NEP ২০২০: চার বছরে শিক্ষার সামাজিক চরিত্রের অবক্ষয়
• চয়ন কর্মকার
জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০ ঘোষণার সময় একে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল ও যুগান্তকারী শিক্ষানীতি হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বধীন NDA সরকারের দ্বারা। বলা হয়েছিল, এই নীতি শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে, গুণগত মান উন্নত করবে এবং ভারতের তরুণ সমাজকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত করবে। কিন্তু চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—NEP শিক্ষার সংকট সমাধান তো দূরের কথা, বরং শিক্ষার সামাজিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্রকেই ক্রমশ দুর্বল করে তুলেছে।
শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিকক্ষেত্র নয়; এটি সমাজের কাঠামো, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই অর্থে NEP ২০২০-কে কেবল একটি নীতিগত সংস্কার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকা থেকে সরে যাওয়ার একটি বৃহত্তর নব্য-উদারনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
NEP বারবার শিক্ষা খাতে GDP-র ৬ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি পুনরুচ্চারিত করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় বাজেট ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০–২১ থেকে ২০২৪–২৫ পর্যন্ত শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় ঘোরাফেরা করেছে ৪ থেকে ৪.৩ শতাংশের মধ্যেই। মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিলে এটি কার্যত ব্যয় সংকোচনের শামিল। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে স্কুল ও উচ্চশিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই—লক্ষাধিক শিক্ষক পদ শূন্য, পরিকাঠামোর ঘাটতি, গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে স্কুল একীভূতকরণ ও বন্ধ হয়ে যাওয়া, এবং শিক্ষার মানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। এই পরিস্থিতি নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে জনশিক্ষাকে “অকার্যকর” দেখিয়ে বেসরকারিকরণকে অনিবার্য বলে উপস্থাপন করা যায়। শিক্ষার সামাজিক দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রের এই সরে যাওয়াই NEP-এর মূল সুর। নীতিগত স্তরে NEP “স্বায়ত্তশাসন” ও “বিকেন্দ্রীকরণ”-এর কথা বললেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে চরম কেন্দ্রীয়করণ। পাঠক্রম কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, অ্যাক্রেডিটেশন ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রভাব বেড়েছে। রাজ্য সরকার, শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয় বাস্তবতার ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষা যেহেতু সংবিধানের সমবায়ী তালিকাভুক্ত বিষয়, সেখানে এই অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ফেডারেল কাঠামোর পরিপন্থী এবং বহুত্ববাদী সমাজের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে NEP-এর প্রভাব আরও স্পষ্ট। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে “স্বনির্ভর” হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে—যার বাস্তব অর্থ হলো ফি বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক কোর্সের প্রসার এবং সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমানো। একইসঙ্গে বেসরকারি ও বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা ক্রমশ একটি বাজারনির্ভর পণ্য রূপ নিচ্ছে, যেখানে প্রবেশাধিকার নির্ধারিত হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। সরকারি, বেসরকারি ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম হারে ফি বৃদ্ধি , যার ফলে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে হতাশা জন্ম নিচ্ছে , বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা।
বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষা-সংক্রান্ত রিপোর্ট দেখাচ্ছে, NEP কার্যকর হওয়ার পর SC, ST, OBC ও সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ড্রপআউটের প্রবণতা বেড়েছে। UDISE+ ডেটা অনুযায়ী, NEP ২০২০ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি স্কুল শিক্ষায় প্রান্তিক শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। UDISE (2021–22, 2022–23) রিপোর্ট দেখায়, দেশজুড়ে লক্ষাধিক শিক্ষক পদ শূন্য, যার বড় অংশ গ্রামীণ, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া জেলায়। একই সময়ে হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে, যেখানে SC, ST ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের নির্ভরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছাত্র–শিক্ষক অনুপাতের অবনতি ও পরিকাঠামোর ঘাটতি সরাসরি এই প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মান ও স্কুলে টিকে থাকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
স্কলারশিপ ও ফেলোশিপে কাটছাঁট, হোস্টেল ও সহায়ক পরিষেবার সংকোচন প্রান্তিক সামাজিক গোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা আরও সংকীর্ণ করে, সরকারি স্কুল বন্ধ ও শিক্ষক সংকট প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার মান আরও দুর্বল করেছে। ফলে শিক্ষা আর সামাজিক উত্তরণের পথ না থেকে বৈষম্য পুনরুৎপাদনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
স্কুল স্তরে ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়াকে দক্ষতা উন্নয়নের যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কিন্তু একটি গভীরভাবে অসম সমাজে এই ব্যবস্থা কার্যত আগাম শ্রেণিবিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সুবিধাভোগী শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যেখানে একাডেমিক ও পেশাগত উচ্চশিক্ষার পথে এগোতে পারে, সেখানে শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা অল্প বয়সেই সীমিত বিকল্পের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। এটি ক্ষমতায়নের পরিবর্তে বিদ্যমান শ্রেণি ও শ্রম বিভাজনকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। এর পাশাপাশি, গত চার বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিসরের সংকোচনও চোখে পড়ার মতো। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ বৃদ্ধি, ছাত্র সংসদের কার্যক্রমে বাধা, ভিন্নমতের প্রতি প্রশাসনিক অসহিষ্ণুতা — এসব মিলিয়ে ক্যাম্পাস ক্রমশ মুক্ত চিন্তার জায়গা হারাচ্ছে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত প্রশ্ন, বিতর্ক ও সমালোচনার কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে NEP ২০২০ শিক্ষাকে সামাজিক অধিকার হিসেবে দেখার ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে। শিক্ষা এখানে আর সাম্যের হাতিয়ার নয়; তা হয়ে উঠছে বাজারের নিয়মে পরিচালিত একটি পরিষেবা। চার বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, এই নীতি মূলত একটি মতাদর্শিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে—যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকুচিত এবং পুঁজির ভূমিকা বিস্তৃত।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সংগঠিত গণসংগ্রাম। বামপন্থীদের দায়িত্ব শিক্ষাকে আবারও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও সামাজিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে ফি-বৃদ্ধি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা খাতে GDP-র ৬ শতাংশ বরাদ্দ আদায়ের দাবি রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে আনতে হবে। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র রক্ষা, ফেডারেল কাঠামো ও বহুত্ববাদী পাঠক্রমের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হবে এই সংকট উত্তরণের একমাত্র বাঁচানোর পথ।
সুতরাং, শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নটি কেবল নীতিগত সংশোধনের নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের অংশ। শিক্ষাকে পুনরায় সামাজিক চরিত্রে ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং সমান সুযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে এবং সেই কাজ বামপন্থীদের করতে হবে, এটাই সময়ের দাবি।

