সেতু: বিচ্ছিন্নতা ভাঙার স্বপ্ন
ঋত্বিক গোস্বামী
আধুনিক সমাজের সবথেকে বড়ো ট্রাজেডি নাকি বিচ্ছিন্নতা। জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই নাকি ট্রেন্ড। নাকি এটা আগেও ছিল? রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা – “নদীর এপাড় কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস/ ওপাড়েতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।“ সত্যিই তো! এপাড় কি কখন খোঁজ নিয়েছে ওপারের? ওপাড়ও তো পারতো! তাহলে জানলো কি করে ওপাড় সমস্ত সুখ শুষে নিয়েছে! কে জানালো? এই বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙলেই দেখতে পেতো দুইপাড়ের সমস্যাই আসলে এক। উৎসও এক। বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই শিখিয়েছে যে সমস্ত সুখ আসলে টেনে নিচ্ছে অন্যপাড়। একতাকে ভাঙাই যাদের উদ্দেশ্য।
সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদ ভয় পায় মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে। তাই হয়তো ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’টা নেসেসিটি হলেও ‘একলা ঘর’কে নিজের দেশ বানানোর লাক্সারীকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয় গানে-সিনেমায়-মিডিয়ায়। শিক্ষা-কর্মসংস্থানের দাবিকে ভুলিয়ে দেওয়ার সর্বগ্রাসী চক্রান্ত চলে এই ট্রেন্ডকে কাজে লাগিয়েই। তাই ৮২০৭ খানা সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুর্ঘটনা (পড়ুন চক্রান্ত) প্রাইম টাইমে জায়গা পায় না। প্রশ্ন করার মানসিকতাকে নাম দেয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। প্রাইম টাইমে হেডলাইন হয় – “ইউনিভার্সিটির ছাত্র মানেই সন্ত্রাসবাদী।“ নিজেদের মত প্রকাশের অধিকার চাইতে গেলে পাওয়া যায় শিক্ষামন্ত্রী গাড়ির তলায় চাপা পরে যাওয়ার সুবর্ণ অনুভূতি।
তবুও দুইপাড়ের মানুষ সেতু বানায়। বিচ্ছিন্নতাকে জিইয়ে রাখার যে ষড়যন্ত্র দিনরাত শাসক গোষ্ঠী করে চলে মিডিয়া মারফত, তার বিরুদ্ধস্বরও গুঞ্জিত হয়। মিডিয়া যা দেখায় না, তা আমাদের দেখতে হবে। সেতু তৈরীর ম্যাটেরিয়ালস খুঁজতে হবে। এই চিরন্তন বিচ্ছিন্নতার সমস্যার প্রতিষেধক একমাত্র মানুষ। দৈনন্দিন জীবনে শোষিত হতে হতে ক্লান্ত মানুষের সেতু তৈরির এই আপ্রাণ প্রচেষ্টাকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে তুলে ধরার চেষ্টা করি।
বিগত ৮ই মার্চ। নাগেরবাজারে অবস্থান চলছিল মিছিল শেষে। ওদিকে ছাত্রনেতা সৃজন ভট্টাচাৰ্য যাদবপুর থানায় ঢুকছে। রাজ্য এবং জেলার নেতারা মাইকে ক্রমাগত বলছে দাবির কথা। খুব বড়ো বড়ো টার্ম শোনা যাচ্ছিলো – ইউনিয়ন ইলেকশন, ডিফান্ড হয়ে যাওয়া ইউনিভার্সিটি, সরকারি স্কুল… ইত্যাদি ইত্যাদি।
একটা বাচ্চা মেয়ে। কিছুতেই ক্লাস এইটের বেশি হবে না। হঠাৎ এসে জিজ্ঞেস করলো আমাকে – “কি হয়েছে গো? তোমরা কি বলছো?”
একটু দ্বিধায় পড়লাম। বাচ্চাটার এতো কঠিন বিষয়ের ওপর আগ্রহকে সহজ ভাষায় প্রশমিত করার দক্ষতা কি আমার আছে? তবুও চেষ্টা করলাম। আমাদের কথোপকথন অনেকটা এমন ছিল-
“তুমি স্কুলে পড়ো তো! তোমার স্কুলে যদি কোনো সমস্যা হয়, তুমি কাকে বলবে?
সে উত্তর দিলো – “দিদিমনিকে।“
-“তিনি যদি সেটা সলভ করতে না পারেন?”
মেয়েটা বুদ্ধিমান ছিল – “বড়ো দিদিমনি সব পারেন।“
-“এবার ধরো। তিনি তোমার সমস্যা শুনে সমাধান তো দিলেনই না। উল্টে আরো মারলেন। তোমার মাথা ফেটে গেলো। রক্ত বেরোলো। তাহলে তুমি চিৎকার করবে না? কাঁদবে না? আমরাও সবথেকে বড়ো ‘দিদিমনির’ কাছে গেছিলাম আমাদের ইউনিভার্সিটির সমস্যা নিয়ে। উনি আমাদের মেরেছেন। খুব বাজে ভাবে।“
মেয়েটি ভয় পেলো। হয়তো বুঝলো। এরপর তড়িঘড়ি মেয়েটির মা এলো খানিকটা দূর থেকে, কোলে আরেকজন বাচ্চা। তিনি আরেকটু পরিষ্কারভাবে শুনলেন। বয়সে বড়ো দেখে বোঝাতেও সেরম অসুবিধা হয় নি। বলছিলাম কিভাবে যাদবপুরের মতন বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি আর্থিক সংকট থাকে, তাহলে অনুমান করাই যায় বাংলার বাকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পরিস্থিতি হতে পারে। কিভাবে দায়িত্ব নিয়ে সরকারি স্কুল উঠে যাচ্ছে। প্রাইভেট স্কুলের জন্য ব্রিডিং গ্রাউন্ড তৈরী করছে এই সরকার। সব শুনে তিনি অত্যন্ত কড়াভাবে বললেন – “সব বন্ধ করে দাও স্কুল-কলেজ। নয়তো জানোয়াররা শুনবে না। সেই ‘অভয়া’র সময়ের মতন।“
সাজেশনটা হয়তো খামখেয়ালিপূর্ণ। কিন্তু সরকার-প্রশাসনের ওপর বিরক্তিটা স্পষ্ট।
ফেরর সময় অটোতেও আমার সঙ্গে থাকা একজন কমরেডের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছিল। অটোচালক ভদ্রলোক আমাদের নামার সময় বললেন – “অভয়ার সময় ওই জানোয়াররা আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে নামী দামি উকিল দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো ধর্ষকদের পক্ষে। তোমরা কিভাবে লড়বে ওদের সাথে? তবুও লড়ো। কেউ তো লড়ো। আর ভালো লাগছে না।“
বুঝলাম মানুষ ‘অভয়া’কে ভোলে নাই।
আরো অনেক কিছুও ভোলা কঠিন। সেই মেয়েটির মা যাওয়ার আগে আরেকটা কথা বলেছিলেন।
“ আমার মেয়ের স্কুলেও ডোনেশনের নামে অনেক ফিস নেয়। আমি কুলিয়ে উঠতে পারি না। বন্ধ হয়ে গেলেও আমাদের আর হয়তো কিছু যায় আসবে না। একেবারেই তো উঠে যাচ্ছে সব।“
আমার খারাপ লাগছিলো কয়েকদিন মিডিয়ার ক্রমাগত উগড়ে দেওয়া বিষ দেখে। ভাবছিলাম মানুষ কি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোটাই বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে সমাজ থেকে! ভুল ছিলাম। শিক্ষা বাঁচানোর এই লড়াইতে প্রথম থেকেই তো মেদিনীপুর পাশে ছিল। ওদেরও তো লড়াই ছিল এটা। পাশে থাকতে হবে সমগ্র বাংলাকে। এই সহজ সত্য মানুষ বুঝবে না তা কি হতে পারে?
বুঝলাম বাস্তব আর মিডিয়া ন্যারেটিভের মধ্যে লক্ষ যোজন ফারাক রয়েছে। মিডিয়া এগুলো দেখাবে না, আমাদেরই দেখতে হবে। মাটিতে নামতে হবে। মাটিতেই থাকতে হবে। মাটিতেই সেতুর ভিত তৈরী করতে হয়। মানুষ বানাচ্ছে সেই সেতু। আমরাও হাত লাগাই।

