অ্যান্টি ড্রপ আউট স্কোয়াড: নতুন সংগ্রামের অভিমুখে…

অ্যান্টি ড্রপ আউট স্কোয়াড: নতুন সংগ্রামের অভিমুখে…
শঙ্খজিৎ দে

আত্মনির্ভর ভারতের প্রদীপ তৈলের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের গায়ের অন্ধকার ঠিক কত-টা গাঢ়, তার একটা সমকালীন প্রামাণ্যচিত্রের সামনে আসুন আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যাই। এই বেশ গরম। এই আদ্যোপান্ত গরমের দিনে ট্রেন ফেরৎ ঘেমো দেহটাকে নিয়ে আপনি ঠিক যখন বসে আছেন পাখারতলায় নিয়ন্ত্রিত উষ্ণতায়, বীরভূম জেলার উন্নয়নপন্থী বিশিষ্ট সন্ত্রাসের নায়ক হরিদাস মণ্ডল যখন এসএসকেএমে’র এসি’তে শুয়ে নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে সিবিআই মহোদয়কে বলে সংবাদমাধ্যম বকে যাচ্ছে আর আপনি শুনছেন, সময়- ঘড়ির কাঁটা আর পরিসংখ্যানের আলো বলছে ঠিক সেই মুহূর্তে বা কিছু আগে ইণ্ডিয়া টু-ডে’র সরকারী প্রতিবেদন বলছে ১৫ কোটি ছাত্রছাত্রী কোভিড ক্রাইসিসে শিক্ষাঙ্গণের বাইরে। তাও এই পরিসংখ্যান ২০২১ সালের অগস্টের।


২০২০ সালের মার্চে যেদিন আপাত অপরিকল্পিত লকডাউন ঘোষণা করে কেন্দ্রের তথাকথিত আচ্ছে দিনের সরকার, তার পরের দিন থেকেই অন্য এক ভারতবর্ষ, ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের সামনে রগরগে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে, রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। আমরা দেখতে থাকি শ-য়ে, হাজারে পরিযায়ী শ্রমিক
নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করতে থাকেন রাস্তায় হেঁটে হেঁটে। আমরা প্রত্যক্ষ করি জমলো মকদম-দের মৃত্যু। সেই হাইওয়ের ধারে মায়ের ট্রলিতে চেপে আসতে থাকা অবসন্ন শিশুর মুখ। শিউরে উঠি মে মাসের ৮ তারিখে ঔরঙ্গাবাদের ট্রেন লাইনের উপরে ১৬ জন পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ প্রত্যক্ষ করে, লাইনের উপরের পড়ে
থাকা তাদের পথক্লান্তিনিবারক খাদ্যসংস্থানের রক্তাক্ত রুটি পড়ে থাকার দৃশ্য দেখে। একদিকে দেশজুড়ে দিন-আনি-খাই মানুষের রুটিরুজির উপর সরাসরি কোপ, অন্যদিকে বন্ধ ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে অবিরাম শূন্যতা শিশু-কিশোর থেকে গবেষকদের স্বপ্নকে মুহূর্তে স্তম্ভিত করে রাখার ধারাবাহিকতা। এই পর্বচলতে
চলতেই আমফান ঝড়। আমাদের জেলার সুন্দরবন অধ্যুষিত ৪টি ব্লকে ব্যাপকতম ধ্বংসলীলায় তছনছ হয়ে যায় মানুষের আশ্রয়ের সম্বল থেকে আবাদের চাষযোগ্য জমিন। জলের তোড়ে ডুবে যায় ব্যাপকাংশের বসতঘর। স্বাভাবিকভাবেই পড়াশুনার সামগ্রীও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।


২০২০ সালের গোটা বছরজুড়েই প্রথম ঢেউ-এর প্রকোপ, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয়ার্ধথেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ঢেউ-এর প্রকোপ — এই দুই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রান্তিক মানুষের রুজি-রুটির সংকটের সাথে সাথেই মানবসম্পদের জগৎ ব্যাপকতম গ্রাসের মুখে পড়ে। এই সংকট শুধুই কি প্রকৃতি প্রদত্ত না এর পাশাপাশি সংকটকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনেতাদের মুনাফালোভী ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট ফ্রেন্ডস গ্যাং-এর দায় আছে? এই প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতে হয়। বহুলাংশেই প্রমাণিত হয় সার্বিক কোভিড, কোভিডোত্তর সংকট এ দেশের নিম্নবিত্ত গরীব মানুষকে অতি নিম্নবিত্ত গরীব করে ছেড়েছে। প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রের বেসরকারীকরণের প্রথম ধাপ (যার নাম দেওয়া হয় ন্যাশানাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন) অবতীর্ণকরে এ দেশের অর্থনীতির ধারক-বাহক করে দেওয়া হল ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট একাংশের ব্যবসায়ীকে সোজা কথায় আম্বানী আদানীকে। আমরা বুঝতে পারলাম শিক্ষাক্ষেত্রও এর ব্যতিরেক নয়। নয়াশিক্ষানীতি নামক অশ্বডিম্বটি প্রসব করে পিপিপি মডেলে শিক্ষায় বেসরকারিকরণের ধাপগুলো উন্মুক্ত করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। এমনকি আমাদের রাজ্যের দুর্নীতিজননী মমতা ব্যানার্জির সরকারও এই একই প্রক্রিয়ায় পিপিপি মডেল লাগু করার দিকে এগোচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সহজ কথায় পয়সাওয়ালারা সহজে পড়তে পারবে, গরীব মানুষের ছেলেকে বাধ্য হয়ে হতে হবে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবান্ধব কোম্পানীর পোষ্য সস্তা শ্রমিক! এই ভয়ঙ্কর বিভাজনের সূচনাই হয়েছে কোভিডকালের ডিজিটাল ডিভাইডেশন পর্ব থেকেই।কোভিডকালে পরিকল্পনাহীন ডিজিটাল ক্লাস বৈধভাবে শুরু হওয়ার সরকারী সিদ্ধান্তের সামনে তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই দেখা যায় আপাত দরিদ্র এই একশো ত্রিশ কোটির দেশে মাত্র ২৪% পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থাপনা আছে। ২০২১-এর মধ্যভাগ থেকে বিশেষত দ্বিতীয় ঢেউ-এর পর থেকেই স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ার সুযোগে বাজারে নেমে পড়ে একদল অ্যাপনির্ভর টিউটোরিয়াল সংস্থা। রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী, প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ, এমনকি মধ্যশিক্ষা পর্ষদের উচ্চতর আমলাবৃন্দকেও গদোগদো হয়ে সেইসব মুনাফাখোড় বেসরকারি কোম্পানীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায়। আমরা ভারতের ছাত্র ফেডারেশন ক্রমশ বুঝতে সক্ষম হই, আসলে কোভিড সংকটের জুজু দেখিয়ে পর্দার আড়ালে বেসরকারিকরণ বৈধতা পেতে শুরু করছে। আমাদের সন্দেহই ক্রমশ সত্যি হওয়ার দিকে। এমন সময়েই সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেবছরের ১২ই আগস্ট, সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা দিবসের দিন রাস্তায় রাস্তায় বিকল্প ক্লাসরুমের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা প্রতীকী প্রতিবাদে নামেন। বারাসত- মধ্যমগ্রাম- অশোকনগর- বনগাঁ থেকে দমদমে জেলাজুড়ে ছাত্ররা রাস্তায় বসে পড়ে একইসাথে রাস্তাতেই অভিজ্ঞ শিক্ষকরা ২ঘন্টা, ২ ঘন্টা ৩০ মিনিটের ক্লাস করান। কোথাও কোথাও সরকারী তরফে আক্রমণও নেমে আসে। কোভিডগ্রাফ একটু নামতে না নামতেই নির্দেশিকা জারি করে নবান্নের তরফে জিম, রেস্তোরাঁ, পার্ক, বিয়েবাড়ি থেকে পানশালা খোলার ছাড় দেয়। আশ্চর্য হয়ে দেখি, তখনও স্কুল-কলেজ খোলার ব্যপারে একাবারেই তাদের ভূমিকা নিরুত্তাপ। মুখ্যমন্ত্রী খোদ সাংবাদিক সম্মেলন করে ডিজিটাল ক্লাসের উপর জোর দিতে সুপারিশ করতে থাকেন। গ্রামের, শহরের নিম্নবিত্ত পাড়ার ছেলেমেয়েদের কি হবে? এই প্রশ্নের সদুত্তর বারবার নাকচ হতে থাকে বছরজুড়েই।
অ্যান্টি-ড্রপ-আউট স্কোয়াডের ভাবনা একদিনে আসেনি। আজাদী কা অমৃত মহোৎসবের ঝলমলে আয়োজনের বছরে এরকম এক বাহিনী তৈরী করতে হবে বাধ্য হয়ে এ কথা আমাদের ভাবনারও অতীত ছিল। কিন্তু সংগঠনের স্বাভাবিক বোঝাপড়া এবং সমাজ দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এই কাজের দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে। কেন যেতে হয়েছে? আসুন কয়েকটি তথ্য এবং পরিসংখ্যান দিয়েই আলোকপাত করার চেষ্টা করি…


দেশের সরকার সতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার নির্বোধ প্রয়াস করে যাক না কেন রাষ্ট্রসংঘের অভিমত ভারতবর্ষেকোভিড বা কোভিডোত্তর পর্বে ২৪.৭ কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমাদের জেলায় প্রায় সত্তরাধিক আঞ্চলিক স্কোয়াডের সমীক্ষা বলছে এই কোভিড বা কোভিডোত্তর সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের ৭৮%-ই নিম্নবিত্ত থেকে অতিনিম্নবিত্ত অংশের মধ্যেই পড়ে। অর্থাৎ একদিকে তাদের পরিবার-পরিজনেরা লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন অন্যদিকে সরকারী প্রকল্পগুলিও তাদের কাছে কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে যায়নি। গণশক্তি পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের দ্বারা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাসহায়ক স্কলারশিপ ইত্যাদি
দেওয়া চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার সেটি বন্ধ করে দিয়েছে বর্তমান শাসকদল। দেশের পাশাপাশি রাজ্যের চিত্রটাও কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়,আমাদের জেলাও নয়। স্কোয়াডের ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ অন্তত সেই ইঙ্গিতই করছে। আরো ভয়ানক তথ্য দিচ্ছে ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস। তাদের দাবী, এই বহুলাংশের কৃত্রিম সংকটের জেরে ১৪.৬% মাধ্যমিক স্তরের (সেকেণ্ডারী) ছাত্রছাত্রী সরাসরি ড্রপ-আউট হতে বাধ্য হয়েছে মানে তাদের পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হয়েছে! শিক্ষাবিদ দীপ্তি মালহোত্রা যে পরিসংখ্যান পেশ করেছেন তা আরও ভয়ংকর। গত একদশক ধরে তার কৃত সমীক্ষায় স্পষ্ট বলা হয়েছে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হওয়ার সময় ছাত্র এবং ছাত্রীর অনুপাত থাকে ১০০:৯৬। ক্লাস ৯-১০-এ পড়ার সময় ছাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এই অনুপাত দাঁড়ায় ১০০:৭৭। এবং মাধ্যমিক স্তরের পরবর্তীতে এই অনুপাত হচ্ছে ১০০:৫০-এর মতন। তার দাবী অনুসারে ২০২০-২১ সংকটের আবহে এই ছাত্রী ড্রপ-আউট হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবেই বেড়েছে। ৯৬% থেকে ৫০%-এ ছাত্রী সংখ্যা কমে আসার প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় এখনও এদেশে ক্লাস এইট বা মাধ্যমিক স্তরের উত্তীর্ণ হতে না হতেই মেয়েদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিবাহের দিকে। বলা বাহুল্য ক্লাস ৮—১০-এ পড়া কিশোরীরা অবসম্ভাবী ভাবেই নাবালিকা। এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা বিশেষত কোভিডোত্তর সংকটকালে ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতার ব্যপকতা আমাদের জেলার প্রান্তিক জল-জঙ্গল অধ্যূষিত সন্দেশখালি- মিনাখাঁ- হাসনাবাদ- হাড়োয়া- হিঙ্গলগঞ্জ এবং স্বরূপনগরেও। উত্তর ২৪ পরগণা জেলা কন্যাশ্রীতে সেরা পুরষ্কৃত হওয়ার পরেও অন্য এক অন্ধকারের দিকে আলো ফেলতে গিয়ে আমাদের মুখোমুখি হতে হয় অন্য বাস্তবতার। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের অ্যান্টি ড্রপ আউট স্কোয়াডের সমীক্ষা এবং গণশক্তি পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে আমরা দেখতে পাই, গোটা বসিরহাট মহকুমায় এই সংকটকালে প্রায় ৩০০-র মতো নাবালিকা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ নাবালিকার মধ্যে ৭০ জনের খোঁজ এখনও পাওয়া যায় নি। তারা কোন পথে? কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে না বিবাহিত হয়ে অন্যত্র না অন্ধকার অন্য কোনো রাস্তায়? এই প্রশ্ন উঠে আসেই…
স্বরূপনগর ব্লকের দত্তপাড়ায় সইফুল মণ্ডলের কন্যা মামুদার বিবাহ হয় ক্লাস সিক্সে পড়াকালীন সময়ে। সন্দেশখালি ব্লকের জঙ্গলাকীর্ণ একগ্রামের গীতা সর্দার জানান তার ছেলে-বউমা তামিলনাড়ুতে বস্ত্রশিল্পের পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, তার নাতনিও বাবা-মা-এর সঙ্গে ওখানেই যেতে বাধ্য হয়েছে। কাজেই তার পড়াশুনায় যে কবেই ইতি ঘটেছে সে কথা বুঝে নিতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়! একই অবস্থা স্বরূপনগর ব্লকের সাহানারা খাতুনের। তাকেও পড়া ছাড়তে হয়েছে ঐ বিবাহের কারণেই।
এর পাশাপাশিই হাসনাবাদ ব্লকের ভেবিয়াতেদাস-পাড়া, কাহারপাড়া, কামারপাড়া সহ একাধিক অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এলাকায় ব্যাপক সংখ্যায় প্রতিবছর নাবালিকা- বিবাহের কারণে ক্যাম্পাসচ্যুত হয় ৪০-৮০ জন মেয়ে। শুধু তাইই নয় বসিরহাট মহকুমার ভ্যাবলা, মাটিয়া, কুমারপুকুর, তকিপুর, মুরারীশাহ আদিবাসীপাড়ার একটা বড় অংশের নাবালিকাকে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে শহরে পরিচারিকা সহ অন্যান্য কাজ নিয়ে। এরা ধারাবাহিকভাবেই থেকে যাচ্ছে বঞ্চিত এবং অসোহায় হয়েই।


সমীক্ষায় উঠে আসছে আরো হিঙ্গলগঞ্জ,সন্দেশখালির একটা বৃহদাংশের মেয়েদের পেটের টানে যেতে হয় নদীর নোনা জলে মাছের মীন ধরতে। আমফান পরবর্তী সময়ে চাষযোগ্য জমি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেসবে দেদার জল ঢুকিয়ে ভেরী তৈরী করে যাচ্ছে শাসকদলের মদতপুষ্ট একদল ব্যাবসায়ী। তাদের এই মুনাফার
মাছচাষের জন্য মাছের মীন ধরতে হচ্ছে ১৪ বছরের কিশোরী থেকে সত্তরবছরের বৃদ্ধা কে। এখন দেখা যাচ্ছে যেসব কিশোরী এবং যুবতীবধূরা এই কাজে লিপ্ত হচ্ছে তাদের নূন্যতম অক্ষরজ্ঞান লাভ করার সুযোগই হয়নি। এখানেই শেষ নয়, তাদের অধিকাংশ কেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে ঘা,পাঁজরা,জরায়ুর ক্যানসার, সাদাস্রাব সহ বিভিন্ন বিভৎস রোগে। একদিকে পেটের টান অন্যদিকে রোগের জ্বালা। ক্যাম্পাস শব্দটা যেন যোগেশগঞ্জ, পাটলিখানপুর, বেড়মজুর, ভবানীপুর সহ বিভিন্ন এলাকার অনেক কিশোরীদের কাছে স্বপ্নের চাঁদের আলোর মতোই। স্কুলছুট পরিসংখ্যান এখানেই শেষ নয়। সারা উত্তর ২৪ পরগণা জেলার শিল্পবলয়ের বস্তিগুলোতেও ব্যপক প্রভাব পড়ে এই সংকটকালের। একটি সমীক্ষা বলছে শহরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলিতে গড়ে ২৫-৩২% ছাত্রছাত্রী স্কুলছুট হয়েছে কোভিডের পর। তার মানে এই ছাত্রছাত্রীরা ২০১৯ সাল অবধিও ক্যাম্পাসে যেত। ঠিক যেমন স্বরূপনগর ব্লকের আলি মণ্ডলরা অর্থনৈতিক কারণে স্কুলে যেতে পারেনি আবার পাতিপুকুরের রানা সাহাকে পড়াশুনো বন্ধ করতে হয়েছে বাবার মৃত্যু পরবর্তী পেটের জ্বালায়, ক্যাম্পাসে যাওয়া বন্ধ করতে হয়েছে খড়দার ইরফান আনসারিকে কিম্বা প্রথমবর্ষের ছাত্র সায়ন বিশ্বাসদের।
স্কোয়াডের সমীক্ষাহ ডিজিট্যাল ডিভাইড স্পষ্ট। বারাসাতের শ্রেষ্ঠা দে-র বাবা-মা পরিযায়ী শ্রমিক। এন্ড্রয়েড ফোনের অভাবে গোটা দুইবছর সে ক্লাস করতে পারেনি। এই তালিকায় বারাসাতেরই বিজয় রায় বা সৃজনী দাশেরাও। ডেটা প্যাকের দাম বেড়ে যাওয়ায় রণি যাদব, সুমিত রায়, কৃষ্ণেন্দু ভট্টাচার্যরা বা হাকিমপুর বিথারী পাঁতুয়ার মহিমা খাতুন, খুকুমণি মণ্ডলরা নিয়মিত অংশ নিতে পারল না ক্লাসে। প্রত্যন্ত নিমিচি রামনারায়ণ বিদ্যালয় হোক বা চৈতল পল্লিমঙ্গল স্কুল কিম্বা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বা নৈহাটিতেও একাধিক স্কুলে নিয়মিত অনলাইন ক্লাসটুকু হয়নি বলেই আমাদের হাতে রিপোর্ট এসেছে। এর বাইরেও স্কোয়াড যে ভূমিকা রেখেছে তা হল, এইবছরের জানুয়ারি মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে স্কুলগুলোতে ডেপুটেশন দেওয়া ফি’জ কমানোর দাবীতে। হৃদয়পুরের জিমূত সিংহ পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তাকে ক্যাম্পাসে নিজেদের দায়িত্বে ভর্তিকরে বারাসাত ১নং সাংগঠনিক এলাকার ছাত্র ফেডারেশনের এন্টি-ড্রপ-আউট স্কোয়াডের সদস্যরা। অশোকনগর, বেলঘরিয়া, বনগাঁ, দমদম সহ বিভিন্ন জায়গাতে এসএফআই ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে গেছে স্কুল খোলার দাবীতে। বীজপুর-পানপুরে এসএফআই ব্যবস্থা করেছে অবৈতনিক শিক্ষাকেন্দ্র খুলে শিশু-কিশোরদের পড়াশুনো করানোর। বঙ্গীয় স্বাক্ষরতা প্রসার সমিতিও এগিয়ে এসেছে স্বরূপনগরের হাকিমপুরে শিক্ষা সহায়ক কেন্দ্র গড়ে তুলতে। একদিকে ডিজিট্যাল ডিভাইডের রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র, ক্রমবর্ধমান ড্রপ-আউট ছাত্র-ছাত্রী, সরকারী মদতে অ্যাপ কোম্পানীর হাতে টিউটোরিয়াল বন্দোবস্ত অন্যদিকে অবৈতনিক শিক্ষা, সকলের জন্য শিক্ষা, সকলকে শিক্ষাঙ্গনে ফেরানোর লড়াই। এই দ্বান্দ্বিক পরিসর এ জেলার ছাত্র আন্দোলনের আবহমান কালের মাইলস্টোন। ২০২২ সালের ২৭শে জানুয়ারী স্কুল খোলার দাবীতে রাস্তার আন্দোলনে পুনর্বার বিকল্প ক্লাসরুম থেকে কার্যত স্লোগান উঠে আসে ‘হয় ক্যাম্পাস খোলো নয় আমরাই ভাঙব অচলায়তন’ …কলকাতা হাইকোর্টেদায়ের হওয়া ক্যাম্পাস খোলা সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলায় আমাদের সংগঠনও সরাসরি অংশীদার হয়।

অবশেষে মমতার সরকার নতিস্বীকার করে ক্যাম্পাসের তালা খুলেছে ঠিকই কিন্তু যারা স্কুলে ফিরতে পারল না তাদের ফেরানোর দায় নিতে এখনও উচ্চবাচ্য নেই। নাবালিকা বিবাহে যেসব মেয়েদের জীবন থেকে মুছে যেতে বসল শিক্ষার আলো, বিদ্যাসাগরের আপন রাজ্যে তাদের কি ফেরানো যাবে স্কুলে-কলেজে? ফেরানোর দায় নিয়েই আমাদের আগামীর সংগ্রাম। এই চারদিন আগেই জলপাইগুড়িতে আলুর বস্তা বইতে দেখা গেছে স্কুলছুট ছেলেদের। কাজেই বোঝা যাচ্ছে স্কুল খুলেছে কিন্তু সবাই স্কুলে ফেরেনি। মনে পড়ে যায় অচলায়তন নাটকের শেষ দৃশ্যে দাদাঠাকুরের উক্তি, ‘‘আমাদেরর পঞ্চকদাদার সঙ্গে মিলে ভাঙা ভিতের উপর আবার গাঁথতে লেগে যেতে হবে।’’


দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র আন্দোলনের সদস্যদের জেলার আগামীদিনের সংগ্রাম এই স্কোয়াডের কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া এবং প্রাপ্ত তথ্যাবলীর ভিত্তিতে সংগ্রামের মশাল জ্বালানো…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *