কম বয়সের ছেলেমেয়েরা কেন ব্রিগেডে আসবে?
নিরাপদ সরদার
লাল ঝান্ডার ব্রিগেড মানুষের মনে একটা আবেগ তৈরি করে। রাজ্যের মানুষ মনে করে লাল ব্রিগেড মানে মেহনতি মানুষের মুক্তির ডাক, সমাজ বদলানোর ডাক। এবার ব্রিগেড সি.পি. আই.(এম) ডাকেনি, বামফ্রন্টও ডাকেনি, ডেকেছে শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুর ও বস্তি সংগঠন। এক কথায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের ব্রিগেড। এ ব্রিগেড বাংলার মানুষ দেখেনি, ছাত্রছাত্রীরাও দেখেনি। শ্রমজীবী মানুষ আসবে বাঁচার অধিকার, কাজের অধিকার, জমির অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও খাদ্যের দাবি নিয়ে।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় রাজ্যের অবস্থা ছিল জরাজীর্ণ, খাদ্যের অভাব, শিল্প কলকারখানা মৃতপ্রায়, স্কুল-কলেজ হাতে গোনা কয়েকটি। রাস্তাঘাট ছিল না বললে কম বলা হবে। বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে উন্নয়নের রাস্তা খুলতে থাকে। প্রথমে ঠিক হল খাদ্যের অভাব দূর করতে না পারলে বাকি উন্নয়ন করা কঠিন হবে। ১৯৭৮ এ আনা হলো প্রথম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। শুরু হলো ভূমি সংস্কারের কাজ। আমূল ভূমি সংস্কারের কাজে‘কৃষক সভা’র জমির আন্দোলন খুব সাহায্য করেছিল। জোদ্দার ও জমিদারদের সিলিং বহির্ভূত জমি গরিবের মধ্যে বিলি করা হয়। গরিব কৃষক জমি পেয়ে মানের আনন্দে নিজের শ্রম দিয়ে খরা জমিতে সোনার ফসল ফলাতে শুরু করে। সেচের ব্যবস্থা বাড়লো, কয়েক বছরের মধ্যে খাদ্যের অভাব কেটে গেল, ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ খাদ্যের সংকট কাটিয়ে খাদ্য উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থান দখল করল। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের বিষয়ে গরিব, কৃষক ও খেতমজুর গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে থাকে। গরিবদের দেওয়া জমিতে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র। গরিব খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার অগ্রগতি ঘটে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় মানুষের সাহায্যে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দারুন পরিবর্তন আসে। বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া বন্ধ হয়। রাজ্যের মহিলারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও জমির অধিকার পেয়েছে বাম আমলেই। প্রাথমিক স্কুল গুলোতে উপস্থিতির হার দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রয়োজন মেটাতে গড়ে তোলা হয় অসংখ্য বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। ম্যানেজিং কমিটি ছিল স্কুল-কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে। যেহেতু অভিভাবকরাই ছিল এই কমিটির সদস্য, তাই নিজের মতো করে গড়ে উঠেছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানান চর্চায় উঠে এলো আশির দশকে এস.এস.সি. বোর্ড গঠন। স্বচ্ছ নিয়োগের ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা যেন পড়াশোনার মোড় ঘুরিয়ে দিল। পড়াশোনায় প্রতিযোগিতা, বছর বছর পরীক্ষা, বছর বছর চাকরি। খেটে খাওয়া, মেহনতি, আদিবাসী পরিবারের মনে হাসি ফুটল। বামফ্রন্ট সরকার শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের কাজ দিতে শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এত ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখছে যাবে কোথায়, বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করতে শিল্প গড়ার চেষ্টা শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে খুশির জোয়ার সৃষ্টি করেছিল।
২০১১ সালের পরিবর্তন। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠন করে। ধীরে ধীরে সব কিছু পাল্টে যেতে থাকে। প্রথমে আক্রমণ করা হলো পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ওপর। যে পঞ্চায়েত ছিল সমাজ গড়ার কারিগর। জনগণের পঞ্চায়েত, সংসদ সভা, গ্রাম সভা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল। আনা হল দুয়ারে সরকার। দুয়ারে সরকারের নাম করে গরিবের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। হাত পড়লো জমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। আর.এস.এস.-এর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল, সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চালু করা। তৃণমূলের হাত ধরে সেটা শুরু হল। লুট, সন্ত্রাস ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হল। অর্থ রোজগার করাই হল তৃণমূল দলের কর্মীদের প্রধান লক্ষ্য। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো এর থেকে বাদ গেল না। স্কুলের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিজের পছন্দের স্বার্থান্বেষী লোকজন বসানো হলো। রোজগারের জায়গা হয়ে উঠলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চোর-গুন্ডা আনাগোনায় শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ল। পিছিয়ে পড়ল গাঁয়ের গরিব শ্রমজীবী মানুষের সন্তানেরা। আক্রান্ত হল যুব সমাজ। যাদের পড়াশোনা করার কথা তারা গেল তৃণমূলের পার্টি অফিসে। বাড়ির ভালো ছেলেটা হয়ে গেল তৃণমূলের দাপুটে ছেলে। বাবা-মা ডুকরে ডুকরে কাঁদে কিন্তু বলার উপায় নেই। এই পরিবেশেও যারা লেখাপড়া শিখছে তাদেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সেই কবে বামফ্রন্টের আমলে এস.এস.সি. পরীক্ষা হয়েছে, আর হয় না। ২০১৬-তে করার চেষ্টা করল কিন্ত এত দুর্নীতি করল, যে শেষ পর্যন্ত ২৫,৭৫২ জনের চাকরি জীবন শেষ হয়ে গেল। রাজ্যের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকেও শুনতে হচ্ছে- ঘুষের চাকরি। ২৪,৬৪০ টি পোস্টের জন্য ২৩ লাখ ছেলে-মেয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। যারা যোগ্য তারা বাদ গেল, যারা অযোগ্য তাদের লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকরি দিল। এরা রাজ্যের কৃতি সন্তানদের ভালো চায়? এরা রাজ্যের শিক্ষা চায়? বিবেচনা করার সময় এটা। চোরেদের বাঁচানোর জন্য এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজে বাঁচার জন্য মহামান্য হাইকোর্টের রায় না মেনে সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হয় রাজ্য সরকার এবং কোটি কোটি টাকা খরচ করে। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে সরকারের পুরো প্যানেল বাতিল করে দিয়েছে। আবার নাটক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী চাকরি হারাদের পাশে আছে, আসলে উনি চোরদের পাশে আছে। মেধার পাশে নেই।
শিক্ষা বানিজ্যে পরিণত হচ্ছে। প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্কুল মিলিয়ে ৮০০০ এর বেশি স্কুল বন্ধের তালিকায়। দিল্লির শিক্ষা নীতি দ্রুত চালু করতে চাইছে মমতা ব্যানার্জি। গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা আর পড়াশোনা করতে পারবে না। সরকারি স্কুল লাইন দিয়ে বন্ধ হবে। ঘুর পথে- আর.এস.এস. পাড়ায় পাড়ায় ফ্রি স্কুল খুলবে, ধর্ম ও বিভাজনের রাজনীতির বিস্তার করবে, এটাই পরিকল্পনা।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছে। জাল ঔষুধের ছড়াছড়ি। গ্রাম বাংলার অবস্থা খুব খারাপ। এইসবের বিরুদ্ধে যুব সমাজকেই লড়তে হবে। দিল্লির সরকার ও রাজ্য সরকার শ্রমজীবী মানুষের উপর যেমন আক্রমণ করছে তেমনি যুব সমাজ ও আক্রান্ত হচ্ছে। যুব সমাজ শ্রমজীবী অংশের বাইরে নয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের বেসরকারিকরণ, বিদ্যুৎ বিল, শ্রম কোড আইন, কৃষক শ্রমিক-খেতমজুর বিরোধী নীতি, রেগার কাজ চালু না করা, আই.সি.ডি.এস. প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো এই সব নূতন প্রজন্মকে, যুব সমাজকে পঙ্গু করার পরিকল্পনা। এর বিরুদ্ধে যুব সমাজকে অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করতে হবে। এই ব্রিগেড এদের আন্দোলনের পথ দেখাবে। সাহস জোগাবে। শোষকদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথ নেওয়ার ব্রিগেড।

