রাজ্যজুড়ে চলা এই মাৎস্যন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বামপন্থীদেরকেই

রাজ্যজুড়ে চলা এই মাৎস্যন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বামপন্থীদেরকেই

সৌম্য দাশগুপ্ত

উচ্চতম আদালতের রায়ে প্রায় ২৬০০০ শিক্ষকের চাকরি চলে গেল। আদালতের রায়ে এটা পরিস্কার  যে চূড়ান্ত দুর্নীতি হয়েছে। এবং এই দুর্নীতি এত সর্বব্যাপী, মারাত্মক এবং তীব্র যে তার কোন তুলনা ভারতবর্ষে কেন হয়ত বিশ্বেও নেই।

কেন এই রায় শুধুমাত্র হাইকোর্ট নয়  সুপ্রিম কোর্টে একই  হল তার ব্যাখ্যা খুব সংক্ষিপ্ত  ভাবে করা যাক:-

মোট ১৭ রকমের  জালিয়াতি আর দুর্নীতি বা কারচুপি হয়েছে। সেই বিশাল কারচুপিগুলি অসাধারণ ভাবে গোপন করার চেষ্টা করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন।

রায়ের মধ্যে থেকে প্রথমেই বলা যাক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগকে চেয়ারম্যান করে একটি চার সদস্যের কমিটি গঠন হয় কেননা প্রথমেই মামলাগুলি চলাকালীন স্কুল সার্ভিস কমিশন আদালতের কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে নি।
এই কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত  জাস্টিস রঞ্জিত কুমার বাগ ছাড়াও ছিলেন স্কুল শিক্ষা কমিশনের একজন, বোর্ড বা পর্ষদ এর পক্ষ থেকে একজন এবং একজন আইনজীবী।
এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এই তথাকথিত পরীক্ষায়আইনবিরুদ্ধ ভাবে র‍্যাংক জাম্পিং, সাদা খাতা জমা দিয়ে চাকরি, যথেচ্ছভাবে বাছাই আর বাতিল করা, মেরিট লিস্টে নাম না থাকা স্বত্তেও এপয়েন্টমেন্ট সবই হয়েছে।

পরবর্তীতে স্কুল সার্ভিস কমিশন মেনেই নেয় যে আইনবিরুদ্ধ ভাবে র‍্যাংক জাম্পিং, সাদা খাতা জমা দিয়ে চাকরি, যথেচ্ছভাবে বাছাই আর বাতিল করা, মেরিট লিস্টে নাম না থাকা স্বত্তেও এপয়েন্টমেন্ট এবং আর যা যা গূঢ় বা প্রকাশ্য দুর্নীতি সবই ঘটেছে। এবং তারা ওএম আর শিট ও  নষ্ট করে ফেলে একবছরের মধ্যেই এবং এটা নাকি তাদের রুলেও আছে। যেটা রুলে নেই, সেই  গ্রুপ সি আর গ্রুপ ডি এর ও এম আর শিট গুলিও তারা নষ্ট করে ফেলে।
এর পরে শুরু হয় হাইকোর্ট নির্দেশিত সিবিআই  তদন্ত।
এই তদন্তের পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশানুযায়ী, হাইকোর্ট এর ডিভিশন বেঞ্চ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন এবং গত বছরেক বাতিল করে দেন কারণ
১) যখন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমগ্র সিস্টেমের মধ্যে এমন দুর্নীতি আছে যা আলাদা করার উপায় নেই বা  উপায়টাই বা প্রমাণটাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এবং সেটা প্রমাণিত  তখন ‘এন ম্যাসে’ বা সর্বত্র বাতিল করা যায়।
২) এই বাতিলকরণ এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং তা যথেষ্ট প্রমাণের উপর নির্ভরশীল।
৩) ব্যাপক এবং গভীর ম্যানিপুলেশন প্রমানিত  হলে সার্বজনীনভাবে প্যানেল বাতিলযোগ্য।
উপরের সব কিছুই কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে প্রমানিত।
তা স্বত্তেও এই সরকার নাটকীয় ভঙ্গিতে নাচতে নাচতে জনগনের পয়সায় সুপ্রিম কোর্টে গেলেন এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রায় একবছরের মধ্যেই এল  এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচার করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে দিলেন। কেননা সুপ্রিম কোর্টে তারা নতুন কিছু করলেন তো না, বরং এই সব চাকরিরত লোকেদের বৃথা আশায় ভাসিয়ে দিলেন। স্কুল সার্ভিস কমিশন  সময় পাওয়া স্বত্তেও কিছু করতে গেলই না। 

সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমার  তাঁদের রায়ে বললেন যে তাঁদের সামনে  যা
এসেছে তা হল:
ও এম আর শিট ১ বছরের মধ্যে নষ্ট করে দেওয়া হল অথচ তার পরেও রিক্রুটমেন্ট হয়ে চলল।ওএমআর শিট এর মিরর কপি সংরক্ষণ করা হয় নি। সিবিআই  এবং বাগ কমিটির তদন্ত অনুযায়ী এটা পরিষ্কার যে, কোম্পানিকে ও এম আর শিট স্ক্যানিং করতে দেওয়া হয়েছিল, সে সেটা নিজে না করে অন্য কোম্পানি কে সাব কন্ট্রাক্ট দিয়ে দেয়। স্কুল সার্ভিস কমিশন সেই কপি পাবার পর তা নষ্ট করে দিয়েছে বলে । আবার  তথ্যের অধিকার আইনে পরে সেই কপির মিরর ইমেজ নিজেদের ডাটাবেস থেকে দিয়েছে বলে, পরে বলে সিবিআই থেকে তারা এই মিরর ইমেজ পেয়েছে। সিবিআই বলে এই মিরর ইমেজ তাদের দেওয়া মিরর ইমেজ থেকে আলাদা।

স্কুল সার্ভিস কমিশন এর কপি না রাখা, তাদের ডাটাবেস আর উপরোক্ত সাব কন্ট্রাক্ট পাওয়া কোম্পানির নয়ডা অফিস থেকে পাওয়া হার্ডডিস্ক এ পাওয়া তথ্য আলাদা।

এবার আসতে হয় অতিরিক্ত চাকরির ব্যাপারে। স্কুল সার্ভিস কমিশন এর রেকমেন্ডেশন এর সংখ্যার থেকে চাকরি প্রাপকের সংখ্যা বেশি।

চাকরিপ্রাপ্তদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে যারা দাগি অর্থাৎ নি:সন্দেহে টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে আর যারা টাকা দিয়ে পেয়েছে কি পায়নি বোঝা যাবে না কারণ স্কুল সার্ভিস কমিশন চেপে গেছে বা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে তারা দাগি নয়, কিন্তু সন্দেহের উর্ধেও নয়।  এদের চাকরিও গেল কারন সর্বব্যাপি দূর্নীতি।
এসবই কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের,  সিবিআইয়ের,  বাগ কমিটির রিপোর্ট এ ছিল। ডিভিশন বেঞ্চের অর্ডারের পর, এই সরকারের উচিত ছিল যে দোষ স্বীকার করে নিয়ে যোগ্য লোকের আর অযোগ্য লোকের পরিষ্কার তালিকা তৈরি করা এবং সেটা  করে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া বা যে সুপ্রিমকোর্ট  প্রায় একবছরের মত সময় দিয়েছিল সেখানে তুলে দেওয়া।  কেন দিতে পারেনি। প্রশ্ন সহজ আর উত্তর জানা।

এখন এই পরিস্থিতিতে,  সুপ্রিম কোর্ট এর পক্ষে যোগ্য অযোগ্য বাছা সম্ভব নয়। সিবিআইয়ের মতে পুরো প্রক্রিয়াটাই দুষ্ট ও নষ্ট। 

অবস্থা সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন, তা খানিকটা  অসংলগ্ন  খানিকটা মিথ্যা এবং মোটের উপর অর্থহীন। আইনের কথা ছেড়ে দিন, সামান্য সাধারণ জ্ঞানের অভাব আজ ক্ষতি করে দিল সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার।  ৩ মাসের মধ্যে নতুন পরীক্ষা নেবার কোন কথা নেই রায়ে। ৪৭ নং প্যারায় বলা আছে  যারা এই চাকরি করার আগে অন্য কোন সরকারি বা সরকার পোষিত বা অটোনমাস জায়গায় কাজ করতেন তাঁরা যদি দাগী বা  টেইন্টেড তালিকায় না থাকেন তাঁদের আবেদন গ্রাহ্য ৩ মাসের মধ্যে করতে হবে।

এর পরে আসবে সুপার নিউমেরারী পোষ্ট ক্রিয়েশন,  যা আগামী কয়েক দিনেই বোঝা যাবে। এই সব দাগিদের বাঁচাতে এবং নিজেদের পিঠ বাঁচাতে পুরো মন্ত্রীসভা এইসব বজ্জাতি করে পার পেয়ে যাবে না বলেই মনে হয়।

একটা আদ্যোপান্ত দূর্ণীতিগ্রস্ত সরকার, আজ এ রাজ্যের মানুষকে প্রথমে বাধ্য করেছে দুর্নীতির কাছে মাথা নত করতে, অভ্যাস করিয়েছে চরম দুর্নীতি।  দুর্নীতিই যেন নব বাস্তবতা। দুর্নীতির অভিযোগ করাই অপরাধ, চুরি ধরলে,  মামলা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে দোষী আইনজীবীরা এবং আদালত। এরাজ্যের কিছু মানুষের নির্বুদ্ধিতার  এই তীব্র ঝাপটা  আমাদের বোধ নষ্ট করে দিচ্ছে।   এবিষয়ে বলার যে ত্রিপুরা রাজ্যে ২০১৭ সালের ঘটনার সাথে  এই রাজ্যের এই মামলার মিল প্রায় নেই। মামলা দুটি আলাদা। কারণ সেখানে শুধু ইন্টারভিউ এর মাধ্যমে চাকরি হয়েছিল, তাতে ১০ হাজার চাকরি বাতিল হয়েছিল কিন্তু সেটা হয়েছিল পুরনো আইনের ভুলে। সেখানে সুপ্রিমকোর্ট চাকরি বাতিল করে, কিন্তু কোনো মন্ত্রী ঘুষ খায়নি। কোন টাকা পয়সার  লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য আসেনি।


এখানে কিন্তু তা নয়, এখানে সর্বব্যাপি দূর্নীতি হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী সহ অনেকেই জেলে আছেন।

কথা এই,  এই সেই  প্রতারণা,  এই প্রতারণায় প্রতারিত  যারা হলেন তাদের অনেকেই নিরাপরাধ। তাদের আবার বসতে হবে পরীক্ষায়, আবার শুন্য থেকে শুরু করতে হবে। আবার নিতে হবে সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দায়।
কেন এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দায় নিতে হবে, কেন প্রতিনিয়ত ছাত্র ছাত্রী,  পরিক্ষার্থীদের নিতে হবে দুর্নীতির দায়?  হতে হবে দুর্নীতির শিকার?
কারণ একটি অপদার্থ, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারকে বার বার জিতিয়ে আনার ফলে আজ পশ্চিমবংগ  রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া, অর্থনৈতিক ভাবে দেউলিয়া, সামাজিক ভাবে দেউলিয়া এবং মানবিকভাবে আসলে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে, আর  গণচুরি,  তোলাবাজি আর গনডাকাতির টাকায় পোষিত দৈত্য স্বরূপ তৃণমূল দল একটা বিকট চেহারা ধারন করেছে, তার দায় সবার উপরে বর্তাবেই।

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলতে পারে যে সে আইন মানে না, তার দলের লোকেদেরই চাকরি হবে। এ কথা বলার পর ও তার বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হয় না। সে ছাত্র নির্বাচন করাতে পারে না। সে ছাত্রদের উপর গাড়ী চালিয়ে দিয়ে নিজেই হাসপাতালে চলে যায়। আর তার নেত্রী প্যাথলজিক্যাল মিথ্যেবাদী।

এক দিকে  এই শয়তানের মত অসংবেদনশীলতা আর অন্যদিকে ঘূষ, তোলাবাজি আর কাটমানি এই সরকারের এই  তৃণমূল দলের বৈশিষ্ট্য।
 
এই রায়ের ফলে এই সরকারের কিছু যাবে আসবে কি না জানা নেই, এই রায়ের পর আবার  পরীক্ষা হবে, তাতে হয়ত আবার টাকা খাওয়াখায়ি হবে। আবার হয়ত অনেককেই মামলাও করতে হবে।

আগামী পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভুলে যাতে না যায় গণতন্ত্র,  ধর্মনিরপেক্ষতা, সৌজন্য, সৌভ্রাতৃত্ব,
সততা,  এবং পরিশেষে মনুষ্যত্ব তার জন্য ছাত্র দের আলাদা দায়িত্ব নিতে হবে।

একটা দল সরকার হয়ে মাৎস্যন্যায় চালাচ্ছে, আর তার সর্বব্যাপী প্রবাহে একেবারে শেষ হয়ে যাতে না যায় পশ্চিমবঙ্গের অবশিষ্ট  সভ্যতা তার চেষ্টা আমাদেরকে করতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদেরকেই, বামপন্থীদের কেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *