একদিনে না, একদিন হবেই…
ঈশা মন্ডল
“মা আমি আসছি… দেরি হয়ে যাচ্ছে” এই বলে কলেজের জন্য বেরোলো বৃষ্টি। টাকি কলেজের প্রথমবর্ষের ইতিহাসের ছাত্রী সে। মাধ্যমিকে পঁচাশি শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করা মেয়েটি বাবা-মা এর অনেক জোরাজুরির পরেও একাদশে সায়েন্স নেয়নি, পড়াশুনা করেছে আর্টস নিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকেও ভালো রেজাল্ট তার। ভেবেই নিয়েছিল ইতিহাসে পি.এইচ.ডি করবে, কলকাতার ভালো নামকরা কলেজে ভর্তি হওয়ার
স্বপ্ন থাকলেও, বৃষ্টির মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের এই রকম অনেক স্বপ্নই মুছে ফেলতে হয়। কিন্তু পরিবারের অনিচ্ছার পরেও নিজের পড়াশুনোর স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে সে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার অবসান। আজ কলেজের প্রথম দিন। ভাঙ্গা এক স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন কলেজে জীবন শুরু হলো তার। কলেজ শেষের পরে আবার টিউশন। নিজের পড়ার জন্য নয়। ওই যে বললাম না মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের যেমন অনেক স্বপ্ন যেমন ভাঙ্গে, তেমন অনেক স্বপ্ন নিজে হাতে
গড়তেও হয়। আর তাই দু-চার জন কচিকাচাকে পড়ায় বৃষ্টি। কলেজ, পড়াশুনো, পরিবার, কচিকাচা, বন্ধু, আড্ডা এই সব নিয়েই ভালোই চলছিলো তার জীবনটা। শনিবার কলেজের লাস্ট ক্লাসের পর মা এর ফোন এলো তার। বললেন আজ তাকে একটু তারাতারি বাড়ি ফিরতে। মা এর খুব একটা অবাধ্য মেয়ে সে নয়। সব পড়ানো ক্যান্সেল করে মা এর কথা অনুযায়ী সেদিন একটু তারাতারিই বাড়ি ফিরলো। বাড়ি ফিরে দেখে কিছুজন এসছেন, অচেনা কিছু মানুষ। দেখে বেশ অবাকই হলো সে কারণ বাবা – মা এর পরিবারের প্রায় সবাইকেই চেনে। নিজের ঘরে যাওয়াতে মা বলল“এইনে, এই শাড়িটা পড়ে রেডী হয়ে বাইরে আয়”সব
কিছুই যেনকেমন অদ্ভুতলাগছিল তার। মা কে জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন তার বাবা নাকি বিয়ে ঠিক করেছে, আর সেই কথা অনুযায়ী বৃষ্টিকে দেখতে এসছেন তারা। মাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করলেও, শুনলেন না তিনি। আর তারইবা কি ছিলকরার! এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম ইহলো পরিবারে একটি পুরুষের প্রত্যেকটিকথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা, আর তা না করলেই কপালে লেখা থাকে অত্যাচার।
“এই বিয়ে আমি কিছুতেই করবো না বাবা” বাবা মা এর সেই অবাধ্য মেয়ে টার এই কথা টা বলতে অনেক সাহস লেগেছিল। আর শুধু তার সাহস না, তার সেই কথায় লুকিয়ে ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা ভাঙার এক আকাশ যন্ত্রণা, ক্ষোভ। কিন্তু ওই যে বললাম “পুরুষতান্ত্রিক সমাজ”…
কিছু মুহূর্তের মধ্যেই যেনো তার চারপাশটাকে খুব অচেনা লাগতে শুরু করলো। তাহলে কি আর পাঁচটা স্বপ্নের মত তার এই স্বপ্নটাও শেষ হয়ে যাবে! শুধু একটি শব্দ তার সামনে ভেসে আসলো “ধ্বংসাবশেষ”। বুঝে উঠতে পারছিলো না কি করবে সে, কি করা উচিৎ তার। শেষ পর্যন্ত পারলো না সে, স্বপ্নগুলো পূরণ করতে। যে অন্যরকম জীবনের কথা সে
ভেবেছিল, হলো না সেটা। নতুন জীবন না জীবন শেষের অধ্যায়ে পা দিলো বৃষ্টি।
এই হলো বৃষ্টির কথা। এই রকম শত শতমেয়ে আছে যাদের স্বপ্নগুলো প্রতিদিন ভেঙ্গে যায়, না একটু ভুল বলা হলো স্বপ্নগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। আর লিঙ্গবৈষম্য, তা আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাস। স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষ পূর্তির পরেও আমাদের সমাজ আজও আটকে আছে। বর্তমান সময়ে এসেও আরএসএস চরম হিন্দুত্ববাদীরা হিন্দুত্ববাদ ও মনুবাদের নামে নারীদের অধীনস্ত রাখতে চায় পুরুষদের আয়তায়। ধর্ম, সংস্কারের বুলি আওড়ানো আরএসএস-এর দুর্গার রাজ্যে ছাত্রী ড্রপ আউটের সংখ্যা সব থেকে বেশি। কন্যাশ্রী প্রকল্পযা ছাত্রীদের পড়াশুনোর জন্য শুরু করেছিল সরকার। কিন্তু এই ডিজিটাল ডিভাইডেশনের শিকারে পড়াশুনো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বহু ছাত্রীরা। সব থেকে হাস্যকর বিষয় কি জানেন… আমাদের রাজ্যে যুবতীদের বিয়ের জন্য রুপশ্রী প্রকল্প শুরু করেছে সরকার। আবার গ্রামের দিকে জোর করে বাচ্চা মেয়েদের নাকি বিয়ে দিলে বাবা – মা কেও রেহাই দেয় না পুলিশে। কিন্তু এই বৃষ্টির মতো মেয়েরা যারা প্রাপ্তবয়স্কা হওয়া সত্বেও তাদের কোনো অধিকার নেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নিজের স্বপ্ন পূরণ করার, নিজের ইচ্ছে মতন একটা জীবন কাটাবার। যারা জীবনযুদ্ধে হার মানতে বাধ্য হয়। আর শিকার হতে হয় নিয়মিত নির্যাতনের আর স্বামী সহীতধর্ষনের।
সময়টা আর চুপ করে মুখ বুজে সব কিছু দেখার নয়। এগিয়ে আসার, প্রতিরোধ গড়ে তোলার। সময়টা লড়াইয়ের — নারী স্বাধীনতা, মতাদর্শ আর চরম ধার্মিকতার বিরুদ্ধে। “অর্ধেক নয়, পুরো আকাশ চাই” এই ধ্বনিতে স্বাধীনভাবে বাঁচার পথ সাজাই সবাই।

