রকল্পের জন্য ৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো। মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের বাজেট অধিবেশনে প্রথমে ঘোষণা করলেন রাজ্যের প্রায় ৩০ লক্ষ্য বেকার যুবক-যুবতী এই প্রকল্পে উপকৃত হবে ১৫ ই আগস্ট থেকে। পরবর্তীকালে নির্বাচনের সুবিধা তোলার জন্য ১ লা এপ্রিল থেকেই এই টাকা দেওয়া হবে ঘোষণা করলেন।
রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেই বয়সে রাজ্যের যুবক যুবতীদের সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য কিংবা বেসরকারি কোম্পানিগুলোতে চাকরির জন্য লাইন দেওয়ার কথা সেখানে তাদের ভাতা পাওয়ার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।। এই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি, এম টেক পাস করা, নার্সিং পাস করা যুবক যুবতীরা। এই জেনারেশনের যুবক-যুবতীরা বুঝতে পারছে রাজ্যে চাকরি নেই শুধু দুর্নীতি আর দুর্নীতি। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে একটি সংসার চালাতে নূন্যতম তম মাসিক ১০-১৫০০০ টাকা মজুরি পাওয়া দরকার সেখানে শুধুমাত্র মাসিক ১৫০০ টাকা করে বছরে মোট ১৮০০০ টাকা দিয়ে সরকার দায় সেরে দিচ্ছে। এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যন্ত দুর্নীতিতে ভরে গেছে। ফলে এই তৃণমূলের সরকার একটি রাজ্য চালাতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ। যত বেশি ভাতা প্রকল্প হবে পশ্চিমবঙ্গের কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে আসবে। তাই এই ভাতা নামক ভাঁওতাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই সংঘঠিত করতে হবে।
এখনো পর্যন্ত একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে বামফ্রন্ট সরকার যে সোনার বাংলা গড়বার চেষ্টা করেছিল সেই স্বপ্ন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দুরমুশ করে দিয়েছে এই তৃণমূল সরকার। একটা সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তুলতে গেলে সমাজের প্রধান স্তম্ভ হল শিক্ষা,১৯৭৭ থেকে ২০১১সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার এই শিক্ষা ব্যবস্থাকেই জোড় দিয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার ই প্রথম SSC(স্কুল সার্ভিস কমিশন) চালু করে শিক্ষক নিয়োগ করতো সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মধ্যে এই রাজ্যের বামপন্থী ফ্রন্ট সরকার তার বাজেটের ৩৪.৮% ব্যয় বরাদ্দ করেছেন। শিক্ষা ১২ ক্লাস পর্যন্ত অবৈতনিক হয়েছে ।ছাত্র সংখ্যায় অনুপাতিক ব্যয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছে ।প্রত্যন্ত গ্রামে অসংখ্য প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। মিড ডে মিল চালু করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে, মাতৃভাষায় শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপ ও বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বর্তমানে এই তৃণমূল সরকারের নতুন কিছু করার কোন পরিকল্পনা নেই।
এরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে SFI এর অন্যতম প্রধান স্লোগান হলো “সবার জন্য শিক্ষা সবার জন্য কাজ।”(Educate All, Employ All)।। আমাদের সংগঠন কখনো ভাতাকে স্থায়ী সমাধান হিসাবে মনে করে না আমাদের সংগঠনের দাবি ‘স্থায়ী শিক্ষা ,স্থায়ী কাজ’। ভাতা দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো পরিত্রাণ দেওয়া যাচ্ছে। তবে আমাদের কাছে বিকল্প পথও আছে,লক্ষীর ভান্ডার থেকে শুরু করে যুব সাথী সমস্ত প্রকল্পের টাকায় বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেত যদি সরকার আর সাধারণ জনগণের মাঝে কাটমানি সিন্ডিকেট না থাকতো।
এই সামান্য কিছু ভাতা দেওয়ার বদলে এই যুব সাথী প্রকল্পের ৫০০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য প্রকল্পের আরো টাকা শিক্ষাক্ষেত্রে যুক্ত করলে ৪৯,৫৫৭.৫৪ কোটি টাকার পরিমাণটা আরো বাড়তো। শিক্ষা খাতে বাজেটের ১২% টা বেড়ে ২০-৩০% করা যেত। এর ফলে রাজ্যের বুকে যে ৮২০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, এই স্কুলগুলো বন্ধ হতো না। সরকারের থেকে সঠিকভাবে টাকা না পাওয়ার ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষকে ছাত্রছাত্রীদের থেকে অধিক পরিমাণে ভর্তির জন্য টাকা নিতে হতো না। সরকারি স্কুল গুলোর পরিকাঠামো আরো ভালোভাবে গড়ে তোলা যেত। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি না করে শিক্ষক নিয়োগ করলে ছাত্রছাত্রীরা সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে ,এর পাশাপাশি রাজ্যে যদি নতুন করে শিল্প হতো তবে পড়াশুনা সম্পূর্ণ করে রাজ্যের যুবক যুবতীদের চাকরি পাওয়ার ফলে সমস্যা হত না। এই তৃণমূলের সরকার নতুন করে কোন তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারেনি। অতএব ভাতা কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে (১৯৭৭-২০১১) এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কার্ড (Employment Exchange Card) বা নাম নথিভুক্তকরণ ছিল চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই কার্ডের মাধ্যমে বেকার যুবকরা সরকারি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ পেতেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর কার্ড নবায়ন (Renewal) করতে হতো।
বামফ্রন্ট আমলে এক্সচেঞ্জ কার্ডের মাধ্যমে বেশিরভাগ সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ কার্ড থেকে নাম স্পনসর করা হতো। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম নথিভুক্ত থাকা, অথচ চাকরি না পাওয়া যুবকদের জন্য ৫০০ টাকা (তৎকালীন সময়ে) ‘বেকার ভাতা’র ব্যবস্থা ছিল।কার্ড রিনিউ করে চাকরির জ্যেষ্ঠতা বজায় রাখতে হতো।
বামফ্রন্ট সরকারের সময় প্রথম বেকার ভাতা দেওয়া শুরু হয় তবে সেটা সঠিক পরিকল্পনা করে, এমনটা নয় যে কেউ চাকরি করছে তার সাথে যুব সাথী প্রকল্প পাচ্ছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময় কেউ চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ভাতা পেত। এমনকি কোন যুবক কিংবা যুবতী কারখানা বা অন্য কোন জায়গা থেকে কাজ হারালে তাকেও ভাতা দেওয়া হতো। বামফ্রন্ট সরকার মানুষকে ভাতা দিতো, সেটা তাদের অধিকার হিসেবে অপরদিকে তৃণমূল সরকার মানুষকে ভাতা দেয় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। এই দুর্নীতিগ্রস্ত, অপারদর্শী, গুন্ডাবাজ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে চলবে রাস্তায় নেমে।
“প্রকল্পের ফানুস চাই না আর
ভাতার টাকায় নেইকো মান
চাইছি আমি স্থায়ী চাকরি
দাওগো কর্মের সংস্থান।”

