বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইউনিয়নের ভূমিকা
• অনিন্দিতা দেব
“শিক্ষার বেসরকারিকরণ কেবল অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করছে না, এটি উচ্চশিক্ষার গণতা।ন্ত্রিক চরিত্রকেও ক্রমশ সংকুচিত করছে।”
মানবসভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত জ্ঞান ক্রমাগত সঞ্চিত হয়ে চলেছে তবে ডিজিটাল যুগে তথ্য ও জ্ঞান উৎপাদনের গতি এতটাই দ্রুত হয়েছে যে সাম্প্রতিক সময়কে অনেকেই ‘তথ্য-বিস্ফোরণের যুগ’ বলে অভিহিত করেন।
ভারতবর্ষে প্রথম পাঁচটি কোর্স যেখানে সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করতে আসে, তার মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং। রাজ্যে মোট স্নাতক শিক্ষার্থীর প্রায় ১৮% থেকে ১৯% ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি বিভাগে এবং প্রায় ৬% শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা-স্তরের কোর্সে ভর্তি হয়। অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন (২০১০-১১ সাল ,AISHE)-এর তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি কলেজগুলিতে ভর্তি হয় প্রায় ৪৫% শিক্ষার্থী। ল, নার্সিং, ভোকেশনাল ট্রেনিং—সব মিলিয়ে ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৫০ জন আজ কোনো না কোনোভাবে টেকনিক্যাল কোর্স করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংখ্যার এই বৃদ্ধি কি সত্যিই শিক্ষার গণতান্ত্রিক বিস্তার নির্দেশ করে?
এই সমস্ত উন্নত মানের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ। এ বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে উদাসীনতা দেখিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক AISHE রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার বৃদ্ধি পেলেও সরকারি ব্যয় জিডিপির তুলনায় এখনও সীমিত।
বিনিময়ে সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন নীতি আরোপ করছে এবং জনগণকে প্রচ্ছন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের ছেলেমেয়েদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে লেখাপড়া করাতে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে শুধুমাত্র জেনারেল ডিগ্রি ও অতি সামান্য কিছু প্রফেশনাল কোর্স বাদে বেশিরভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ম্যানেজমেন্ট কলেজ, ল কলেজ এবং প্রায় সমস্ত প্রফেশনাল কোর্স বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওতায় চলে গেছে।
এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার হার বাড়ছে এবং বেশ কিছু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানসম্মত পরিকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ প্রদান করছে ঠিকই; তবে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার অভাব শিক্ষার উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের স্বার্থে তৈরি করা নিয়মনীতি সামনে রেখে ক্যাম্পাসে কোনো ইউনিয়ন কিংবা দলীয় সংগঠন না থাকার কথা বড় করে লিখে একপ্রকার একনায়কতন্ত্র ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণকে স্বাভাবিক করে তুলছে। ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের নিজেদের কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলার জায়গা প্রায় নেই।
শিক্ষার প্রাথমিক চাহিদা যখন অর্থ, সেখানে শ্রেণীবিভাজনের দেশে সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে সর্বক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় সম্ভব হয় না। প্রতি ছয় মাস অন্তর সেমিস্টার ফি কোর্সের আওতায় পড়লেও—ইচ্ছামতো ফি বৃদ্ধি, যেকোনো ছুটি বা অসুস্থতা, কিংবা কম উপস্থিতির কারণে পেনাল্টি স্বরূপ অতিরিক্ত অর্থ আদায়—কখনোই নির্ধারিত ফি-র অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
এছাড়াও প্রায় সমস্ত কোর্সেই অতিরিক্ত ফি ধার্যের প্রধান কারণ হল ক্যাম্পাসিং। এর জন্য বহু শিক্ষার্থী লোন নিয়ে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হয় শুধুমাত্র চাকরির আশায়। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ১০০ শতাংশ ক্যাম্পাসিং করতে অক্ষম হয়। ফলে যারা লোন নিয়ে পড়াশোনা করেছে, তাদের পক্ষে সেই লোন পরিশোধ করা দুঃসহ হয়ে পড়ে।

এই ধরনের আর্থিক বোঝা এবং খরচের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের এক গ্রামে একটি মেয়ে তার উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রাইভেট কলেজের খরচ বহন করতে না পেরে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল এবং পরে তাকে সরকারি/সহায়তা ভিত্তিক পথেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছিল। এই ঘটনা দেশে বহু পরিবারের বাস্তবতা তুলে ধরে।
অর্থসংকট ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি কলেজে আজও র্যাগিং কিংবা শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয় বহু ছাত্রছাত্রীকে। অনেক ক্ষেত্রে পুঁজিপতি শ্রেণি নিজেদের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে—এবং বলাই বাহুল্য সরকারের মদতে—এই ঘটনাগুলি চাপা দিয়ে দেয়। এত সমস্যার সম্মুখীন হয়েও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদের সুযোগ পায় না।
এই সব সমস্যার মুখোমুখি হলেই বোঝা যায় একটি ইউনিয়ন ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে সকল ছাত্রছাত্রী একজোট হয়ে অরাজকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে এবং নিজেদের দাবিগুলি নিয়ে সোচ্চার হতে পারে।
সর্বসাকুল্যে যে কয়টি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ আছে, প্রায় প্রতিটিতেই ইউনিয়ন থাকলেও বহু ক্ষেত্রে ভোট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন বন্ধ করে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। ফলে নিরপেক্ষ দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রও অনেকাংশে সীমিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় একইভাবে ক্ষমতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
তবে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি ও জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এই উদাহরণগুলি দেখায়—যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি স্বচ্ছ ইউনিয়ন কতটা জরুরি। বিশ্বের বহু দেশেও ছাত্র ইউনিয়ন গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বীকৃত অংশ, যেখানে ছাত্র প্রতিনিধিত্বকে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউনিয়নের প্রাথমিক কাজ কলেজ পড়ুয়াদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা হলেও, তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক কার্যকলাপে উদ্বুদ্ধ করতেও ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাত্র হিসেবে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সকলের সমান অধিকার নিয়ে ভাবতে শেখায়। সামাজিক চেতনা, মননশীলতা এবং সমাজের প্রতি তরুণ প্রজন্মের প্রাথমিক কর্তব্যবোধ অনেকাংশেই ইউনিয়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়।
ফলত, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পুঁথিগত শিক্ষা নয়, নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিরাট ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার বেসরকারিকরণ পড়ুয়াদের পুঁথিগত বিদ্যা প্রদান করতে সক্ষম হলেও সামাজিক চেতনা গঠনে সীমাবদ্ধ।
আজ যখন শিক্ষা ক্রমশ মুনাফার অঙ্কে পরিণত হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি কেবল চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি, নাকি সমাজ বদলের শক্তিকেন্দ্র?
যদি শিক্ষা সমাজ গঠনের ভিত্তি হয়, তবে সেখানে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই হবে। একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ ছাত্র ইউনিয়ন কেবল দাবি আদায়ের মাধ্যম নয়; এটি তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদের মঞ্চ এবং ন্যায়ের লড়াইয়ের শক্তি।
শিক্ষা যদি গণতন্ত্রের ভিত্তি হয়, তবে শিক্ষাঙ্গন থেকেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে—নচেৎ শিক্ষা থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতা থাকবে না।

