সংগ্রামের পথে…
অহনা দাশগুপ্ত
মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটা অংশ যদি খালি মানুষের ইতিহাস হয়ে থাকে, তবে বাকিটুকু মানুষের এবং প্রকৃতির, একত্রে। মানুষ প্রকৃতির সন্তান, পরিস্থিতির ফসল। তা সত্ত্বেও, পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কটা চেতনার স্তরে যেন বৈরিতার, সংঘাতের। উন্নততর প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন মানুষের প্রকৃতির প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে পারেনি, উল্টে সংঘাতের মাত্রারই বৃদ্ধি ঘটিয়েছে আরও। বিপন্ন প্রকৃতি, পরিবর্তিত জলবায়ু যেমন একদিকে উত্তরোত্তর সংকট উপস্থিত করছে, তেমনই পুঁজিবাদ এখনও বাড়তি মুনাফার সন্ধানে সমগ্র মানবজাতির কবর খুঁড়ে চলেছে প্রতি। প্রকৃতি এবং মানুষের যৌথ বিপন্নতার মাঝেও যখন পুঁজি স্পষ্টই বেছে নেয় মুনাফাকে, তখন গরীব খেটেখাওয়া মানুষের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় পরিবেশরক্ষা। কারণ লড়াইটা স্রেফ প্রকৃতিকে বাঁচাবার নয়, মানুষের নিজের বাঁচারও।
উনবিংশ শতকে অস্ত্র ব্যবসার মুনাফা বৃদ্ধির জন্য মহাযুদ্ধের অজুহাত ব্যবহার করত পুঁজিপতিরা। সময়ের সঙ্গে কৌশল বদলেছে শাসক। আর এখন উপমহাদেশের শহরাঞ্চলে অন্যতম বড় ব্যবসার পোশাকি নাম রিয়েল এস্টেট! একদিকে যখন ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদ করে তৈরী হচ্ছে ধান্দার পুঁজির স্কাইসক্রেপার, উল্টোদিকে হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্ক’র পরিসংখ্যান বলছে ঠিক সেই দেশের রাজধানী নয়া দিল্লিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ। আর সেই শহরেই গৃহহীন অন্তত ২০০ মানুষ মারা যান প্রতিবছর শীতকালে মাথার উপর ছাউনি না থাকায়। কংক্রিটের এই জঙ্গল তৈরীর ফলে বাতাসে মিশছে বহু ক্ষতিকর কার্বন মলিকিউল, বাড়ছে যক্ষা, লাং ক্যান্সার। এই সব রোগ শুধু সমাজে ছেড়ে পুঁজি খান্ত হয়নি, তার সোকলড্ ওষুধ নিয়েও হাজির সে। ধান্দার ধনতন্ত্র দিল্লিতে তৈরি করেছে, একাধিক অক্সিজেন পার্লার। সেখানে ১০ডলারের বিনিময়ে আধ ঘন্টার জন্য আলপস্ পর্বতের হাওয়া অক্সিজেন মার্কস পরিয়ে বিক্রি করছে একাধিক এম.এন.সি।
আমাদের পাশের রাজ্য ওডিশায় দীর্ঘদিন ধরে জিন্দালদের স্টিল কারখানার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। মানবাধিকার কর্মী নরেন্দ্র মোহান্তি, দেবেন্দ্র সোয়াইন এবং মুরলিধর সাহু সহ ৬-৭ জনকে গ্রেপ্তার’ও করা হয়েছে প্রতিবাদ করার অপরাধে! গ্ৰামবাসীদের ওপর চলেছে পুলিশি লাঠিচার্জ। গ্রামের পুরুষরা পুলিশের ভয়ে গ্রামছাড়া। লড়ে যাচ্ছেন মহিলারা। মোহন চরণ সিং’র পুলিশ তাঁদের উচ্ছেদ করে জমি তুলে দিতে চাইছে জেএসডব্লিউ উৎকল স্টিল লিমিটেডের হাতে। কোম্পানির কাছে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, কিন্তু স্টিল প্ল্যান্ট বানাতেই হবে চাষের জমি, জঙ্গল সাফ করে।
অত্যাচার অনেকদিন থেকেই সহ্য করতে হচ্ছে দেউচা পাঁচামীর গ্রামবাসীদের। বীরভূমের মহম্মদ বাজার সংলগ্ন গ্ৰাম দেউচা – পাঁচামী। মাটির তলায় আছে কয়লা। খোঁজ পাওয়া মাত্রই খনি তৈরির নামে উচ্ছেদ, দখল শুরু করেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। লক্ষ মুনাফা, তার বিনিময়ে যদি আদিবাসী মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, জমির অধিকার চুলোয় যায়, যাক; তাতে পুঁজির কোন ক্ষতি নেই। খোলামুখ কয়লা খনি থেকে উড়ে আসা কার্বন মলিকিউল যদি গাঁয়ের মানুষের ক্যান্সার বাঁধায়, তাতেও পুঁজির ক্ষতি নেই। নয়াদিল্লিতে ২০১৯-র ১৮ সেপ্টেম্বর প্রায় চল্লিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে, লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছিল। রাজ্যে তৃণমূল-বিজেপি দ্বিমেরু বিভাজন তুঙ্গে। তখন, সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে বেরিয়ে তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন, ”খুব ভালো আলোচনা হয়েছে।” সেই বৈঠকেই দেউচা পাঁচামী কয়লা খনি প্রকল্পের উদ্বোধনে নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। নিজেদের স্লোগানে “মা-মাটি-মানুষ” বললেও বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষা করাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসল মকসত। তাই জন্যই তো নরেন্দ্র মোদীর জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে দাওয়া।
পৃথিবীর বৃহত্তম বনভূমি আবৃত ব-দ্বীপ অঞ্চল সুন্দরবন৷ সুন্দরী, গরান, গর্জন, গেওয়া-র ছায়ায় ঘেরা গা-ছমছমে বনবিবি আর দক্ষিণ রায়ের আবাস৷ বছর চারেক আগে আমফানেই আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় চোদ্দো বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সেই ক্ষতির প্রায় পুরোপুরিই দক্ষিণবঙ্গের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের। বলা ভালো বেশিরভাগটাই সুন্দরবনের মানুষের। নোনা জল, বাঘের বিচরণ একে এখনও অন্যান্য অঞ্চলের মতো পুঁজির মুনাফা বানানোর মেশিনারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু যে তান্ডবলীলা নদীবক্ষ জুড়ে চলে, তার দূষণ চুইয়ে পড়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় এইখানের মানুষেরই। সুন্দরবনের প্রান্তিক অঞ্চলে অন্য কোনো পেশা না থাকার কারণে এখানকার মানুষেরা কৃষিকাজের পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের সহায়ক হিসেবে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহকে বেছে নিয়েছে। মৎস্যজীবিদের কাছে মৎস্য সম্পদ সংগ্রহ জীবনের প্রধান ভিত্তি । গোটা ভারতবর্ষ আজ যে বেকারত্বের জ্বালায় ভুগছে তার ব্যতিক্রম সুন্দরবন নয়। সুন্দরবনের বদ্বীপ গুলিতে কর্মসংস্থানের হার খুবই কম, মহিলাদের মধ্যে প্রায় ৯৯ % বেকার বা কর্মহীন। কর্মসংস্থানের অভাবে পেটের দায়ে মহিলাদের ক্ষেতে , জঙ্গলে পুরুষদের সঙ্গে কাজ করতে যেতে হয়। মেয়েরা ঘর সামলানোর পাশাপাশি মাঠেও কাজ করেন তবে শ্রমিক বা কর্মী হিসেবে পিতৃতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বীকৃতি পান না। একের পর এক বিপর্যয়ে সংকট বেড়েছে সুন্দরবনের মানুষের। এর মধ্যেই ধামাচাপা পড়ে থাকে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যার কথা। নোনা নদীতে শুধু মাছ ধরা নয়, স্নান করা, বন্যা হলে ভেসে যাওয়া ঘরে কোমরজলে টানা সাত ,আট ঘন্টার বেশি কাটে মেয়েদের। ফলস্বরূপ বাড়ছে রক্তক্ষরণ, ইউরিনারি ট্র্যাকে সংক্রমণ, পি আই ডি ও সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের সমস্যা।
বামপন্থীরা শক্তিশালী থাকায় অরণ্যের অধিকার আইনের স্বীকৃতি পায়, তবে আইন রক্ষার দায়িত্ব যে সব প্রতিষ্ঠানের আজকের ভারতে তা প্রায় সবই ধ্বংস। সুন্দরবন, দেউচা পাঁচামী — শুধু জল, জমি, প্রকৃতি রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে নয়, এখন হয়ে উঠেছে একইসঙ্গে গনতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম, স্বৈরাচার-বিরোধী লড়াইয়ের মাইলস্টোন।
সংবাদপত্র লিখবে না এই সব কথা। সংবাদমাধ্যম দেখাবে না রুখে দাঁড়ানোর ফুটেজ। আজকের পশ্চিমবঙ্গে এটি প্রবল, অসহ্য এক সত্য। আনিস খুন হওয়ার আগে ফেসবুকে লিখেছিল “সংগ্ৰামী অভিনন্দন দেউচা”, শুধু জল – জমি – জঙ্গল নয়, জীবনের অধিকার রক্ষা করতে বাংলার বিপ্লবীদের পথ দেখাবে – ব্রিগেড। ২০শে এপ্রিলের ব্রিগেড।

