বাংলাদেশ: আজ – কাল – পরশু

বাংলাদেশ: আজ – কাল – পরশু

রওনক চক্রবর্তী

বাংলার আকাশের রঙ প্রতিদিন বদলায়, কিন্তু তার মাটির টান আর মানুষের জেদ একই রয়ে যায়। এই গল্পটি একটি চায়ের দোকানের আড্ডাকে কেন্দ্র করে, যেখানে বসে আছে তিন প্রজন্মের প্রতিনিধি—রহমত চাচা (আজ), তার ছেলে আরমান (কাল) এবং নাতি স্বপ্নীল (পরশু)। তাদের কথোপকথনের মধ্য দিয়েই উঠে আসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের এক জীবন্ত চালচিত্র।


আজকের বাংলাদেশ: সংগ্রামের চড়াই-উতরাই

রহমত চাচা একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। তিনি দেখেছেন যুদ্ধ-পরবর্তী ভাঙাচোরা দেশ থেকে আজকের এই ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তর। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি বলেন, “আজকে আমরা জিডিপি আর উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু একসময় একবেলা ভাতের জন্য হাহাকার ছিল। আজকের বাংলাদেশ হলো টিকে থাকার লড়াইয়ের নাম। রাস্তাঘাট হয়েছে, পদ্মা সেতু হয়েছে, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে এখনো একটা ভয় কাজ করে। রাজনীতি আজ শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও সুশাসনের অভাব রহমত চাচাকে ব্যথিত করে। তিনি মনে করেন, আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার পথে এগোলেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপ সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে মাঝেমধ্যে স্তব্ধ করে দেয়।


আগামীর বাংলাদেশ: পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা

আরমান একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। সে মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। তার চোখে ‘কাল’ বা নিকট ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হলো এক অস্থির সন্ধিক্ষণ। সে বলে, “আব্বা, আজকের উন্নয়ন দিয়ে কালকের পেট ভরবে না যদি না আমরা সিস্টেমে পরিবর্তন আনি। কালকের বাংলাদেশে আমি চাইব এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, কোটার নয়। যেখানে বাক-স্বাধীনতা শুধু বইয়ের পাতায় থাকবে না, থাকবে রাজপথেও।”
আরমানের ভয় মুদ্রাস্ফীতি আর দুর্নীতির সিন্ডিকেট নিয়ে। সে মনে করে, যদি রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা যায়, তবে আগামীকালের বাংলাদেশ হবে এক বৈষম্যের চারণভূমি। তার মতে, কালকের রাজনীতি হওয়া উচিত নীতি-নির্ভর, পেশীশক্তি-নির্ভর নয়।


পরশুর বাংলাদেশ: স্বপ্ন ও নতুন দিগন্ত

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্বপ্নীল ল্যাপটপে কী যেন করছিল। সে মুখ তুলে বলে, “দাদা, আব্বু—তোমরা অতীত আর বর্তমান নিয়ে পড়ে আছ। আমি দেখছি ‘পরশু’র বাংলাদেশকে। সেই বাংলাদেশ হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর গ্লোবাল সিটিজেনশিপের। সেখানে রাজনীতি মানে হবে ‘সার্ভিস’। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ব যেখানে কোনো দল থাকবে না, থাকবে শুধু দেশের স্বার্থ।”স্বপ্নীলের চোখে পরশুর বাংলাদেশ হবে সীমান্তহীন জ্ঞানের দেশ। সেখানে তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে ছুটবে না, তারা হবে উদ্যোক্তা। তারা ধর্ম বা জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে জলবায়ু পরিবর্তন আর প্রযুক্তিগত বিপ্লব নিয়ে কথা বলবে।

ক্ষমতার দম্ভ নয়, সেবার শপথ
গল্পের শেষে বৃষ্টির ঝাপটা এলো। রহমত চাচা গম্ভীর হয়ে বললেন, “শোনো দুজন, আজ-কাল-পরশু যা-ই বলো না কেন, বাংলাদেশের মূল রাজনীতি হওয়া উচিত ‘মানুষ’। যখনই রাজনীতি মানুষের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখনই পতন অনিবার্য হয়। ইতিহাসের পাতা সাক্ষী—বাংলাদেশ তাকেই গ্রহণ করেছে যে মানুষের দুঃখ বুঝেছে, আর তাকেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে যে ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছে।”
আজকের স্থিতিশীলতা, কালকের সংস্কার আর পরশুর উদ্ভাবন—এই তিনের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠবে প্রকৃত সোনার বাংলা। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা নয়, বরং গণতন্ত্রের অলঙ্কার হিসেবে দেখা হবে। বাংলাদেশের পরশু তখনই উজ্জ্বল হবে যখন আজকের নেতৃত্ব কালকের প্রজন্মের জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র রেখে যাবে।
গালভরা উন্নয়ন বনাম রূঢ় বাস্তবতা
আজকের বাংলাদেশের বড় একটি সংকট হলো তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ এবং সাধারণ মানুষের ‘জীবনযাত্রার মান’-এর মধ্যে বিশাল ব্যবধান।


শিক্ষিত বেকারত্ব: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি (প্রায় ১৩.১১%)। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও হাজার হাজার তরুণ সম্মানজনক কর্মসংস্থান পাচ্ছে না, যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-কে ‘ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন’-এ পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও সিন্ডিকেট: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং বাজারের ওপর অশুভ ‘সিন্ডিকেট’-এর প্রভাব মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে।
ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা: বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাব অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে। 
পরিবর্তনের অগ্রদূত: ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম (Generation Z) কেবল ফেসবুক বা ইন্টারনেটে সীমাবদ্ধ নয়, তারা রাষ্ট্র সংস্কারের সাহস রাখে। 
রাজনৈতিক সচেতনতা: তরুণরা এখন আর অন্ধ দলকানা রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় জবাবদিহিতা, মেধাভিত্তিক সমাজ এবং বাক-স্বাধীনতা।
নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ: দীর্ঘদিনের গতে বাঁধা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে এসে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে তরুণরা এখন সক্রিয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এই তরুণ ভোটাররাই (প্রায় ৫ কোটি ৬০ লক্ষ) হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক শক্তি।
উদ্যোক্তা মানসিকতা: চাকরির পেছনে না ছুটে অনেক তরুণ এখন প্রযুক্তি ও স্টার্টআপের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোও এখন বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। 
করণীয়
পরশু বা আগামীর বাংলাদেশকে সফল করতে হলে তিনটি বিষয়ে আপস করা চলবে না:
১) প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার: দুর্নীতি দমনে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা,
২) কারিগরি শিক্ষা: সাধারণ বিএ-এমএ ডিগ্রির চেয়ে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় তরুণদের দক্ষ করে তোলা যাতে তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
৩) গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি: জয়-পরাজয় যা-ই হোক, ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। 


উপসংহার:

বাংলাদেশের গল্পটি আসলে কোনো ব্যক্তির নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের সমষ্টি। আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, কাল সেখান থেকে আরও উঁচুতে যাওয়ার অঙ্গীকার থাকতে হবে। আর পরশু? পরশু হবে সেই দিন, যেদিন কোনো মায়ের সন্তানকে রাজনীতির বলি হতে হবে না, আর কোনো মেধাবীকে দেশান্তরী হতে হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ‘ব্যক্তি পূজা’র চেয়ে ‘নীতি পূজা’র সময় এসেছে। তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। এখন সময়ের দাবি হলো— ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু না ভেবে সেবার হাতিয়ার করা। যদি আমরা তরুণদের এই মেধাকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারি, তবেই ‘পরশু’র বাংলাদেশ হবে একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র।