যার সত্ত্বা থাকে, তার সত্ত্বা হারায় না

যার সত্ত্বা থাকে, তার সত্ত্বা হারায় না

  • অনীক দত্ত

১. আপনার বিগত ছবি গুলো যেমন ‘‘মেঘনাদবদ রহস্য’’ বা ‘‘বরুন বাবুর বন্ধু’’ ‘‘ভবিষ্যতের ভূত’’ এর পরে, ‘‘অপরাজিত’’- এর মতো হঠাৎ একটি একেবারে অন্য ধারার ছবি করার কারণ?

উ:- প্রথমত ‘‘অপরাজিত’’ তো দেখনি, তাহলে বুঝতে পারছো কী করে যে এটা একটা অন্য ধারার ছবি, আমি বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ধারার ছবি করেছি সেইভাবে দেখতে গেলে। ‘‘অপরাজিত’’ যার আদলে তৈরি তিনি নিজেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ছবি করেছেন, ছোটদের জন্য ‘‘গুপীগাইন বাঘাবাইন’’এর মতো মিউজিকাল ছবি করেছেন আবার তার সিকুয়েলটা তলায় তলায় কিছুটা পলিটিক্যাল বটে, আবার তিনি একদম গ্রামের একটা গল্প নিয়ে ছবি করেছেন, তারপর তার শহরে আসা, বড় হয়ে ওঠা, তারপর ডিটেক্টিভ করেছেন, মিউজিক্যাল করেছেন, সম্পর্কের ছবি তো করেছেনই, একজন পরিচালককে একই ধারার ছবি করতে হবে এর কোনো মানে নেই। আর আমার মনে হয় আমি হালেই এই অপরাজিত নতুন করে করছি, লোকে একটা ধরনের এক্সপেক্ট করতে আরম্ভ করেছিল, যদিও একই ভেবে করেছিলাম ‘‘মেঘনাদবদ রহস্য’’। তাই আমার মনে হয় প্রশ্নটা খুব যুক্তি যুক্ত নয়।

২. বড় পর্দায় এই প্রথমবার জীতু কমলকে দেখতে পাবে দর্শকরা তা হঠাৎ এই ‘‘অপরাজিত’’ চরিত্রের জন্য জীতু কমল কেন? 

উ:- জীতুর লুকগুলো নিশ্চয়ই দেখেছেন। দেখার পর বুঝতেই পারছেন কেন জীতু কমলকেই সিলেক্ট করা হয়েছে। তাই উত্তরটা নিশ্চয়ই আর দিতে হবে না।

৩. এই ছবির একটা দৃশ্যে সত্যজিত রায়-এর সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যাচ্ছে জীতু কমল-এর তবে কি ওনাকে মাথায় রেখেই আপনি এই ছবিটা নিয়ে ভেবেছেন?

উ:- না, জীতুকে আমি চিনতাম না। এইরকম যে একজন অভিনেতা আছে সেটাও জানতাম না। আগে অন্য একজনকে ভাবা হয়েছিল তার সাথে কথাও হয়েছিল, কিন্ত কোনো কারণে ডেটের একটা প্রবলেম হয়। পরে যে আমি কাউকে ওরকম হুবহু দেখতে পাবো তা আমি কোনোদিনও এক্সপেক্ট করিনি। তারপর আমি কোনো একটা কিছুতে জীতুকে দেখি এবং জিজ্ঞেস করি ছেলেটি কে? একজন বলে যে অভিনয় করে। তারপরে জীতুর কিছু কাজ দেখলাম। এরপর অনেকটা সময় কেটে যায়। তারপর একসময় দেখলাম ওর হাইটটা খুব লম্বা এবং ফিটনেসগুলো মন দিয়ে দেখলাম আর বাড়িতে গিয়ে সত্যজিত বাবুর ছবিগুলো দেখলাম। বুঝলাম একে কোথাও কাজে লাগানো যেতে পারে। এই ছবিতে একদম ছাত্রাবস্থা থেকে বয়স ৩৫ অবধি দেখানো হয়েছে। আমি প্রথমে যাকে ঠিক করেছিলাম তাকে এখন আর ছাত্র মানাবে না তার বয়সটা একটু বেশি। জীতুর যাই হয়ে থাকুক এখোনো সেই বয়সের ছাপটা পরেনি, বরং আমাদের সেটা ক্রিয়েট করতে হবে, যেটা অনেক সহজে ক্রিয়েট করা যায়, অল্প বয়সী কাউকে আরেকটু বয়স্ক দেখানো সেটা অনেক সহজ, উল্টোটা খুব মুশকিল, আমার তখন মনে হয়েছিল খুব বেশি না হলেও দুটো সিনের জন্য ওকে রাখা যায়। সেগুলো এমনভাবে নেবো যাতে দুজনের ডিফারেন্সটা বেশি বোঝা না যায়। যে সময় গ্রুপ সেটটা হলো। ছবিগুলো দারাম করে লাগলো আমার। ঠিক সেই সময়ে যাকে আগে ঠিক করা হয়েছিল তার ডেট ইত্যাদি নিয়ে এবং ওয়েদারের কারণে ক্যান্সেল হয়ে যাওয়ায় সব মিলিয়ে একটা সিডুল ক্যান্সেল হয়ে যায়। কিন্ত আমাদের তাড়া ছিল যে তার মধ্যেই করতে হবে। 

কাশফুল পাওয়া যাবে না তা না হলে। পূজোর আশেপাশেই করতে হবে। এইসব মিলিয়ে মনে হলো এতোটা যখন মিল হচ্ছে তাহলে ওকেই পুরোটা… তারপর দেখা যাক। এরপর বাকিটা যা ছিল মানে অভিনয়, কন্ঠস্বর ইত্যাদি, সেগুলো মনে হলো সলভ করা যাবে। প্রথমেই ওর পোস্ গুলো ভালো লেগেছিলো। ও নিজে কোনো সময় পায়নি প্রস্তুতির। কিন্ত তারপরেও যেটা দারুণ লাগছিল সেটা হলো ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। তারপর যখন দেখলাম ওর অভিনয়, তখন বুঝেছিলাম যে ও এটা ভালো করবে এবং তাইই করেছে। ও চমৎকার অভিনয় করেছে। তো এইজন্যই…

৪. এই সিনেমার শুটিং-এ স্মরণীয় কোনো ঘটনা ঘটেছিল?

উঃ- দেখো, বিভিন্নভাবে স্মরণীয় ঘটনা হতে পারে। ভালো হতে পারে আবার সাংঘাতিক হতে পারে। এই ছবি করতে গিয়ে প্রচুর বাঁধা বিপত্তি আসে। এমনকি আবহাওয়া খুব বেইমানি করেছে। সেই স্মৃতি খুব মধুর নয়। এছাড়াও কাঁশফুল দরকার ছিল। কিন্তু শুটিং শুরু করতে গিয়ে দেখি সব ফাঁকা। কি হয়েছে না, গরুতে খেয়ে গেছে। আবার বৃষ্টি নামলো, আমরা সবাই তাবু খাটিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সবথেকে মজার ঘটনা হলো লুকটেস্টের পর ওর ছবিগুলো যখন ও, ওর স্ত্রীকে দেখাচ্ছে, তখন ওর স্ত্রী ওকে বলে যে এই ছবিগুলো আবার কেন দেখাচ্ছ? ও তখন বলে, এই ছবিগুলো আগে কখন দেখলে? আসলে আগেরদিন আমি ওকে সত্যজিৎ বাবুর কিছু ছবি পাঠিয়েছিলাম। ওর স্ত্রী ভেবেছিল ও আবার ওগুলো দেখাচ্ছে…

৫. আপনার ছবিগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি সমস্যার সম্মুখীন হতে। কিন্তু কোন ছবির ক্ষেত্রে বিষয়টা সবথেকে কঠিন ছিল?

উঃ- আমার ‘‘ভবিষ্যৎ এর ভূত’’ সম্পূর্ণ অন্য কারণে বাঁধা দেওয়া হয়েছিলো। নানারকম কেস দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। আবার প্রথম ছবির ক্ষেত্রে বাজেট প্রবলেম হয়েছে। টাকা পয়সার জন্য প্রবলেম হয়েছে। ‘‘ভবিষ্যৎ এর ভূত’’ সবাই জানে রিলিজ নিয়ে প্রবলেম, আসলে ছবিটি শুরুর থেকেই প্রবলেম এসেছে। আমায় বলা হয় শুটিং থামানোর কথা। আবার ‘‘বরুণবাবুর বন্ধু’’-র ক্ষেত্রে এতোটা সমস্যা হয়নি। আমার মনে হয় প্ল্যান করে মোকাবিলা করা যায় সবক্ষেত্রে। আর আমি প্ল্যান ডিটেইলস-এ করি।

৬. ‘‘ভূতের ভবিষ্যৎ’’-এর ক্ষেত্রে আপনি বলেছেন শুটিং শুরুর আগে থেকেই সমস্যা শুরু হয়। পরবর্তীতে রিলিজকে কেন্দ্র করেও সমস্যা দেখা দেয়। সেই সময়ে অনেক বিশিষ্টজন ছবিটির পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আপনার কি মনে হয় যে এই মত প্রকাশের মাধ্যমকে যারা বাঁধা দিচ্ছে, আসলে তারা বাক্ স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ ডেকে আনছে?

উঃ- এটার উত্তর হ্যাঁ ছাড়া কি কিছু হয়? তবে সেসময় অনেকে পিঠ বাঁচিয়ে চলছিলো। সব মিডিয়া কভার করেনি। তাই এর উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ।

৭. ২০১১-র আগে যে সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো, তাতে অনেক বিশিষ্টজন রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু বর্তমানে শেষ দেড় মাসে রাজ্যজুড়ে একের পর এক খুনের পরেও তাদের অনেকেই রাস্তায় নেই। কিন্তু আপনাকে দেখা গেছে। আপনার কি মনে হয় এই সময়ে শিল্পীদের যেভাবে শাসক দলের হয়ে কথা বলানোর প্রচেষ্টা চলছে তার কারণেই তাদের সত্ত্বা হারিয়ে যাচ্ছে?

উঃ- যার সত্ত্বা থাকে, তার সত্ত্বা হারায় না। আমি ২০১১-এর আগে শাসকদলের একজন নেতাকেও চিনতাম না। তবে অনেকগুলো কারণে তাদের ভোট দিতাম। আমাকেও শাসক দলের লোকজন বহুবার ডেকেছে কিন্তু আমি কখনো যাইনি। 

প্রলোভন দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেইসব আমি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কখনো বলিনি। সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের সময়েও আমি রাস্তায় নামিনি, কারণ আমার মনে হয়েছে যারা বলছেন তারা ভুল বলছেন। আর পরবর্তীকালে তা প্রমাণিত হয়েছে। আমি ভবিষ্যতে যদি কখনও ভুল মনে হয় এই পার্টির কাজ তখন সেটাও বলবো।

৮. আপনাকে শ্রমজীবি ক্যান্টিনে এ আমরা দেখেছি। আগামীদিনে কি আমরা অনিক দত্ত কে ‘‘রেড ভলেন্টিযার’’ নিয়ে ছবি করতে দেখতে পারি?

উঃ- আমি জানি না সরাসরি করতে পারবো কিনা। আমার শরীর খুব একটা ভালো নেই। জানি না আদৌ আর ছবি করতে পারবো কিনা। আর যদি করিও তাহলেও দেখতে হবে শরীরের ওপর খুববেশি চাপ যেন না পড়ে। আমার ফুসফুস-এর সমস্যা হয়েছে। আর এই কাজগুলো শুধু বামপন্থীরা করছে বলেই আমি ছিলাম 

তা নয়, এটা একটা ভালো কাজ। যদিও বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাও আগামীদিনে যদি অন্য দুই দল এরকম কিছু করে সেখানেও সাধুবাদ জানাবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *