সস্তার শ্রমিক বানানোর শিক্ষানীতিকে রুখতেই হবে
– সৌভিক ভট্টাচার্য
COMMERCIALISATION
COMMUNALISATION
CENTRALISATION
মূলত এই তিনটি ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে মোদি সরকারের দেশবিরোধী, ছাত্রস্বার্থ বিরোধী নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি। করোনা কালকে কাজে লাগিয়ে, দেশের সংসদে কোনরকম আলোচনা না করে কার্যত গায়ের জোরে নিজেদের উদ্দেশ্য অর্থাৎ শিক্ষায় গৈরিকিকরণকে সফল করবার অভিসন্ধি নিয়ে এই নয়া জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রয়োগ করার ঘোষণা করে বিজেপি সরকার। কৌশল করে দেশের ছাত্রসমাজকে মোদির বন্ধু আদানি, আম্বানিদের কারখানার জন্য শিক্ষিত কর্মচারী অর্থাৎ এডুকেটেড লেবার বানিয়ে রাখার প্রচেষ্টা শুরু করতে চাইছে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। সিলেবাসে আমূল পরিবর্তন এনে আমাদের বাড়ির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মনে আসলে ফ্যাসিবাদের বীজ বপণ করে দেওয়াই এই সরকারের আসল উদ্দেশ্য। স্কুল বেঞ্চে ভাঙন ধরিয়ে রাহুল- রিজওয়ান দের একসাথে পড়াশোনা করা, একসাথে টিফিন ভাগ করে খাওয়া এবং শিক্ষার অধিকার রক্ষার জন্য একসাথে সংঘবদ্ধ হওয়ার থেকে বিরত করতে চাইছে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতবর্ষের যাবতীয় ইতিহাস মুছে দিয়ে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার প্রবেশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে এই নয়া জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রয়োগ করতে চাইছে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার।
আমাদের রাজ্যে মমতা ব্যানার্জি ও তৃণমূলের সরকার ২০২০ সাল থেকে এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও, নাগপুরের হেড অফিসের নির্দেশে এখন সেই জাতীয় শিক্ষানীতিকে রাজ্যজুড়ে প্রয়োগ করবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে আর এস এস এর অন্যতম এজেন্ট মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার। এই কারণেই ইউজিসি গত ৩১শে জানুয়ারি ২০২৩ রাজ্য সরকারকে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রয়োগের জন্য যে নির্দেশনামা পাঠিয়েছেন তার বিন্দুমাত্র বিরোধিতা না করে অবিকল সেই নির্দেশিকা গত ১৭ই মার্চ ২০২৩ তারিখে রাজ্যের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারদের পাঠানো হয়ছে।
মুখে বড় বড় কথা বললেও আরএসএসের বিভাজনকারী জাতীয় শিক্ষানীতির এক চুলও বিরোধিতা করছেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা রাজ্যজুড়ে এতগুলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ তৃণমূলের ছাত্র সংগঠন তৃণমূল ছাত্র পরিষদ গায়ের জোরে দখল করে রেখেছে, তাদের ৪০ ঊর্ধ্ব ছাত্র নেতারা আদেও জানেনই না হয়তো NEP খায় না মাথায় দেয়। ছাত্র সমাজের উপর আসন্ন সংকট সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তারা মনোনিবেশ করেছেন কলেজে মোটা টাকা নিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের পকেট ভরাই এর কাজে।
একমাত্র দায়িত্বশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার অধিকার রক্ষার স্বার্থে এই নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে কলেজ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এবং রাজপথে নিরন্তর লড়াই করে চলেছে।
ভারতের ছাত্র ফেডারেশন জাতীয় শিক্ষানীতির বিরোধিতা করছে কারণ এই প্রক্রিয়া সরাসরি ড্রপ আউট বাড়াবাড়ি রকমের বৃদ্ধি ঘটাতে চলেছে। ইতিমধ্যে তিন বছরের স্নাতক কোর্সেই আমাদের রাজ্যে ড্রপ আউটের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। আমাদের আশঙ্কা চার বছরের অনার্স কোর্স হলে এই ড্রপ আউটের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। মাল্টিপল এন্ট্রি এক্সিট এর নামে আমাদের রাজ্যের ওয়ার্কিং স্টুডেন্টদের শিক্ষার অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ছোটখাটো কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে তাদের স্বপ্নকে কার্যত পদদলিত করতে চলেছে এই নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি।
ফাস্ট ট্রাক মোডের নাম করে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় আদানি আম্বানিদের অনলাইন এডুটেক কোম্পানিগুলোকে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে। আমাদের আশঙ্কা এর ফলে রাজ্যের প্রান্তিক অংশের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের শিক্ষা গ্রহণ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। রাজ্য জুড়ে আরো প্রখর হবে ডিজিটাল- ডিভাইড।
শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীরা নয় আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক শিক্ষিকাদের ওপরেও বিপুল চাপ সৃষ্টি করতে চলেছে এই জাতীয় শিক্ষানীতি। শিক্ষার গুণগত মান না বাড়িয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও অধ্যাপকদের উপরে চাপের বোঝা দিয়ে সিলেবাস শেষ করার জন্য বাধ্য করা হবে। পিডিএফ পাঠিয়ে সিলেবাস শেষ করানোর চেষ্টা হবে। ছাত্রদের সাধারণ বিচার বুদ্ধি নির্মাণের প্রক্রিয়াকে বাধা দান করছে এই জাতীয় শিক্ষানীতি। ৯০ দিনের মধ্যে কোর্স শেষ করার জন্য নজিরবিহীন চাপ দিয়ে দিচ্ছে এই শিক্ষানীতি। ফলত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর এই চাপ সামলানোর মতো পরিকাঠামো নেই। এই পরিকাঠামো উন্নয়ন করবার জন্য জাতীয় শিক্ষা নীতিতে বিশেষ কথা খরচ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ পরিকাঠামোর অভাবে এই কাজগুলো যখনই হবে না, ঠিক তখনই প্রাইভেটাইজেশন এর দরজা খুলে যাবে। বিনিময়ে ছাত্রদের থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন হবে। শিক্ষাকে কার্যত পন্ন বানিয়ে দিতে চাইছে এই শিক্ষানীতি।
আমরা আরো আশঙ্কা করছি এই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রয়োগ হলে আমাদের রাজ্যে ভুয়ো ডিগ্রীর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। মাঝপথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাল্টানো বা কোর্সকে পূর্ণাঙ্গ অনলাইনে নিয়ে চলে যাওয়ার যে অপশন শিক্ষানীতি তে বলা আছে তা এরই ইঙ্গিত বহন করে।
জাতীয় শিক্ষানীতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই রাজ্য প্রয়োগ করবার আগে সব কটি দায়িত্বশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে সরকারের উচিত বারবার আলোচনা করা। আমরা ভারতের ছাত্র ফেডারেশন দায়িত্বশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে বিজেপি আরএসএসের মস্তিষ্কপ্রসূত এই জাতীয় শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে বিকল্প শিক্ষানীতি তৈরি করতে পেরেছি। তাই এই রাজ্যের মমতা ব্যানার্জির সরকারের উচিত ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাকর্মী, সমস্ত ছাত্রসংগঠনের সাথে আলোচনায় বসা। এই রাজ্যের স্বার্থে, এই রাজ্যের ছাত্রদের ভবিষ্যতের স্বার্থে অবিলম্বে বিকল্প শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
আসলে বিজেপি বলুন কিংবা তৃণমূল ওরা জানে ছাত্ররা যত বেশি পড়ে,তত বেশি জানে, এবং তত কম মানে। তাই শিক্ষার উপর সবচেয়ে বেশি আঘাত নামিয়ে আনার চেষ্টা হীরক রাজার রাজ্যেও ছিল, আমাদের দেশ ভারতবর্ষ এবং আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের শাসকদেরও একই চেষ্টা রয়েছে।
তবে এই ছক আমাদের ভাঙতেই হবে। আর এই ছক ভাঙ্গার খেলায় নেতৃত্ব দেবে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন। বিজেপি আরএসএস এর মস্তিষ্ক প্রসূত এই জাতীয় শিক্ষানীতিকে তাদের এজেন্ট মমতা ব্যানার্জির হাত দিয়ে এই রাজ্যে প্রয়োগের ছক’কে আমরা রুখে দেবই। এবং সেই আন্দোলনের রূপরেখা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে।
কলেজের ক্যান্টিনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যেই রক্ত তারকা খচিত শ্বেত পতাকার নিচে সংগঠিত হতে শুরু করেছে ছাত্রসমাজ।
গ্রামে, নগরে, বন্দরে আগামী বিপ্লবের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে ছাত্র সমাজ। এবারের লড়াই জোর লড়াই। ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্রদেরকে কর্পোরেট শ্রম কোডে বেঁধে ফেলার বিরুদ্ধে। ক্যাম্পাসে মন খুলে নিশ্বাস নেওয়ার পক্ষে। ক্যাম্পাস কে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রান্তে প্রান্তে আওয়াজ উঠছে “কর্পোরেট মুক্ত ক্যাম্পাস চাই, ক্যাম্পাস থাকুক ছাত্রদের, কর্পোরেটদের ক্যাম্পাসে কোন ঠাঁই নাই” ।
আসলে ছাত্র সমাজ বুঝতে পেরেছে মোদি মমতার শিক্ষানীতি একই। আর এই শিক্ষানীতি আসলে বড়লোক এবং দাঙ্গাবাজদের শিক্ষা নীতি। তাই সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা গলা ফাটিয়ে বলছেন বাংলায় এই শিক্ষানীতির কোন ঠাঁই নাই। তাই গোটা বাংলার প্রতিবাদী ছাত্র সমাজ নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আগামী ২৫শে মে মিলিত হতে চলেছে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পিঠস্থান কলেজ স্ট্রিটে। ভারতের ছাত্র ফেডারেশন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ডাকে চলবে রাতভর অবস্থান বিক্ষোভ। পরদিন অর্থাৎ ২৬শে মে সকাল ১০টায় জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে কলেজ স্ট্রীট থেকে মৌলালির পথে মিছিল করবে ছাত্র সমাজ।

কিছুদিন আগে কলকাতায় মোদির জাতীয় শিক্ষানীতির বিরোধিতা করতে গেলে ছাত্রদেরকে টেনে হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলতে যায় মমতা ব্যানার্জির পা চাটা পুলিশ। বেনজির ভাবে ওই প্রিজন ভ্যান ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে ছাত্ররা। আপাতত পুলিশ বুঝে গেছে প্রিজন ভ্যান দিয়ে এস এফ আই কে আটকানো যাবে না।
দাঙ্গাবাজ কর্পোরেট পুঁজিপতি এবং মোদি-মমতার এই শিক্ষানীতিকে এই বাংলার বুকে রুখে দিয়েই ক্যাম্পাস গুলোকে লাল তারায় মুড়ে ফেলার লড়াই চলবে।

