ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে গ্রাম বাংলা সাজাবো


ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে গ্রাম বাংলা সাজাবো
দীপ্তজিৎ দাস

“শোভা বল’, স্বাস্থ্য বল’, …. আছে বা না আছে
বুকটি তবু নেচে ওঠে এলে গাঁয়ের কাছে;
ঐখানেতে সকল শান্তি, আমার সকল সুখ
বাপের স্নেহ, মায়ের আদর, প্রিয়ার হাসিমুখ।
তাইতো আমার জন্মভূমি স্বর্গপূরী
যেথায় আমার হৃদয়খানি গেছে চুরি।”

বাংলার গ্রাম। গভীর দ্যোতনায় বাংলার গ্রামই বাংলার মুখ। বাংলার গ্রাম মানে নকশী কাঁথার মাঠ। ভূস্বামীর কাছে দুই বিঘা জমির অধিকার হারিয়ে, উপেনের বুকফাটা কান্নার সুর বাংলার গ্রাম। গাঁয়ের সাধারণ কৃষকের হয়ে বেনী ঘোষাল আর রমার সাথে রমেশের দ্বন্দ্বের প্রতিবিম্ব পল্লীসমাজ। গ্ৰাম বাংলা মানে আলপথ বেয়ে আদিবাসী পাড়ার দিকে অপু, দুর্গার ছুট। করালির জ্ঞান আলোকে কাহার পাড়ার সনাতন বিশ্বাস ভাঙার প্রতিচ্ছবি বাংলার গ্রাম। বাংলার গ্রাম মানে বিদেশের মোহ ভেঙে স্নেহ ছায়ায় শশী ডাক্তারকে বেঁধে ফেলা। সাহিত্য সমাজের দর্পণ। বাংলা সাহিত্যেই এভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে বাংলার গ্রামের কথা।বাংলায় এখন গ্রাম সরকার নির্বাচনের দামামা। এই নির্বাচনই ঠিক করে দেবে আগামী ৫ বছর গ্রামবাংলার অভিমুখ।

ভারতে প্রথম গ্রামে স্বশাসিত সংস্থা চালু হয় ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। তখন ছিল চৌকিদারি পঞ্চায়েত। পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালের লর্ড রিপন গ্রাম ও শহরে দুই ধরনের সংস্থা তৈরি করেন। একটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড অপরটি ইউনিয়ন কমিটি। পরবর্তী সময়ে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে এই ব্যবস্থার বেশ কিছু রদবদল হয়। তবে প্রধানত এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসকের হয়ে কর সংগ্রহ এবং গ্রামের রাজত্ব কায়েম রাখা। সংস্থার প্রতিনিধিদের অধিকাংশই পরোক্ষ নির্বাচনে ভর্তি করা হতো। স্বাধীনতা সংগ্রামে গ্রাম ভারতের আগুয়ান ভূমিকা ছিল। কিন্তু গ্রামের সেই সংগ্রামী মানুষরা কখনোই ক্ষমতার আলোকবর্তিকার সংস্পর্শে আসতে পারেননি।

স্বাধীনতার পর দেশের চিত্র খুব একটা বদলায়নি। দেশের মধ্যে বাংলার গ্রামগুলি তখনো ছিল অনুন্নয়নের রোল মডেল। ক্ষুধা, জড়া, ব্যাধি ,মহামারী ছিল গ্রাম বাংলার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গ্রামের পঞ্চায়েত তখনও ছিল জমিদার ,জোতদারদের হাতে। তাদের হাতে সাধারণ মানুষের শোষিত হওয়াই ছিল স্বাভাবিকতা। জীবন যন্ত্রণার লড়াইয়ে প্রত্যেকদিন ধুঁকতে থাকা অসহায় মানুষগুলো নিজেদের অবলম্বন হিসেবে পেয়েছিল লাল ঝান্ডাকে। উত্তাল ষাট সত্তরের দশকে লাল ঝাণ্ডার ডাকেই আন্দোলিত হয়েছে গ্রাম বাংলা। বাংলার গ্রাম সব হারানোর হিসাব পেতে উঠে এসছে মহানগরের রাজপথে। কেরোসিনের দাবিতে আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের আন্দোলন, ১৯৫৯ এবং ১৯৬৬’র রক্তমাখা খাদ্য আন্দোলন গ্রাম বাংলাকে চিনিয়ে দিয়েছিল প্রকৃত বন্ধুকে। সেই সংগ্রামের সড়কেই প্রথম এবং দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু গ্রামবাংলা তখনও স্বাবলম্বী হতে শেখেনি।

২১ শে জুন ১৯৭৭। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের চাকা গড়াতে থাকলো অন্য ধারায়। নবজাগরণের বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হলো বামফ্রন্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন জ্যোতি বসু। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরই জানিয়ে দিলেন কেবল রাইটার্স থেকে নয় সরকার পরিচালিত হবে প্রতিটা গ্রাম-মহল্লা থেকে। কথা নেমে এলো বাস্তবের মাটিতে। ১৯৭৮ সালের ৪ ঠা জুন অনুষ্ঠিত হলো প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন। পরবর্তী সময় সাক্ষী থাকলো নয়া ইতিহাসের। বামফ্রন্ট সরকার নামক আশ্চর্য প্রদীপের সংস্পর্শে বদলে গেল গ্রাম। মাথা তুলে দাঁড়ালো সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষ। কৃষক পেল নিজের জমি, ফসলের মূল্য। শ্রমিকের নিশ্চিত হল সামাজিক সুরক্ষা। পিছিয়ে থাকা ঘরের ছাত্রছাত্রীরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। নারীরা পেল সমাজব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকার। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচর্যা পরিচালিত হলো নিজেদের শ্রেণীর প্রতিনিধির মাধ্যমে। কল্পনা নয়, ঘাত প্রতিঘাতের রুক্ষ মাটিতেই আবেগের বিচ্ছুরণ। ম্যাজিসিয়ানের নাম লাল ঝান্ডার সরকার।
তৃণমূল আমলে গত ১০ বছরে আমাদের সোনার বাংলায় রিক্ততা, ধূসরতার প্রতীক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসি মুখগুলো আজ ভুলে যাচ্ছে জীবনের জয়গান। গ্রামে গ্রামে পেল্লাই বাড়ি হাঁকাচ্ছে সুফিয়ান, ভাদু শেখরা। পক্ষান্তরে মাথার ছাঁদটুকু জুটছে না সাধারণ মানুষের। যেন দিদির তরতাজা ভাইদের গোলামী করাই তাদের একমাত্র পরিণতি। চাষের ক্ষেতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দালাল ফড়েরা। ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের অবনমনে ঝিমিয়ে পড়েছে গ্রাম বাংলার অর্থনীতি। সরকারি অবহেলায় বন্ধের মুখে গ্রাম বাংলার স্কুলগুলো। এক দুঃশাসনের রাজত্বে স্বপ্নের সলিল সমাধি প্রত্যেকদিন গ্রাম বাংলার ভবিতব্য।

লাল ঝান্ডার কাছে পঞ্চায়েত ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অবলম্বন। বিকল্প সুযোগের মাধ্যমে প্রজন্মকে শক্ত ভীতের উপর দাঁড় করানোর পন্থা হিসেবে পঞ্চায়েতকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল বামপন্থীরা। তাই ৩৪ বছরের পঞ্চায়েত মানে পঞ্চায়েতের নিজস্ব স্কুল। সেই স্কুলে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া গ্রামের মানুষের। কৃষিতে উন্নত সেচ ব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটিয়ে ফসলে নির্ভরশীলতা দেওয়া। সমবায়ের মাধ্যমে ফসলের পণ্যায়ন। স্বনিযুক্তি গোষ্ঠীর মাধ্যমে মহিলাদের আর্থিক স্বাবলম্বীতার পথ প্রশস্ত করা। মনুবাদের প্রচারকদের মুখে ছাই লেপে জঙ্গলমহলের কুলটিকারিতে দিনের পর দিন কেবল মহিলাদের দ্বারা পঞ্চায়েত চালনা। গ্রাম বাংলা নতুন উদয়ের পথ দেখেছিল সেই পঞ্চায়েতের হাত ধরে।

তৃণমূলের কাছে পঞ্চায়েত মানে লুঠে খাওয়ার জায়গা। উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ ফ্রেম শিফট মিউটেশন ঘটিয়ে নিজেদের সম্পত্তি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে পঞ্চায়েতকে দাঁড় করিয়েছে পিসি ভাইপোর অনুগামীরা। গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বামপন্থীদের বহু লড়াইয়ের ফসল একশ দিনের কাজ দু বছরের বেশি বন্ধ এ বাংলায়। শাসক দলের অগাধ লুঠতরাজের মাসুল দিয়ে নিজেদের অর্থনীতির মৃত্যু দেখছে গ্রাম বাংলার মানুষ। পাশাপাশি বামপন্থীরা ২০১৩ থেকেই এ বিষয়ে সরব হলেও বিগত সময় কোন হস্তক্ষেপ করেনি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তাদের কাছে মানুষ কেবল ভোট ব্যাংকের উপাদান। সাধারণ মানুষের মাথা গোজার ঠাই আবাস যোজনার টাকা পকেটে ভরে আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে তৃণ-নেতাদের। সামান্য টেন্ডার থেকে পরিচালন ব্যবস্থা পঞ্চায়েতের প্রতিটি স্তর জুড়ে দুর্নীতির বিষ বপন করেছে তৃণমূল রাজ। প্রায় ১০ টি জেলার জেলা পরিষদের খরচের কোন হিসেব তাই গত তিন বছর ধরে জমা পড়েনি পঞ্চায়েত দপ্তরের কাছে। তৃণমূলের কাছে পঞ্চায়েত মানুষের ক্ষমতায়নের নয়, নিজেদের কাটমানি আদায়ের মেশিন।

স্বভাবতই পঞ্চায়েত ভোট প্রক্রিয়ায় আমূল পার্থক্য রয়েছে দুই আমলে। বামেদের কাছে পঞ্চায়েত ছিল গণতন্ত্রের কন্ঠস্বর। সমাজের নিচু স্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রের আশ্বাস পৌঁছে দেওয়াই ছিল পঞ্চায়েতের অন্যতম লক্ষ্য। সেই পথে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে টেনে আনতে চেয়েছিল। তাই দিনের পর দিন মানুষ বুক ফুলিয়ে ভোট দিয়েছে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার জন্য পঞ্চায়েতে। রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকেনি, উন্নয়ন পরিচালিত হয়েছে সাধারণ মানুষের অগ্রগতির স্বার্থে। ১৯৭৮ সালে প্রথম নির্বাচনে রাজ্যে ৫৫ হাজার ৯৫১টি কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন ১৭৪৮৩ জন বিরোধী প্রার্থী অর্থাৎ ৩১.২৫ শতাংশ। দীর্ঘদিন পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত দখলে থেকেছে বিরোধীদলের। এমনকি ভরা বাম জমানায় মালদা, মুর্শিদাবাদের জেলা পরিষদ চালিয়েছে কংগ্রেস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা প্রশাসন চালিয়েছে তৃণমূল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা যতবার সেই জেলা সফরে গেছেন ওই দলের প্রতিনিধিদের নিয়েই প্রশাসনিক বৈঠক করায় উদ্যোগী হয়েছেন। তাদের দল ভাঙিয়ে নিজের দিকে টানার প্রয়াস নিতে হয়নি। জেলা পরিষদে গঠিত হতো জেলা কাউন্সিল। তার সভাপতির দায়িত্বে থাকতেন বিরোধী দলের কোনো জয়ী সদস্য। সেই কাউন্সিলের দায়িত্ব থাকতো সমস্ত পঞ্চায়েতের খরচের হিসাব দেখভাল করা। চুরি, দুর্নীতির কণাও স্পর্শ করতে পারেনি বাম পরিচালিত পঞ্চায়েতকে। এই ব্যবস্থা তারিফ করেই রাজীব গান্ধী পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতকে গোটা দেশের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেন।

গণতন্ত্র নামক শব্দ অভিধানে নেই তৃণমূল কংগ্রেসের।আদ্যন্ত তোলাবাজ, লুম্পেন দ্বারা পরিচালিত তৃণমূল চায় পঞ্চায়েতকে পেশিশক্তির আস্ফালন দ্বারা পদদলিত করতে। ২০১৩ সালের রক্তক্ষয়ী পঞ্চায়েত আমাদের স্মরণে আছে। মনোনয়নে বাধা, প্রবল সন্ত্রাস উপেক্ষা করেও প্রায় ৩২ ভাগ আসনে জয়ী হয়েছিল বামফ্রন্ট। চারটি জেলা পরিষদ গঠন করেছিল তৃণমূল বিরোধীরা। কিন্তু গণতন্ত্রের লেশমাত্র রাখতে চায় না ওরা। বিরোধী কণ্ঠস্বর থাকা মানে ওদের লুঠের বিরুদ্ধে প্রত্যেকদিন প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া। তাই ঘোড়া কেনাবেচার মতো মানুষের রায়কে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের দিকে টেনে আনার নির্লজ্জ প্রয়াস চালিয়েছিল ওরা। জাহাঙ্গীর আলমের মত যারা আসতে চায়নি, সরাসরি খুন করে দেওয়া হয়েছিল তাদের। ২০১৮, সন্ত্রাস নেমে এল আরও দাঁত,নখ বার করে। মনোনয়ন দিতে গিয়ে খুন হয়ে গেলেন বিরোধী প্রার্থীরা। ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতল তৃণমূল। কিন্তু সেই পঞ্চায়েতের গ্রাম সভা হলো না। লাল ঝাণ্ডার পঞ্চায়েত মানে গ্রাম সভার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই গ্রামের গতিশীলতা ঠিক করা। লুঠের কারবারীরা ব্যস্ত থেকেছে আখের গোছাতে। গ্রাম সংসদ তুলে পঞ্চায়েতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমলাতন্ত্র। এমন ব্যবস্থা কেই টিকিয়ে রাখতে চায় ওরা। বীরভূমের উন্নয়ন বিহারে গড়াগড়ি খেলেও, চোপড়ায় গুলি ছোঁড়ে হামিদুলের বন্দুক বাহিনী। ভাঙ্গরে ব্লক অফিস আটকে বসে থাকে তাজা নেতা আরাবুলরা। অন্ধকারের মাঝেও দেখা যাচ্ছে আলোর ছটা, প্রবল সন্ত্রাসের মাঝেও প্রতিবাদ প্রতিরোধ করেই ময়দানে টিকে আছেন বাম এবং সহযোগী দলের প্রার্থীরা। লড়াই এবার সম্মুখ সমরে।

বাম সরকারের দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বদলে দিয়েছিল গ্রাম বাংলার হালচাল। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে সাধারণ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল জমির অধিকার। ৩৪ বছরে প্রায় ১৩ লক্ষ ১৪ হাজার একরের বেশি জমি খাস করা হয়েছিল। যা সারা দেশের কুড়ি শতাংশ। অথচ বাংলার কৃষিজমির পরিমাণ গোটা দেশের মাত্র ৩ শতাংশ। যৌথ পাট্টার অধিকারী হয়েছিল ৬ লক্ষ ৩ হাজার পরিবার। জমিতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল নারীর অধিকার। নারীর ক্ষমতায়নে এক ঐতিহাসিক মাইলস্টোন। এই প্রগতিশীল পদক্ষেপই সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিল গ্রাম বাংলাকে। বেড়ে গিয়েছিল খাদ্যশস্য উৎপাদন। ১৯৭৬-৭৭ সালে যে রাজ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭৪ লক্ষ মেট্রিক টন, ২০১০-১১ সালে তাই এসে দাঁড়ায় ১৭০ লক্ষ মেট্রিক টনে। খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য উদ্বৃত্ত খাদ্য সরবরাহ করত পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলোতে। একদিকে যেমন মিটেছিল পেটের খিদে, পাশাপাশি আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়িয়েছিল চাহিদা। গ্রামীণ দারিদ্রতা ৭৩.২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছিল ২১ শতাংশে। জাদু কাঠি লাল ঝান্ডা।
মমতা ব্যানার্জি সরকারের কাছে ভূমি সংস্কার হলো জমি ডাকাতি। তেমনই বলছে ২০১১ সালের ১৮ই অক্টোবর রাজ্য সরকার দ্বারা প্রকাশিত নোটিশ। গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি এখন সংকোচনের পথে। বিপরীতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে কৃষির উপর। মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে লুঠে বেড়াচ্ছে দালাল, ফড়ে, মহাজনরা। ভোটের দিন এরাই তৃণমূলের ফায়ারিং আর্মি। তাদের উৎপাতে সাধারণ কৃষককে ফসল বেচতে হচ্ছে ন্যায্য মূল্যের থেকে অনেক কম দরে। মাছ, সবজির চাষে শীর্ষস্থান হারাচ্ছে বাংলা। এ রাজ্য কৃষকের মাসিক গড় আয় জাতীয় গড় আয়ের থেকে প্রায় চার হাজার কম। এই পরিবর্তনে কি চেয়েছিল বাংলার মানুষ? গ্রাম বাংলা তাই মাথা তুলছে পাল্টে দেওয়ার জন্য।

বামপন্থীরা শিক্ষাকে মনে করত সমাজ গঠনের পিলসুজ। গ্রামের মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করে তাদের লড়াইয়ের রসদ জুগিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। শিক্ষাকে অবৈতনিক করার মাস্টারস্ট্রোক বদলে দিয়েছিল গ্রামীণ সমাজের ভারসাম্য। গ্রামাঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠেছিল একের পর এক সরকারি স্কুল। পঞ্চায়েতের উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল শিশু এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র। রাজ্যজুড়ে প্রায় ১৬ হাজার শিশু শিক্ষাকেন্দ্র এবং ২০০০ এর বেশি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র চালাতো পঞ্চায়েতগুলো। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল সংখ্যালঘু শ্রেণীর প্রতিনিধি। শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নিযুক্ত ছিলেন প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক। সাকুল্যে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লক্ষ। এই স্কুলগুলো নিয়েই আলাদা পর্ষদ করার প্রস্তাব এনেছিল বামফ্রন্ট সরকার যা পরবর্তীকালে তৃণমূল সরকার বাতিল করে দেয়। সার্বজনীন শিক্ষার মাধ্যমে ৩৪ বছরে বাংলা সাক্ষরতার হার ৩৮.৮৬ শতাংশ থেকে বের হয়ে গিয়েছিল ৭৭ শতাংশ। ৯৬ শতাংশ শিশুকে আনিযয়েছিল মিড ডে মিলের অধীনে। ৩৪ বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখ থেকে বের হয়েছিল সাড়ে দশ লক্ষ। শিক্ষাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিয়ে গ্রাম বাংলার সমাজ গঠনের মেরুদন্ড এভাবেই গড়ে দিয়েছিল বামপন্থীরা।
তৃণমূল চায় না সাধারণ ঘরের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার আলো পাক। বদলে তাদের কিছু উপভোগ্য বস্তু ছুড়ে দিয়ে বাইক বাহিনীর গুন্ডাতে পরিণত করাই লক্ষ্য ওদের। তাই সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা পঙ্গু করে গ্রাম সমাজের কোমর ভেঙে দিয়েছে লুটেরারা। ১২ বছরে বন্ধ হয়েছে সাত হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৮২০৭টি স্কুলের তালিকা প্রকাশ করেছে স্কুল দপ্তর যাদের ছাত্র সংখ্যা ৩০ এর কম। যেকোনো দিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। উৎসশ্রীর নামে ষোল হাজারের বেশি শিক্ষক গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছেন শহরে স্কুলে। মাশুল দিচ্ছে গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা। বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলোর অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলের। করোনা অতিমারির থাবা, ডিজিটাল ডিভাইডের মাধ্যমে স্কুলছুট করেছে অজস্র ছাত্রছাত্রীকে। এর প্রাবল্য বেশি গ্রামে। এক বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে চার লক্ষ। ওরা চায়না আমাদের আগামী প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে শিখুক। শিক্ষার সর্বনাশের মাধ্যমে স্বপ্নগুলো ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে ওরা। তাই এটাই সময় প্রতিরোধের ব্যারিকেড গড়ার।

ভূমি সংস্কার সেচ ব্যবস্থার অত্যাশ্চর্য উন্নয়নের মাটিতেই বামফ্রন্ট সরকার স্বপ্ন দেখেছিল শিল্পায়নের। অঙ্গীকার ছিল উন্নততর বামফ্রন্টের। কৃষির ভিতে নতুন শিল্পকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে আগামীর ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিল লাল ঝান্ডা। ২০০৩ সালের পঞ্চায়েতে নির্বাচনী ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পকে প্রাধান্য দেওয়ার। তার উপর ভিত্তি করেই বড় শিল্পকে আকর্ষণ করতে চেয়েছিল বামপন্থীরা। পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পর্যটন সমবায়ের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রচেষ্টায় ব্রতী হয়েছিল বাম পঞ্চায়েতগুলো। ২০০৪ থেকে ২০১১, সারাদেশে কর্মসংস্থানের চল্লিশ শতাংশ হয়েছিল এই বাংলায়। যার সিংহভাগ সুযোগ পেয়েছিলেন গ্রাম বাংলার যুবক যুবতীরা। সিঙ্গুরে টাটার কারখানা, নয়াচরে কেমিকাল হাব ,শালবনীতে জিন্দালদের প্রজেক্ট, রঘুনাথপুরে স্টিল প্লান্ট বাস্তবায়িত হলে বদলে যেত গ্রাম বাংলার পরিস্থিতি। বাজ পাখির কলিজার স্বপ্ন সেদিন ধুলিস্যাৎ হয়েছিল তৃণমূল বিজেপির চক্রান্তে। পরিবর্তনের বাংলা আজ তাই নিঃস্ব বাংলা।

তৃণমূলের পঞ্চায়েত মানে গ্রামে গ্রামে ভানু বাগের বোমার কারখানা। তোলাবাজির বাংলায় বোমা-গুলি’ই শিল্প। মানুষ পেটের টানে কাজ করতে যাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তোলাবাজদের বোমা কারখানায় বিস্ফোরণে জীবন হারিয়ে আকাশদের চিকেন রান্নায় মসলা ছড়িয়ে দিতে আর ফিরবে না মা মাধবী বাগ। স্বপ্নের বাংলা তৃণমূল রাজত্বে বিভীষিকার বাংলা। বড় শিল্পে চাকরির আশা করেছিল গ্রাম বাংলার যে যুবকরা, শিল্পতালুক জুড়ে ব্যবসা সাজানোর পরিকল্পনা করেছিল যে ছাত্রছাত্রীরা জীবনের দায়ে তারা আজ পরিযায়ী শ্রমিক। করোনা অতিমারী বা বালেশ্বরে মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনা উন্মোচিত করেছে গ্রাম বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি। বন সহায়কের ৫০ টি পদের জন্য আবেদন করছেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি স্নাতকোত্তর বা গবেষক ছাত্ররা। আমাদের লজ্জা! একটা প্রজন্মের জীবন অমানিশায় মিশিয়ে দেওয়ার এই অপরাধ কখনো ঝেড়ে ফেলতে পারে না তৃণমূল। জনরোষের বিস্ফোরণ কাকে বলে ওদের তা দেখিয়ে দেওয়ার সুযোগ এই পঞ্চায়েত নির্বাচন।

মানুষের স্বাস্থ্যের কথাও ভেবেছিল বামপন্থী পঞ্চায়েত। সার্বিক সমাজের উন্নতির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য যে এক বড় চ্যালেঞ্জ তা বুঝতে পেরেছিল বামপন্থীরা। তাই পঞ্চায়েত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলি করোনা অতিমারি র সময় সাধারণ মানুষের ভ্যাকসিন দেওয়ার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিষেবার মাধ্যমে কমানো গেছিল মৃত্যুহার, প্রসূতি মৃত্যুর হার। তৃণমূল আমলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢক্কা নিনাদের তলায় আসল চিত্র কঙ্কালসার। পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবে প্রাণঘাতী হয় গভীর ডেঙ্গুর মতো মহামারী। দালাল চক্রের শিকার হয়ে সন্তানের নিথর দেহ ব্যাগে ভরে বাড়ি ফেরেন পরিযায়ী শ্রমিক অসীম দেবশর্মা। রক্তাক্ত হয় আমাদের বিবেক। বদলে দেওয়ার সুযোগ এই পঞ্চায়েত।
লাল ঝান্ডার লড়াইয়ের পঞ্চায়েতই ছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে মানুষের সমুচিত জবাব। সম্প্রীতি, ঐক্যের বাংলায় বিভিন্ন ভাষা ধর্মের মানুষ বাস করেছে একসাথে এক গ্রামে। একসাথেই পালন করেছে নিজের নিজের ধর্মের উৎসব। দাঙ্গা কি জিনিস সাধারণ মানুষ জানত না। কিন্তু দাঙ্গাই আজ হাতিয়ার লুঠেরাদের। নিজেদের লুঠ বজায় রাখতে প্রয়োজন মানুষের সংহতিকে দুর্বল করা। মানুষের লড়াইকে প্রতিহত করার জন্যই ওরা মুছে দিতে চায় বামপন্থাকে। তাই বিভেদ, বিদ্বেষের ধুয়ো তুলে দাঙ্গার আগুনে হাত পোড়াতে বাধ্য করে সাধারণ মানুষকে। বিভাজনের রাজনীতিতে তাই প্রাসঙ্গিক কড়ে তুলতে চায় দাঙ্গাবাজ বিজেপিকে। কিন্তু পঞ্চায়েতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন পার্থক্য নেই বিজেপি আর তৃণমূলের। কর্পোরেট সেবক মনুবাদী বিজেপিও চায়না নীচু তলার মানুষ উঠে আসুক ক্ষমতার অলিন্দে। তাই তাদের কাছেও পঞ্চায়েত গণতন্ত্র হত্যার উপকরণ। বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে পঞ্চায়েতে যখন ৪০ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় শাসকদলের সমর্থিত প্রার্থী, ত্রিপুরায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮৬ শতাংশ আসনে জয়ী হয় বিজেপি প্রার্থীরা তখনই উন্মোচিত হয় ওদের স্বরূপ। রাজস্থান ,হরিয়ানায় বিজেপির হাতেই পঞ্চায়েত আইন এমনভাবে সংশোধিত যেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষের পঞ্চায়েতে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। ওদের নীতি এ রাজ্যে কায়েম রেখেছে তৃণমূল ।তাই পঞ্চায়েত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির কোন বক্তব্য নেই। অমিত শাহরা বাংলা সফরে ৩৫ টা লোকসভা আসনের কথা বললেও চুপ থাকেন পঞ্চায়েত নিয়ে। গুলি বন্দুকের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত হয়েও লড়াই করে যখন বামপন্থীরা পঞ্চায়েত ভোটে শামিল, বিজেপিকে ছুটতে হয় আদালতে নির্বাচন বাতিল করার জন্য। আসলে লড়াই এর ল্যান্ডস্কেপে দুটোই পক্ষ একদিকে তৃণমূল-বিজেপি অন্যদিকে মানুষের লড়াইয়ের লাল ঝান্ডা।

এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন তাই শপথের। লুঠেরাদের হাঁটিয়ে গ্রামবাংলা কে নতুন করে সাজানোর শপথ নেওয়ার। লড়াইয়ের শপথ নেওয়ার সময় এই নির্বাচন। গ্রাম বাংলাকে সর্বস্বান্ত করা নব্য রায়তদের উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার এটাই সুযোগ। বৈভবের নবজোয়ারকে দেখিয়ে দেওয়া প্রয়োজন স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ার কাকে বলে। মোক্ষম সময় বাংলার মাটিতে মানুষের জীবনের দাবিগুলো চ্যাম্পিয়ন করে দেশজুড়ে বিভাজনের রাজনীতির গালে সপাটে থাপ্পড় মারার। লড়াই এর ময়দানে কমরেডরা রক্তাক্ত হচ্ছেন আবার পাল্টা প্রতিরোধও করছেন। কাজের দাবির অমর শহীদ মইদুল ইসলাম মিদ্দার বন্ধু তৌহিদুল ইসলামরা ভোটে দাঁড়িয়েছেন শত হুমকিকে উড়িয়ে দিয়ে। চোপড়ায় গুলিবিদ্ধ সাথীদের পাশে দাঁড়িয়েই কমরেডরা শপথ করছেন ‘আমরা লাল ঝান্ডা ধরি ,আমরা লড়বো’। এই স্পিরিট নিয়েই এবার বাংলা জুড়ে লড়ছে মেহনতী মানুষ। গ্রামবাংলায় গণতন্ত্রের উৎসবে তৃণমূলের হাত ধরে যখন নেমে আসে আজকের কুরুক্ষেত্র তখন ওদের রথের চাকা বসিয়ে দেওয়াটাই সময়ের কর্তব্য। তাই ঝড় উঠুক স্লোগানে –
‘ লড়ব এবার বুক চিতিয়ে, লুঠেরাদের করব বিদায়
মাটির গন্ধে, নাড়ির টানে, গ্রাম ফিরছে লাল পতাকায়।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *