রোহিত, সুদীপ্ত, আনিস, নাজিব — রাষ্ট্র এদের ভয় পায়
কমরেড সুদীপ্ত গুপ্তের শহীদ দিবসে
কলকাতায় এসে খোলামেলা আলোচনায়
রোহিত ভেমুলার মা রাধিকা ভেমুলা
প্রশ্ন: আজ ২রা এপ্রিল কমরেড সুদীপ্ত গুপ্ত’র শহীদ দিবস। আজ এই মুহূর্তে আমি কথা বলছি এক সন্তানহারা সংগ্রামী মায়ের সাথে। হয়তো বলা একটু কঠিন হবে তবু জানতে চাইবো ‘‘রোহিত ভেমুলা’’ নামটা শুনতেই ঠিক কি মনে পড়ছে?
উত্তর: রোহিতও -সুদীপ্ত’র মতোই একজন লড়াকু ছাত্র ছিল এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে ওকে খুন হতে হয়। আমাদের সমাজের সামাজিক বৈষম্য, সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য, প্রতিবাদের জন্য রাষ্ট্র ওকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে, তাই আজ রোহিতকে আমরা হারিয়েছি। সুদীপ্তও আমার আরেক সন্তান। ঠিক এই একই লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছে ও।
প্রশ্ন: একজন মা তথা একজন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে রোহিত
ভেমুলার সংগ্রাম প্রসঙ্গে জনসাধারণকে কি বার্তা দিতে চান?
উত্তর: রোহিত ভেমুলাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা আমরা দেখতে পেয়েছি। এই দেশের ফ্যাসিস্ট শক্তি সেই আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার সর্বত চেষ্টাচালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত রাখার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। রোহিত হচ্ছে তাদেরই একজন যে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে এটা বুঝতে পেরেছিলো। এখনো এই দেশের হাজার হাজার রোহিত রোজ নানা ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আজকের ভারতীয় সমাজে, সামাজিক বৈষম্যের অস্তিত্ব এখনও কতটা প্রকট সেটা বুঝতে হবে আমাদের এবং তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে।
প্রশ্ন: এই মুহুর্তে ভারত খুবই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন দিন দিন বেড়ে চলেছে এই আগ্রাসনকে প্রতিহত করা সম্ভব কিভাবে?
উত্তর: এটা সত্যি যে, বিজেপি জাত-ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে কিছুটা সক্ষম হয়েছে। ওদের “divide and rule” এই রাজনীতি আজ সফল। আমরা দেখতে পেয়েছি নানা জাতির মধ্যে লড়াই – দাঙ্গা, যেমন মালা আর মালদিগা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। আমার মনে হয় এই সমস্যার একটাই সমাধান হতে পারে, সাধারণ মানুষকে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে এক হতে হবে এবং এই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

প্রশ্ন: গোটা দেশজুড়ে চলা অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে আপনাকে। এ দেশের সকল শোষিত নিপীড়িত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কি করা উচিত বলে মনে হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, ঠিকই এই মুহুর্তেচলা নানা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছি। এর প্রধান কারণ হলো ভারতের সর্বত্র ছাত্র -যুবরা আক্রান্ত, বিশেষত রোহিতের ঘটনার পরে তা আরো বেড়েছে। সবজায়গায় গিয়ে আমি একটাই কথা বলি, সমস্ত প্রগতিশীল সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
প্রশ্নঃ এখন আমরা প্রায়ই দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশে দলিতরা আক্রান্ত হচ্ছে। আপনার কি মনে হয় RSS এর নেতৃত্বেই কি এমন ঘটনাগুলো ঘটছে?
উত্তরঃ একদমই তাই। বিজেপি-আরএসএস কখনোই চায় না দলিত ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চ-শিক্ষায় শিক্ষিত হোক কারণ তারা পড়লে-জানলে তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করবে। আমি মনে করি দলিত সম্প্রদায়ের ওপর এই আক্রমণ ফ্যাসিস্ট শক্তির দ্বারাই নেমে আসছে।
প্রশ্ন: বলাই বাহুল্য আপনার বিজেপি সরকার সম্পর্কে যথেষ্ট ধারনা রয়েছে, বাংলায় তৃণমূল সরকার কে নিয়ে আপনার কি বক্তব্য?
উত্তর: এই তৃণমূল সরকারের হাতেই বাংলার এক ছাত্র সুদীপ্ত’কে খুন হতে হয়েছে। এই ধরনের আক্রমণ কিন্তু পরোক্ষভাবে ফ্যাসিস্টসুলভ আচরণকেই ইঙ্গিত করে। তাই আমি বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যে বিশেষ ফারাক খুঁজে পাইনা।
প্রশ্ন: রোহিত ভেমুলা, কমরেড সুদীপ্ত, আনিস খান এরা প্রত্যেকেই নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার জন্য প্রাণ হারিয়েছে। এই গণতন্ত্রই কি আমরা চেয়েছিলাম? কেন বারবার ছাত্র ছাত্রীদের ওপর আক্রমণ নেমে আসছ?
উত্তর: রোহিত, সুদীপ্ত, আনিস, নাজিব প্রত্যেকেই আমাদের দেশের সংবিধান সম্বন্ধে যথেষ্ট অবগত ছিল এবং সেই কারণেই তারা বারবার রাষ্ট্রকে, সরকারকে প্রশ্ন করেছে। ওদের এই প্রশ্ন করার স্বভাবটাকেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভয় পায়, তাই দেশের তথা রাজ্যের সরকারও ওদের প্রশ্নগুলোকে ভয় পেয়েছে আর এই কারণেই বারবার ছাত্র সমাজকে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রশ্ন: আমার শেষ প্রশ্ন, এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের জন্য কী শপথ নেওয়া প্রয়োজন?
উত্তর: প্রথমত, দলিত-বহুজন সহ সমাজে পিছিয়ে পরা সকল জাতির মানুষের কাছে শিক্ষার আলোর পৌঁছে দিতে হবে। প্রত্যেকের শিক্ষার অধিকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই প্রত্যেকের ঘরে একটা করে আম্বেদকর বেড়ে উঠবে। আর আবারও বলছি সমস্ত প্রগতিশীল সংগঠনকে কে জোটবদ্ধ হয়ে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিপরীতে এক শক্তিশালী বিরোধী শক্তি তৈরি করতে হবে, তবেই এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিনাশ সম্ভব।

