স্কুল বাঁচাও, মূল বাঁচাও …
• বিশ্বনাথ দাস
“স্কুল বাঁচাও মূল বাঁচাও”, মূলত বর্তমান সময়ে অন্যতম জরুরী বিষয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা ছাত্রসমাজ। সহজ কথা বলতে গেলে বর্তমানে গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ২০১১ সালের পর থেকে যে অরাজকতা চলছে; সেটার মূল আঘাত যার উপর নামিয়ে আনা হয়েছে, সেটি শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে মধ্যশিক্ষা বা বলতে গেলে স্কুলের গণ্ডি আজকের দিনে ভয়ঙ্কর সংকটের সম্মুখীন। যার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী হচ্ছে একদিকে রাজ্যের তৃণমূল সরকার এবং অপরদিকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।
স্কুল হচ্ছে সমাজের একটা ভিত। মানুষের মূল্যবোধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে তার জ্ঞানের প্রসার এবং প্রশ্ন করার যে সাহস সবটাই পাওয়া স্কুলের থেকেই। স্কুল হচ্ছে মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একদম প্রাথমিক জায়গা বা বলতে গেলে মূল জায়গা। আজ সেটাই সংকটের মুখে পড়েছে। যার জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে বিগত ১৫ বছরে রাজ্যে তৃণমূলের সরকারের জন্য প্রায় ৮,৫০০ ওপর সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে। শিক্ষায় অজস্র দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি; মিড ডে মিলের চাল চুরি থেকে শুরু করে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে বিজেপি সরকারও পিছিয়ে নেই, আজ গোটা দেশজুড়ে একইভাবে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গের মতোই অন্যান্য সকল বিজেপি চালিত রাজ্যগুলোতেও অত্যন্ত করুণ অবস্থার সম্মুখীন।

দেশজুড়ে জাতীয় শিক্ষানীতি লাগু হবার পর থেকে যেমনভাবে লেখাপড়ার খরচ বেড়েছে একইসঙ্গে ক্লাসরুমগুলোকে নিলামে তুলে দেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে দুর্বল সাধারণ মানুষের থেকে শিক্ষাকে অনেকটা দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দিনের পর দিন বন্ধ হচ্ছে এবং উল্টোদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। যদি সরকারি তথ্য নেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে সরকারি স্কুল কমেছে প্রায় ৮ থেকে ৮.৫% এবং বেসরকারি স্কুল বেড়েছে প্রায় ১৪% এর কাছাকাছি।
রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন যেখানে শিক্ষার্থী পিছু শিক্ষকের অনুপাত ছিল ৩২:১, বর্তমানে সেটা লাফিয়ে বেড়েছে ৮৪:১ অনুপাতে
এই রাজ্যে আমরা দেখেছি কোভিড পরবর্তী সময়ে বেড়ে চলেছে স্কুল ড্রপ-আউটের সংখ্যা, বেড়েছে স্কুল-ছুটের সংখ্যা এবং কমেছে ছাত্রীদের স্কুলে লেখাপড়ার সংখ্যা। রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চলগুলিতে বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া শ্রেণী তফশিলি এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা থেকে লেখাপড়া করা ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রান্তিক গ্রামগুলিতে যেখানে এমনিতেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কম, সেখানে বন্ধ হয়েছে স্কুল। প্রাথমিক স্কুল বন্ধ হয়েছে; বন্ধ হয়েছে হাইস্কুল। লেখাপড়ার সুযোগ দিনের পর দিন কমছে তাদের কাছে।
রাজ্য সরকার যখন বিভিন্ন খাতে একের পর এক ভাতা বাড়িয়ে চলেছে। যেমনভাবে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে সেইগুলিতে। অপরদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজ্য বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমছে। কেন্দ্রের বাজেট আমরা দেখতে পেয়েছি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমেছে। যা আগাম ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই চিন্তার কারণ।
এবার আসা যাক শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রীদের অনুপাতের দিকে। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন যেখানে শিক্ষার্থী পিছু শিক্ষকের অনুপাত ছিল ৩২:১, বর্তমানে সেটা লাফিয়ে বেড়েছে ৮৪:১ অনুপাতে।
শিক্ষকের চাকরি বিক্রি হয়েছে গোটা রাজ্যে; গোটা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আজ ভেঙে পড়েছে, যার ফলস্বরূপ এই রাজ্যে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাথায়, মালিকানায় কোথাও তৃণমূল নেতা কোথাও অসাধু ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সরকারি স্কুলগুলিতে ২৪০ টাকার পরিবর্তে স্কুল ফি বাড়ানো হয়েছে কোথাও সেটা ৭০০-৮০০ কোথাও ১০০০ টাকা অবধি। কম্পোজিট গ্রান্টের টাকা আটকে রাখা হয়েছে, স্কুলগুলিতে পৌঁছাচ্ছে না সেই টাকা। স্কুল পরিচালনা সমিতিগুলো তৃণমূলের ঘুঘুর বাসায় পরিণত হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারী ভেন্ডিং মেশিন নেই, স্কুলগুলিতে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন কমছে এবং মিড ডে মিলের বরাদ্দ অর্থ কমেছে।

কোথাও কোথাও যখন সরকারি স্কুলগুলিতে ব্যাপকভাবে তালা পড়ছে, সেখানে আবার পাল্লা দিয়ে গজিয়ে উঠছে আরএসএসের সরস্বতী বিদ্যামন্দির এবং বিভিন্ন আরএসএস একাডেমি। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এরকম ভয়াবহ চিত্র বাবা মায়েদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাই তারা কখনো বাধ্য হয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।একটা সময় পর লেখাপড়ার খরচ টানতে না পেরে, বাধ্যতামূলক শিক্ষার্থীদেরা লেখাপড়া ছাড়তে হচ্ছে।
আমরা দেখেছি রাজ্যে বেড়েছে বিগত সময়ে বাল্যবিবাহের সংখ্যা। নির্দিষ্ট বয়সসীমার আগেই মেয়েরা বিবাহবন্ধনে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
আজ যখন এ রাজ্যে শুধু সরকারি স্কুলই নয়; একইসাথে পাল্লা দিয়ে যেভাবে সরকারি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই বেড়ে চলেছে অরাজকতা।ক্যাম্পাসগুলিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশে অবনতি ঘটেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেড়ে চলেছে থ্রেট কালচার থেকে শুরু করে তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনীর ভয় দেখানোর-ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার সংস্কৃতি।
ইউনিয়ন রুমগুলো অবৈধভাবে দখল করে তোলাবাজি। ক্যাম্পাস জুড়ে চলছে মনোজিৎ মিশ্র মাতব্বরি থেকে শুরু করে টিএমসিপি দাদাদের গুন্ডাগিরি। ক্যাম্পাস এখন পরিণত হয়েছে দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চলে।
এইসবের মধ্যেই স্বপ্ন দেখাচ্ছে কেরালায় মুখ্যমন্ত্রী কমরেড পিনারাই বিজয়নের পরিচালিত বামপন্থী (এল.ডি.এফ) সরকার। যেখানে ইতিমধ্যেই স্নাতকস্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছে সেখানকার সরকার। এটা শুধুমাত্র একটা ঘোষণা বা পদক্ষেপ নয় এটা একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক সংস্কার।
এই অবস্থায় আমাদের রাজ্যেও পরিবর্তন দরকার। বাংলার আগাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে, বাঁচাতে হবে স্কুল- কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে।
ক্যাম্পাসগুলিকে গুন্ডা-দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল হতে দিচ্ছি না। বাঁচাতে হবে বাংলার সংস্কৃতিকে। বিভাজনের সিলেবাসের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে রবীন্দ্র- নজরুল- নেতাজি- ক্ষুদিরামের পাঠ্যক্রম। ছোট ছোট কুঁড়িদের জীবনের এই যুদ্ধে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, সেটির প্রাথমিক কাজ হচ্ছে স্কুল বাঁচানো। তাই স্কুল বাঁচানোর লড়াই হলো এখন আমাদের প্রধান ও প্রাথমিক মূল লড়াই। আমাদের মূল বাঁচানোর লড়াই।

এই অবস্থায় আমাদের রাজ্যেও পরিবর্তন দরকার। বাংলার আগাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে, বাঁচাতে হবে স্কুল- কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে।
ক্যাম্পাসগুলিকে গুন্ডা-দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল হতে দিচ্ছি না। বাঁচাতে হবে বাংলার সংস্কৃতিকে। বিভাজনের সিলেবাসের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে রবীন্দ্র- নজরুল- নেতাজি- ক্ষুদিরামের পাঠ্যক্রম। ছোট ছোট কুঁড়িদের জীবনের এই যুদ্ধে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, সেটির প্রাথমিক কাজ হচ্ছে স্কুল বাঁচানো। তাই স্কুল বাঁচানোর লড়াই হলো এখন আমাদের প্রধান ও প্রাথমিক মূল লড়াই। আমাদের মূল বাঁচানোর লড়াই।

