আকাশ কর
কিছুতেই আশঙ্কা কাটছিল না। তীব্র দাবদাহ তার উপরে রমজান মাস।জমায়েত ভালো হবে কিনা। ১১ এপ্রিলের আগে দফায় দফায় আলোচনায় বসে এই আশঙ্কাই করছিলাম আমরা উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ছাত্র যুব মহিলা নেতৃত্বরা। যত সময় এগিয়েছে ততই অবশ্য চিন্তা কমছিল। জেলা পরিষদ অভিযানকে সামনে রেখে প্রতিটি এলাকায় মিটিং মিছিলে মানুষের ব্যপক সারা। যে কটা জায়গায় বলতে গেছি প্রতিটিতে দেখেছি সাধারণ মানুষ শুনছেন মন দিয়ে। শুনবেন নাই বা কেন! প্রতিটি তো তার দাবী। দুর্নীতি, মুল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, লেখাপড়ায় ড্রপআউট, সরকারি স্কুল কলেজ বন্ধ, নারীদের উপর অত্যাচার এই সব কিছুর বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছিল এই ঐতিহাসিক জেলা পরিষদ অভিযান।
কর্মসূচীর দিনেও সকাল থেকে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। তবে যত সময় এগিয়েছে তত সেই চিন্তা কেটেছে পালে পালে ছাত্র যুব মহিলাদের আসা দেখে। আগে থেকেই জানানো হয়েছিল পুলিশকে, যথাযথ মাধ্যমে। কিন্তু বুঝতেই পারছিলাম পুলিশ সহযোগিতার মুডে নেই। তাই আমরাও বলে রেখেছিলাম পুলিশ আটকাতে চাইলে ‘মওসম বিগড়নেওয়ালা হ্যায়।’ ব্যারিকেড ভেঙেই আমরা ডেপুটেশন দেব জেলা পরিষদে। কারণ ওটা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। ঠিক ১.১০ এ বারাসাত হ্যালা বটতলা থেকে মাথার উপর চাঁদিফাটানো রোদ আর স্রোতের মত ভিড় নিয়ে আমরা শুরু করলাম মিছিল। তার আগে সেখানেই হল সংক্ষিপ্ত সভা। চোর-জোচ্চরদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভরা স্লোগান দিতে দিতে নিজের ছন্দেই এগোচ্ছিল মিছিল। বারাসাত হাসপাতালের বিপরীত গলি দিয়ে ঢুকে বটতলা পেরোতেই যথারীতি দেখা গেল পুলিশের ব্যারিকেড। এভাবে এই মিছিল রোখা যাবেনা বলেছিলাম আগেই। ছাত্র যুব মহিলাদের বিপুল ক্রোধ আছড়ে পড়ল ব্যারিকেডে। কিছুক্ষনের খন্ডযুদ্ধের পরেই খড়কুটোর মত উড়ে গেল সেই ব্যারিকেড। জানা গেল, জেলা পরিষদের ৩ দিকে আরও তিনটি ব্যারিকেড করেছিল পুলিশ। ব্যারিকেড ভাঙার পরে সবে পুলিশের সঙ্গে যখন আলোচনা শুরু হবে ডেপুটেশন দিতে যাওয়ার ব্যাপারে, কর্মীদের শান্ত করছে নেতৃত্ব, অতর্কিতে বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করল পুলিশ। কোনও কথাবার্তার আগেই সোজা মাথা লক্ষ করে লাঠি। ভয়ংকরভাবে আহত হলেন আমাদের অনেকে। মাটিতে পড়ে যাওয়া মহিলাও আক্রমণ থেকে বাদ গেলেন না। শ’য়ে শ’য়ে ছাত্রী, যুবতী, মহিলা অথচ তখনও অবধি নেই একজনও মহিলা পুলিশ। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল। আচমকা আক্রমণের প্রাথমিক প্রতিঘাত কাটিয়ে দ্বিগুণ উদ্যমে এগোতে শুরু করলেন কমরেডরা। জেলা পরিষদের গেট আগলে পুলিশ। দরজা অবধি পৌঁছানোর আগেই ফের বেধরক লাঠিচার্জ, ঘুষি, লাথি পুলিশের। পরপর দুবার এই অকারণ প্ররোচনার ফলাফল যা হওয়ার তাই হল। পালটা প্রতিরোধে পুলিশকে হারিয়ে জেলা পরিষদের দরজা খুলে লনে ঢুকে পড়লেন হাজার হাজার প্রতিবাদী। আগে থেকেই শিক বেঁকে থাকা জেলা পরিষদের দরজা চাপ সামলাতে পারল না বিপুল জনতার। ভেতরে যখন ঢুকছে কমরেডরা উপর থেকে রীতিমত উল্লাস প্রকাশ করছেন অফিসের কর্মচারীরা। তাদেরও যে ডিএ বাকি। অনেকেই ভেবেছিলেন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে জেলা পরিষদ। কিন্তু একটা গাড়ির একটা কাচেও হাত পড়েনি। জেলা পরিষদের দেওয়াল, লন আর বিশ্ববাংলার লোগোতে কমরেডরা লিখছেন চোর তৃণমূল হটাও। সাথে স্লোগান, বক্তৃতা। একটা ফুলদানিও ভাঙেনি সেদিন। এটাই বামপন্থা। এটাই দায়িত্ববোধ । যে অফিস বানানো বামপন্থীদের, দু-মাস পর ভোটে জিতে আবার যে অফিসে আসবেন বামপন্থীরা সে অফিসে মমতার রাইটার্স দখলের মত বোমা-বন্দুক নিয়ে তান্ডব করতে যাইনি আমরা। পুলিশের এই অসভ্যতার প্রতিবাদে ডেপুটেশন না দিয়েই আন্দোলন সেদিনের মত শেষ ঘোষণা করি আমরা। যাতে সাধারণ মানুষের অসুবিধে না হয় তার জন্য দ্রুত ফাঁকা করে দেওয়া হয় এলাকা।
আন্দোলন শেষের প্রায় আধ ঘন্টা পর, দপ্তরে আহত কমরেডদের প্রাথমিক শুশ্রুষা চলছে, হঠাৎ খবর এলো বাড়ি ফেরত কমরেডরা যখন স্টেশনে চা খাচ্ছিলেন সেখান থেকে ১০ জনকে টেনে হিঁচড়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। আবার সবাই ছুটল বারাসাত থানায়। আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এরকম গ্রেপ্তারির বিশেষ নজির না থাকলেও আশা করা হয়েছিল, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কিছুক্ষন পরে ছেড়ে দেওয়া হবে ৪ জন ছাত্র ও ৬ জন যুব কমরেডকে। কিন্তু ততক্ষনে বোধহয় তৃণমূল নেতারা ফোন ঘুরিয়ে ফেলেছেন। হন্তদন্ত হয়ে বারাসাত থানায় ঢুকলেন পুলিশ সুপার। বিকেল ৪.৩০ এ ঢুকলেন বেরোলেন তখন প্রায় রাত দেড়টা। চলল ষড়যন্ত্র। মিথ্যে মামলায় কমরেডদের ফাঁসানোর কাজ। একেরপর এক অন্যায্য ধারা দিয়ে পরেরদিন আদালতে তোলা হল কমরেডদের। গাইঘাটার ময়ুখ, পার্থ, বিভাস, শান্তনু, সুকান্ত, শুভম দমদমের দেবজ্যোতি, দক্ষিন দমদমের অর্ণব আর সায়নকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে চাওয়া হল, যা সর্বোচ্চ কোনও কেসে চাইতে পারে পুলিশ। মঞ্জুর হল না। সাত দিনের জেল হেফাজত দিল আদালত। যন্ত্রণায় কুকড়ে গেলাম আমরা। সবাই বয়সে বেশ কম। শুভম তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। অর্ণব, সায়নরাও কলেজ পড়ুয়া। কেউ গিটার বাজায়, কেউ ছবি আঁকে। যখন কমরেডদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দমদম সেন্ট্রাল জেলে, ওদের মুষ্টিবদ্ধ হাত, মিষ্টি হাসি আর আগুনমুখর চোখ আমাদের ভরসা দিল। কেউ ভাঙেনি।
অসভ্যতার তখনও শেষ হয়নি। এক মহিলা কনস্টেবল যিনি আদৌ সেদিন ঘটনাস্থলে ডিউটিতে ছিলেন কিনা সন্দেহ তাকে দিয়ে শ্লীলতাহানির মামলা করাল পুলিশ। সাথে পুলিশের লাঠি, নেমপ্লেট চুরি করার অভিযোগ। এগুলো চুরি করে নিয়ে গিয়ে কোনও মানুষ কি করতে পারে কে জানে! গাইঘাটার ৩ জন কমরেডকে আলাদা করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হল ৩ দিনের জন্য। সঙ্গে বারাসাতের এমন ৮ জন কমরেডের নাম মামলায় যুক্ত করা হল, যার মধ্যে একজন ১১ তারিখ ছিলেন কার্শিয়ং। দুজন বিকেল অবধি নিজেদের কর্মস্থলে চাকরি করেছেন। নির্লজ্জতার চরম সীমা পেরিয়েছে পুলিশ। আমাদের আন্দোলনের পরের দিন জেলা পরিষদের সামনে মঞ্চ খাটিয়েছিল তৃণমূল। যে বামেদের দূরবীন দিয়ে দেখতে পেতেন না, যাদের সাথে চা খাওয়ায় আপত্তি ছিল বালু মল্লিকদের তাদের গালাগাল করতে সেদিন বাদ রইলেন না উত্তর চব্বিশ পরগনার কোনও এমপি, মন্ত্রী, এমএলএ। জ্যোতিপ্রিয় বললেন, মিছিল করলে গোড়ালিতে মারব। এমন ব্যাবস্থা করব আর যাতে কোনওদিন মিছিল না করতে পারে। নিজেদের সাহসে কুলোবেনা বলে কি পুলিশকে দিয়ে সেই চেষ্টা করছে তৃণমূল। পঞ্চায়েত ভোটের আগে ভয় ঢোকাতে চাইছে বাম ছাত্র যুব কর্মীদের মধ্যে? তাহলে একটু ভুল হচ্ছে বালুবাবু।

এ’কদিন কোর্ট, জেল আর কমরেডদের বাড়ি – এই করেই দিন কাটছে। গাইঘাটার ময়ুখদার একরত্তি সন্তানকে কেউ বাবা কোথায় জিজ্ঞেস করলে অবলীলায় বলে দিচ্ছে – ‘বাবা জিন্দাবাদ করতে গেছে।’ জেলবন্দী সবার মা বাবা কারওর স্ত্রী কিংবা সন্তানের কারওর চোখে এখন আর জল নেই। সবার চোখে গর্বের আলো আর এই অন্ধকার পেরোনোর শপথ। প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়েছি আমরা। এলাকার কমরেডরা। বলেছি, আমরা সবাই আছি। সবাই মিলেই এই পরিবার। ভরসা রেখেছে সমস্ত পরিবার। জেলে দেখা করেছি কমরেডদের সাথে। সবাই হাসছে। দেখা করতে গেলে উল্টে যেন সান্ত্বনা দিচ্ছে আমাদেরই। পুলিশ হেফাজতে থাকা ৩ জনের সঙ্গে ২০ তারিখ যখন দেখা করতে গিয়েছি কোর্ট লক আপে, সুকান্ত আর শুভম আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছে বাকিদের নাম বলাতে, বলিয়ে তাদেরও ফাঁসাতে। আমরা কারওর নাম বলিনি দাদা। কারওর নাম বলিনি।’ – বামপন্থীদের ‘সাইজ’ করা অত সোজা না। এরাই আজ থেকে দু-বছর আগে পাড়ায় পাড়ায় রেড ভলেন্টিয়ার হিসেবে প্রাণ বাঁচিয়েছিল অনেক মানুষের। আজ তারাই মমতার পুলিশের নির্মমতায় অন্ধকারে। এদের মুক্ত করতেই হবে। সাধ্যমত লড়ছেন বারাসাত কোর্টের বহু বামপন্থী আইনজীবী। সওয়াল করে গিয়েছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। ফের কমরেডদের আদালতে তোলা হবে আগামী ২৬ তারিখ। আমরা জানি এ লড়াই শুধু আইনের না। রাজনৈতিক। আদালতের লড়াই লড়বেন উকিলরা। আমরা আমাদের বন্ধুদের জন্য রাস্তাতেই থাকব। গত ১৮ এপ্রিল উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার সর্বত্র প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন অসংখ্য গণতান্ত্রিক মানুষ। বিশাল মিছিল হয়েছে বারাসাতে। আর ২৩-২৪ এপ্রিল রাজ্যজুড়ে রাস্তায় নামবে গোটা রাজ্যের বামপন্থী ছাত্র যুব মহিলারা। আর ২৫ এপ্রিল রাজধানীতে মহাস্রোত নামবে কমরেডদের মুক্তির দাবীতে। আমাদের সাথেই ঐ দিন বিকেল ৪.৩০ এ শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ধর্মতলা অবধি হাঁটবেন জেলবন্দী সব কমরেডদের পরিবার। বাংলাকে শেকলমুক্ত করার লড়াই। দুর্নীতিরাজ বন্ধ করে স্বপ্নের বাংলা গড়ার লড়াইতে গিয়ে আজ গরাদের ওপারে আমাদের সোনার ছেলেগুলো। এরা কেউ অপরাধী নয়। এরা সৈনিক। সুদিন আনার সৈনিক। আসুন ওদের জন্য, আমাদের সবার ভবিষ্যতের জন্য গলা ফাটাই। চিৎকার করি …….

