ভেনিজুয়েলা, ইরান ও ভারত
• অহনা দাশগুপ্ত
“ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল?”
যদিও এখানে উত্তরটা বলেই দিই, যুদ্ধের বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাবে, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, ভূ- রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তার ঘটবে, অস্ত্র ও সামরিক শিল্পের লাভ বাড়বে।
স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে এভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হয়ে গোলামি করবে তা বোধহয় আমরা কেউ আগে ভাবিনি।
এই মুহূর্তে বিশ্বরাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যুদ্ধ আর শুধু সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যুগে‘যুদ্ধ’অনেক সময় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক চাপ এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তেল ও গ্যাসকে কেন্দ্র করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি গড়ে উঠেছে, তা আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্য বজায় রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এই প্রেক্ষাপটে ভারত, ইরান এবং ভেনেজুয়েলা —এই তিন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির বৃহত্তর টানাপোড়েনকে প্রতিফলিত করে।
মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী রাষ্ট্র ইরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলি শুধু পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে; ফলে এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও অবরোধের আশঙ্কা প্রমাণ করে যে জ্বালানি সম্পদ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতারও অন্যতম ভিত্তি।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা, বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার। এই প্রেক্ষাপটে Hugo Chávez-এর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি ‘Bolivarian Revolution’-এর সূচনা করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষত তেল—জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা PDVSA-র ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো সামাজিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। দরিদ্র জনগণের জন্য ‘Misiones’ নামে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি চালু করেন, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছিল। কিন্তু এই নীতিই আন্তর্জাতিক কর্পোরেট স্বার্থ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এর ভূরাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ২০০২ সালে তার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়, যেখানে বহিরাগত সমর্থনের অভিযোগ ওঠে। যদিও জনতার ব্যাপক সমর্থনে তিনি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তবুও সেই থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো-এর সময়েও সেই চাপ অব্যাহত। অর্থনৈতিক অবরোধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ মিলিয়ে দেশটি গভীর সংকটে পড়ে। এমনকি মাদুরোকে সস্ত্রীক মাঝরাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো অমানবিক আচরণের ও আমরা দেখেছি, যা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রশ্ন তোলে।
ইরানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কম ভয়াবহ নয়। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা করে মার্কিন – ইজরাইয়েলি যুদ্ধবাজরা । খামেনেইর মৃত্যু হয় , একটা বড় ধাক্কা ।একের পর এক সামরিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘর্ষের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মার্কিন – ইজরাইয়েলি যুদ্ধবাজরা , বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য খুঁজে খুঁজে আক্রমণ চালিয়েছে যাতে পরবর্তীকালে কোনো বাঁধার মুখোমুখি হতে না হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়িয়ে দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, যা ভারতের মতো আমদানি নির্ভর দেশের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। শুধু জ্বালানি নয়, সার উৎপাদনের কাঁচামালেও এর প্রভাব পড়ে, ফলে কৃষিক্ষেত্রও বিপদের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের পাঠানো অর্থও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে— যা ভারতের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাভাবিকভাবেই সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে, বিশেষ করে দক্ষিণের দেশগুলিতে। তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয় এবং অর্থনীতি মন্দার দিকে এগোয়। যতদূর মনে পড়ে মার্ক্সের কথায়
“Capital comes dripping from head to toe, from every pore, with blood and dirt.”
চীন, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রেও সমস্যা আরও জটিল। তেলের দাম বাড়লে তাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি পায়, মুদ্রার মান কমে যায় এবং বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়।
এই জটিল পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা স্পষ্টভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে দেশের জ্বালানির বিপুল চাহিদা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ভারত অনেক সময় স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে পড়ছে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্রমশ মার্কিন নীতির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে—ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা হারাচ্ছে , যদিও মুক্তিকামী দেশের প্রধানমন্ত্রী গিয়ে যদি, গণহত্যাকারীদের জড়িয়ে ধরে তাহলে বুঝতে হবে ভারত মানেই নরেন্দ্র মোদী নয়। মনে রাখতে হবে, ইজরায়েলের সংসদে দাঁড়িয়ে কমরেড ওসের কাসিফ ওখানকার বামপন্থী সাংসদ বারংবার গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যারা গণহত্যার পক্ষে তারা আসলেই সভ্যতার লজ্জা। মোদীকে সংবর্ধনা দিয়ে, কমরেড ওসের কাসিফকে টেনে বের করে দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—কোথাও যুদ্ধ লাগলে আমাদের কী? কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সংঘাতের প্রভাব আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইরানে যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের রান্নার গ্যাস, পেট্রোল ও ডিজেলের দামে।
এই সময়ে তেল সংকট ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত কেবল কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর অংশ। ভারত, ইরান ও ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হবে এবং কর্পোরেট মুনাফার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যথায়, এই সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের ভার বহন করতে হবে বিশ্বের সাধারণ মানুষকেই।

